‘চলছে না চাকা, জ্বলছে না চুলা’

ইমরান আলী
১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৩১আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৩১

একদিকে সিএনজি গ্যাসের তীব্র সংকট। পাম্পে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে ‘সোনার হরিণ’ গ্যাস। যেটুকু মিলছে, তা দিয়ে চলছে দু-একটি ট্রিপ। এরপর আবার পাম্পে গাড়ি, আবারও অপেক্ষা। এভাবেই চলছে গ্যাসচালিত সিএনজি ও প্রাইভেট কার। এতে গেলো গাড়ির দুর্ভোগ। আর বাসাবাড়ির দুর্ভোগ আরও চরমে। গ্যাস না থাকায় বিকল্প উপায়ে রান্না করছেন গৃহিণীরা। আর নিম্ন আয়ের মানুষেরা বেছে নিয়েছেন লাকড়ি। সরেজমিনে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টা। রাজধানীর হাজীপাড়া সিএনজি পাম্প। সিএনজি-চালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারে চলছে গ্যাস সরবরাহ। কিন্তু এই গ্যাস নিতে যেন রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। রাত ৮টায় সিরিয়াল দিয়ে ভোর ৫টায় গ্যাস মিলেছে। আর যারা ভোর ৩টার দিকে এসেছেন, তারা তখনও সিরিয়ালে রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাজীপাড়া সিএনজি পাম্পের দুই দিকে গাড়ির বিশাল সিরিয়াল। উত্তর দিকের প্রায় দুই কিলোমিটার সিরিয়াল বিটিভি পার হয়ে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত ঠেকেছে। আর অন্য পাশের সিরিয়াল মালিবাগ মোড়ের ডান পাশে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের কাছাকাছি। সেখানেও প্রায় দেড় কিলোমিটার লাইন।

প্রাইভেট কারের জন্য গ্যাস নিতে অপেক্ষারত সোহেল রানা বলেন, ‘গ্যাসের এই সিরিয়াল আমি জীবনেও দেখিনি। সিরিয়াল কম হবে দেখে ভোর ৪টার দিকে আসছিলাম। দেখি বিটিভি পর্যন্ত চলে আসছে। আর ওই দিকে খিলগাঁও ফ্লাইওভার পর্যন্ত। এখন চিন্তা করছি সিরিয়াল কোন দিকে দেবো। অবশেষে বিটিভির দিকে সিরিয়াল দিয়ে রামপুরা বাজারও পার হতে পারলাম না। তাহলে এই গ্যাস আমি কখন নেবো। আর এর মধ্যে লাইন বন্ধ হয়ে গেলে তো সর্বনাশ।’

চালক সুমন বলেন, ‘ড্রাইভারি জীবনে গ্যাসের জন্য কেউ এ রকম কষ্ট করেছে কি না, আমি জীবনে দেখিনি। ভোর ৪টায় এসে এখন সাড়ে ৬টা। এখনো অন্তত আরও আড়াই ঘণ্টা হলে আমি গ্যাস নিতে পারবো। তারপরও সর্বোচ্চ ২০০ টাকার গ্যাস নিতে পারবো কি না সন্দেহ।’

প্রায় ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর গ্যাস পাওয়া রিপন মিয়া বলেন, ‘গ্যাস পেলাম ১৭৯ টাকার। এখন আপনিই বলেন, এই টাকার গ্যাসে আমি চলবো কতক্ষণ?’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সব পথ বন্ধ।’

সিএনজি চালক রহিম শিকদার বলেন, ‘রাত ১২টার পর সিরিয়াল দিয়ে কিছুক্ষণ আগে ৮০ টাকার গ্যাস পেলাম। আমি বসে আছি, আরেকবার লাইনে দিয়ে যদি আরও কিছু গ্যাস পাই।’

পাম্পটির বিক্রয়কর্মী ইউসুফ বলেন, ‘যে প্রেসার রয়েছে, তাতে এর চেয়ে বেশি হচ্ছে না। তারপরও যে দেওয়া যাচ্ছে, এটাই বড়। হয়তো সকাল ৯টা নাগাদ বন্ধও হয়ে যেতে পারে।’

এদিকে শুধু হাজীপাড়া নয়, মেরুল বাড্ডার জামান ফিলিং স্টেশন, তেজগাঁওয়ের আকিজসহ মহাখালী, উত্তরা, মিরপুর, গাবতলী, কমলাপুর—সব এলাকাতেই রাত ১০টার পর থেকে বিশাল লাইন শুরু হয়। সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে এসব পাম্পের অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে যায়। আর সারারাত জেগে কাঙ্ক্ষিত গ্যাসও পান না গাড়িচালকরা। এ কারণে তারা ঠিকমতো ট্রিপ বা ভাড়াও মারতে পারেন না।

আকিজ ও জামান পাম্পের বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানান, অধিকাংশ সময় দিনের বেলায় গ্যাস থাকে না। থাকলেও প্রেসার একেবারে কম। এ কারণে তারা দিনের বেলায় পাম্প বন্ধ রাখেন।

ভুক্তভোগী চালকরা বলছেন, পূর্বে একটি সিএনজি গাড়িতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আর প্রেসার ভালো থাকলে কখনো ৫০০ টাকার গ্যাস পর্যন্ত ঢুকতো। সারাদিন চালিয়ে রাতের বেলায় গ্যাস নিয়ে বাসায় গিয়ে পরের দিন আবার ভাড়া মারতে পারতেন। আর এখন কোনো কিছুই ঠিক নেই। কখন বাসায় আর কখন গাড়ি নিয়ে ভাড়া—সবকিছু এলোমেলো। চাকায় ঠিকমতো চলছে না গাড়ি।

সিএনজি চালক আবু বকর বলেন, ‘রাত ১০টার দিকে লাইনে দাঁড়ালে দেড়টা বা দুটার দিকে গ্যাস মিলছে। কখনো এর বেশিও সময় লাগছে। তবে গ্যাস ঢুকছে ৭০ বা ৮০, কখনো ১০০ টাকার। এরপর ঘুরে এসে আবার লাইনে দাঁড়াচ্ছি। তখন ৫০ থেকে ৬০ টাকার গ্যাস ঢুকছে। আর গ্যাস পেতে পেতে ভোর। ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত দুটি বা তিনটি ট্রিপেই গ্যাস শেষ। তিনটি ট্রিপে সর্বোচ্চ আয় হয় ১ হাজার টাকা। এরপর আবারও গ্যাসের জন্য সিরিয়াল দিতে হয়। এবার গ্যাস পেতে পেতে ৩টা। আবারও ওই দুই-তিনটি ট্রিপ। তাহলে ২ হাজার টাকা ভাড়া মেরে জমা ১২০০ দিয়ে তাহলে থাকতো কত? এর মধ্যে গ্যাস, নিজের খাওয়া-দাওয়া। তাহলে আমি কখন বাসায় যাবো। কীভাবে সংসারে টাকা দেবো। এমন দুর্দশায় চলছে আমাদের।’

সিএনজি চালক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘গত প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে আমাদের গ্যাসের এমন টানাপোড়েন চলছে। এখন আরও মারাত্মক। আমাদের গ্যাস নিতে এখন রাস্তায় রাত কাটাতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘রাস্তায় গাড়ি সিরিয়াল দিতে আগে পুলিশে ঝামেলা করলেও এখন আর করে না। কারণ তারাও বুঝতেছে সমস্যার কারণেই রাস্তায় পার্ক করা হয়েছে।’

দুর্ভোগের গল্পটা সড়কেই শেষ হয় না। বাসাবাড়িতেও চলছে গ্যাসের জন্য হাহাকার। দু-একদিন আগে গ্যাস মিটমিট করে আসলেও বৃহস্পতিবার-শুক্রবার থেকে টোটাল বন্ধ হয়ে আছে। চুলায় বারবার ফায়ার মারলেও কাজ হয় না।

বনশ্রীর গৃহবধূ আসমা খানম বলেন, ‘গ্যাস টোটালি বন্ধই। বারবার চুলা জ্বালিয়ে চেষ্টা করলেও গ্যাস পাওয়া যায় না। গত এক মাসের অধিক সময় এই দুর্ভোগ রয়েছে। এখন এমন একটা অবস্থা, গ্যাসই নাই হয়ে গেছে। আমরা এখন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করি। কিন্তু  সেখানেও ভোগান্তি আছে। বিদ্যুৎও সবসময় থাকে না। রান্নার মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেকসময় খাবারও নষ্ট হয়।’

রামপুরার গৃহবধূ সেলিনা আকতার বলেন, ‘গ্যাসই জ্বলে না, কী আর রান্না করবো। আগে রাতে একটু করে আসতো। কিন্তু এখন রাত-দিন সমান হয়ে গেছে। ইলেকট্রিক চুলা ছাড়া আর রান্না করা যাচ্ছে না।’

বাড্ডার গৃহবধূ আরিফা আক্তার বলেন, ‘লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছি আমরা। গ্যাস না থাকায় এভাবে রান্না করতে হচ্ছে। আমাদের মতো গরিব মানুষরা ইলেকট্রিক চুলা কিনতে পারে না। তারা এখন এভাবেই রান্না করছে।’

রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, আগারগাঁও, রামপুরা, মালিবাগ, মগবাজার, পুরান ঢাকাসহ সব এলাকাতেই বাসাবাড়ির গ্যাস সমস্যা চলছে বলে জানা যায়।

প্রসঙ্গত, গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) কারিগরি সমস্যা এবং বৈরী আবহাওয়া। দুটি এফএসআরইউয়ের ওপর দেশের এলএনজি সরবরাহ নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির পর সরবরাহ কমে যায়। পরে গতকাল বিকাল থেকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্য টার্মিনালও স্বাভাবিকভাবে এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না। এতে গ্যাস সংকট আরও চরম আকার ধারণ করেছে।

সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে। সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি নতুন করে দেড়শ কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের দায় বর্তমান সরকারের নয়। অন্যদিকে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশীয় উৎপাদন ঘাটতির কারণে গ্যাস আমদানি করতে হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় রাতারাতি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়।

বর্তমানে দেশে সাগরে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। গ্যাস আমদানি বাড়াতে ২০২৪ সালে সামিট গ্রুপের সঙ্গে তৃতীয় একটি এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি হলেও অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিমের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল বাতিলের ফলে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত প্রস্তুতির দিক থেকে দুই-তিন বছর পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন করে চীনের সঙ্গে জিটুজি চুক্তিতে দুই বছরের মধ্যে একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ ছাড়া মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ল্যান্ডবেইজ এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় লাগবে। ফলে দুর্ঘটনাকবলিত এলএনজি টার্মিনাল মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলমান গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধানের সুযোগ সীমিত। টার্মিনালটি মেরামত হলে বর্তমান তীব্র সংকট কিছুটা কমতে পারে বলে সরকারও জানিয়ে আসছে। 

/ইউএস/
সম্পর্কিত
ছুটির দিনে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে ভিড়, প্রবেশে ভোগান্তি
মোহাম্মদপুরে কোনো কিশোর গ্যাং সক্রিয় নেই: র‌্যাব
১৫ আগস্ট ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার ডিএমপির
সর্বশেষ খবর
স্কুলছাত্র আশরাফুল নিখোঁজের জট খুললো ৩ বছর পর, মূল আসামি গ্রেফতার
স্কুলছাত্র আশরাফুল নিখোঁজের জট খুললো ৩ বছর পর, মূল আসামি গ্রেফতার
এনসিপির সাবেক নেতাকে পিটিয়ে থানায় সোপর্দ
এনসিপির সাবেক নেতাকে পিটিয়ে থানায় সোপর্দ
নীল সমুদ্র আর প্রবালপ্রাচীরের টানে ঘুরে আসুন শার্ম এল শেখ
নীল সমুদ্র আর প্রবালপ্রাচীরের টানে ঘুরে আসুন শার্ম এল শেখ
সিল্কের শাড়িতে তেলের দাগ তুলবেন যেভাবে
সিল্কের শাড়িতে তেলের দাগ তুলবেন যেভাবে
সর্বাধিক পঠিত
বন্ধ হলো সামিটের এলএনজি সরবরাহ, ‘বাড়বে’ ভোগান্তি
বন্ধ হলো সামিটের এলএনজি সরবরাহ, ‘বাড়বে’ ভোগান্তি
ডাকবাংলোতে ডেকে কর্মকর্তাকে পেটালেন পৌরসভার সিইও, ডিসি বললেন র‌বিবা‌রের ম‌ধ্যে বদ‌লি
ডাকবাংলোতে ডেকে কর্মকর্তাকে পেটালেন পৌরসভার সিইও, ডিসি বললেন র‌বিবা‌রের ম‌ধ্যে বদ‌লি
বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে আল-কায়েদা, সতর্ক করলো জাতিসংঘ
বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে আল-কায়েদা, সতর্ক করলো জাতিসংঘ
‘শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের সমাপ্তি’, নতুন জীবন শুরু করতে চান ছাত্রদলের রাকিব 
‘শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের সমাপ্তি’, নতুন জীবন শুরু করতে চান ছাত্রদলের রাকিব 
একসঙ্গে এক থানার দুই কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত
একসঙ্গে এক থানার দুই কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত