বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দৃশ্যমান কোনও সাফল্য দেখা যায়নি বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হয়েছে। সরকার গণভোটের রায় কার্যকর করেনি, বরং প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। গণভোট নিয়ে সরকারের এমন অবস্থানে জাতি ও গোটা বিশ্ব বিস্মিত।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে এবং প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানে বিরোধী দল সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলেও তা বাস্তবায়নে সরকার কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় লোক নিয়োগ করছে। সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের সরিয়ে দলীয় লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ সরকারের উচিত ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্বে বসানো। একইভাবে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সরকারি চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে এখন আর যোগ্যতা, মেধা, পরীক্ষা ও ভাইভার প্রয়োজন হয় না, বিএনপি করাই যোগ্যতা। সরকারি অফিসগুলো যেন বিএনপি নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্পাসগুলোতেও সরকার শৃঙ্খলা ফেরাতে পারছে না। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যরা ছাত্রদলকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, গত ছয় মাসের অর্থনৈতিক সূচক, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে সরকারের মেয়াদের প্রধান অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়। এর মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার সংকট, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ, ডলারের বিনিময় হার এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামের অস্থিরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অব্যাহত থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, বিদেশি বিনিয়োগ ও রফতানি কমছে এবং প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমেছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেনি। বরং চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, চাকরিবিধি মেনে রাজনীতি করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি করতে না দেওয়ার মতো আইন বা বিধি সরাসরি সংবিধানবিরোধী।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলের এমপিদের ওপর সরকারদলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তদারকির জন্য। এটি সংবিধানবিরোধী। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিরোধী দলের এমপিদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জনপ্রশাসন নিয়েও অভিযোগ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের মতাদর্শের অনুসারী নন—এমন সৎ কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হচ্ছে, পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না এবং অহেতুক বদলি করা হচ্ছে। সরকার ফ্যাসিবাদী আমলের পথে হাঁটছে। সরকারি প্রশ্রয়ে ফ্যাসিবাদের অনুসারী আমলারা পদায়ন ও পদোন্নতি পাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে সরকারের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, রিজার্ভের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তবে এটিকে সরকারের কৃতিত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের কারণেই রিজার্ভে স্থিতিশীলতা এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা চাই না সরকার ব্যর্থ হোক। তবে সরকারের জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিরোধী দল সংসদে ও রাজপথে সোচ্চার থাকবে। সংসদ ও সংসদের বাইরে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তারা হরতাল কিংবা জ্বালাও-পোড়াওয়ের পথে হাঁটছেন না।
গণভোটের রায় না মানার বিষয়ে জনগণের কাছে সরকারকে জবাব দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের এই নেতা।
বিরোধী দলের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত তাদের ছয় নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। তাদের এমপিদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে এবং হেলমেট পরে ফ্যাসিবাদী কায়দায় হামলা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে রাজনীতিতে সংঘাত না চেয়ে দেশকে শান্তির দিকে নিতে চান বলে জানান গোলাম পরওয়ার। এ জন্য নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, আবদুর রব, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।









