নিরাপদ সড়ক নিয়ে যেসব প্রশ্ন তুললেন জাইমা রহমান

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
১২ আগস্ট ২০২৬, ১৯:২৮আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৫৩

জীবনের দ্বিতীয় ড্রাইভিং টেস্ট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ ও সরকারি সেবার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীকন্যা জাইমা রহমান। বুধবার (১২ আগস্ট) সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।

পোস্টে জাইমা রহমান লিখেছেন, গত সপ্তাহে তিনি জীবনের দ্বিতীয় ড্রাইভিং টেস্ট দিয়েছেন, এবার বাংলাদেশে গাড়ি চালানোর অনুমতির জন্য। প্রথমটি দিয়েছিলেন লন্ডনে, ১০ বছরেরও বেশি আগে। দুটিতেই প্রথমবারে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে গাড়ি চালানোর বাস্তবতার জন্য একটি পরীক্ষা তাকে যতটা প্রস্তুত করেছে, অন্যটি ততটা করেনি।

বাংলাদেশে ড্রাইভিং টেস্ট ও লাইসেন্সের পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে শুধু ড্রাইভিং টেস্ট বা লাইসেন্স নিয়ে ভাবেননি বলে জানান জাইমা। তিনি ভেবেছেন সড়ক ব্যবহারের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা এবং সড়ক নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়েও। জাইমা রহমান বলেন, ‘অনেক তরুণ বাংলাদেশির, বিশেষ করে ঢাকার তরুণদের, একটি মৌলিক হতাশা আছে; তাদের কাছ থেকে নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশা করা হয় এমন একটি ব্যবস্থার ভেতরে, যেটি সব সময় নিরাপদ বা অনুমানযোগ্য মনে হয় না।’

“পথচারী হিসেবে পর্যাপ্ত ক্রসিং ছাড়াই দ্রুতগতির সড়ক পার হতে হয়, এমন ফুটপাত ধরে হাঁটতে হয় যেটি হঠাৎ শেষ হয়ে যায় কিংবা দখল হয়ে থাকে। বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা ও প্রাইভেটকারের ভিড়ের মধ্য দিয়ে পথ করে নিতে হয়, যেগুলোর প্রত্যেকটি আলাদা আলাদা অলিখিত নিয়মে চলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। যাত্রীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাইমা বলেন, তাদের হাতে কার্যত কিছুই থাকে না। বাসটি যাত্রী তোলার জন্য অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দেবে কিনা, হঠাৎ ব্রেক কষবে কিনা, গাড়িটির যান্ত্রিক ফিটনেস আছে কিনা কিংবা চালক ঠিকমতো প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম পেয়েছেন কিনা; কোনো কিছুই যাত্রীর নিয়ন্ত্রণে নেই।”

নতুন চালক হিসেবে সবকিছু নিয়ম মেনে করতে গেলেও আরেক দফা প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায় বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার প্রশ্ন—নিয়মগুলো আসলে কী? কেন সেগুলো একেকজনের জন্য একেক রকম মনে হয়? সঠিক পদ্ধতিটা কী? অনলাইন প্রক্রিয়া কেন সব সময় যথেষ্ট নয়? দালাল ধরলে কেন কাজটা দ্রুত হয়ে যায়? পরীক্ষায় পাস করার পরও কেন মাসের পর মাস সেই কাগজটির জন্য অপেক্ষা করতে হয়, যা প্রমাণ করে তিনি পাস করেছেন?

‘এভাবে প্রশ্ন চলতেই থাকে’ উল্লেখ করে জাইমা রহমান বলেন, বিআরটিএ তার অনেক সেবা ডিজিটাল করেছে, যা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু ডিজিটাল করা তখনই কাজে আসে, যখন তা সত্যি সত্যি মানুষের জীবন সহজ করে। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে শুরু হওয়া কোনো সমস্যার সমাধান যদি শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় ‘অফিসে এসে কথা বলুন’-এ, তাহলে সমস্যাটির সমাধান আসলে হয়নি। প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় সশরীর যোগাযোগ দেরি, পক্ষপাত কিংবা লেনদেনের নতুন সুযোগ তৈরি করে।

জাইমার ভাষ্য, ব্রোকারেরা এই প্রক্রিয়ার ফাটলটিরই সুযোগ নেয়। মানুষ আইন ভাঙতে চায় বলে নয়, বরং সরকারি প্রক্রিয়াটি এতটাই কঠিন হয়ে ওঠে যে একজন মধ্যস্থতাকারীই সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে দাঁড়ায়। এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ এতে দুর্নীতি ব্যতিক্রম না থেকে কাজ আদায়ের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন জাইমা রহমান। তার মতে, লাইসেন্স, ফিটনেস, প্রশিক্ষণ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ চমৎকার সব নিয়ম করতে পারে। কিন্তু নিয়ম যদি বেছে বেছে প্রয়োগ হতে দেখা যায়, মানুষ দ্রুতই সেসব নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন নতুন চালককে বলা হচ্ছে নিয়ম মানা অপরিহার্য, অথচ চোখের সামনেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেপরোয়া চালনা ও নানা লঙ্ঘন চলছে কেন?

জাইমা বলেন, দুর্নীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা কেবল অন্যায়টি ঘটা নয়, সেটির প্রতিকার কীভাবে হয়, সেটিও। অভিযোগ করে কিছু হবে না, বরং নিজেরই বাড়তি ভোগান্তি হবে—মানুষ যদি এমনটা বিশ্বাস করে, তাহলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াটি দাঁড়ায়, ‘কী দরকার? চেনাজানা কাউকে বলি।’ আর এভাবেই বিষয়টি চলতে থাকে।

তার মতে, সড়ক নিরাপত্তা কেবল গাড়ি, লাইসেন্স আর শাস্তির বিষয় হতে পারে না। এটি হতে হবে সেই মানুষগুলোকে ঘিরে, যারা প্রতিদিন পথ চলেন।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে যাওয়া একজন শিক্ষার্থী, সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরা একজন নারী, পরের অর্ডারটি ধরার তাড়ায় থাকা একজন ফুড ডেলিভারি রাইডার, অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানো একজন বাসচালক, ব্যস্ত সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করা একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং একজন রিকশাচালক, যার বাহনটিই তার জীবিকা; একই সড়ক তাদের প্রত্যেকের কাছে সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা।

জাইমা রহমান বলেন, ভালো নীতিমালাকে এই বাস্তবতাগুলো বুঝতে হবে। তা না হলে নিয়ম উল্টো দরিদ্র বা বেশি ঝুঁকিতে থাকা সড়ক ব্যবহারকারীদের আরও গভীরভাবে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেবে। এতে শোষণ ও ঘুষের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, এসব কথা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিরাপদ সড়কের দাবিতে তরুণেরা বছরের পর বছর কথা বলে আসছেন। ২০১৮ সালে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল, লাইসেন্স পরীক্ষা করেছিল, যানবাহন চলাচল সামলানোর চেষ্টা করেছিল এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। আট বছর পরও সেই উদ্বেগগুলোর অনেকটাই রয়ে গেছে।

জাইমা রহমান বলেন, প্রশ্নটি এখন সম্ভবত আর এই নয় যে ‘সড়ক নিরাপদ নয়’। প্রশ্নটি বরং এই, ‘সমস্যাগুলো তো আমরা আগেই চিহ্নিত করে দিয়েছি। ব্যবস্থাটি এখনো সেগুলো ঠিক করলো না কেন?’ তার মতে, এখানেই প্রশ্নটা বদলে যায়। প্রশ্ন কেবল এটি হতে পারে না যে ‘নাগরিকদের দিয়ে কীভাবে নিয়ম মানানো যাবে?’

তিনি বলেন, আমাদের এটিও জিজ্ঞাসা করা উচিত, ‘সংযোগ থাকুক বা না থাকুক, আমরা কীভাবে নিশ্চিত করবো যে সবাই একই পরিষেবা পাবে?’

এ ছাড়া তার প্রশ্ন, ‘আমরা কীভাবে আইন প্রয়োগকে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারি? কীভাবে আমরা অভিযোগ ও অন্যায় সম্পর্কে জানানোকে নিরাপদ ও সার্থক করে তুলতে পারি? এবং আমরা কীভাবে রাস্তা ডিজাইন করবো, যাতে একটি সাধারণ ভুলের কারণে কারও জীবনহানি না ঘটে?’

জাইমা রহমান বলেন, পরিবর্তন যদি আমরা সত্যিই চাই, তাহলে আমাদের ভাবনার কাঠামোটাই নতুন করে সাজাতে হবে।

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
‘চলছে না চাকা, জ্বলছে না চুলা’
গাবতলী-পোস্তগোলা ৮ লেন সড়কের স্বপ্ন কি ভেস্তে যাবে?
ট্রাক-পিকআপের সংঘর্ষে প্রাণ গেলো ৪ জনের
সর্বশেষ খবর
সিল্কের শাড়িতে তেলের দাগ তুলবেন যেভাবে
সিল্কের শাড়িতে তেলের দাগ তুলবেন যেভাবে
জুয়া খেলার সময় পুলিশের ভয়ে নদীতে ঝাঁপ, একদিন পর লাশ উদ্ধার
জুয়া খেলার সময় পুলিশের ভয়ে নদীতে ঝাঁপ, একদিন পর লাশ উদ্ধার
‘চলছে না চাকা, জ্বলছে না চুলা’
‘চলছে না চাকা, জ্বলছে না চুলা’
মাথায় ডাস্টবিন পরা প্রার্থীকে নির্বাচনে হারালেন নাইজেল ফারাজ
মাথায় ডাস্টবিন পরা প্রার্থীকে নির্বাচনে হারালেন নাইজেল ফারাজ
সর্বাধিক পঠিত
বন্ধ হলো সামিটের এলএনজি সরবরাহ, ‘বাড়বে’ ভোগান্তি
বন্ধ হলো সামিটের এলএনজি সরবরাহ, ‘বাড়বে’ ভোগান্তি
ডাকবাংলোতে ডেকে কর্মকর্তাকে পেটালেন পৌরসভার সিইও, ডিসি বললেন র‌বিবা‌রের ম‌ধ্যে বদ‌লি
ডাকবাংলোতে ডেকে কর্মকর্তাকে পেটালেন পৌরসভার সিইও, ডিসি বললেন র‌বিবা‌রের ম‌ধ্যে বদ‌লি
বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে আল-কায়েদা, সতর্ক করলো জাতিসংঘ
বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে আল-কায়েদা, সতর্ক করলো জাতিসংঘ
‘শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের সমাপ্তি’, নতুন জীবন শুরু করতে চান ছাত্রদলের রাকিব 
‘শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের সমাপ্তি’, নতুন জীবন শুরু করতে চান ছাত্রদলের রাকিব 
একসঙ্গে এক থানার দুই কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
একসঙ্গে এক থানার দুই কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত