রাষ্ট্র পরিচালনার ছয় মাসের মাথায় গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়ে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। নতুন করে যোগ হচ্ছে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ নিয়ে সরকার কোনও চাপ অনুভব করছে কিনা, রাজনৈতিক মহলে এমন জোর আলোচনা চলছে। যদিও সরকারি দলের দাবি, এরইমধ্যে নির্বাচনি ইশতেহারের ৩১ দফার বেশিরভাগই সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা ও খাল খননসহ বেশ কিছু কর্মসূচি শেষের পথে।
প্রথম দিকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ছিল স্বাভাবিক। মার্চ-এপ্রিলে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় জ্বালানি সংকট দেখা দিলে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক ঐক্য হয়। এতে সংকট থেকে সাময়িকভাবে উতরে যায় সরকার।
তবে মধ্য জুলাই থেকে আবারও জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কবলে পড়েছে দেশ। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই এ নিয়ে হাহাকার চলছে। শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি ও বিপণিবিতানে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে। আবারও পাম্পে দীর্ঘ লাইন আর চুলায় গ্যাসের চাপ কমেছে। এ নিয়ে সরকারও উদ্বিগ্ন। প্রধানমন্ত্রী ও দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের সাম্প্রতিক মন্তব্যেও এর কিছুটা চিত্র ফুটে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে জনগণকে ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আরও দুই বছর লাগবে। অপরদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দেওয়া কঠিন হতে পারে।’
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির এমন পরিস্থিতিতে সরকারের মধ্যে নতুন চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলের রাজপথের আন্দোলন ও ডিসেম্বরে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শঙ্কা সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে বলে মনে করেন দলীয় চেয়ারম্যানের এক উপদেষ্টা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, তারপরও বিষয়টি নিয়ে সরকার কৌশল নির্ধারণ করবে।
দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটের শঙ্কা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং দুই মন্ত্রীর মন্তব্যে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে স্পষ্টতই মনে করেন অনেকে। গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশের চলমান জ্বালানি সংকট সমাধানে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে। আর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিষয়ে ছয় মাসের মধ্যে কোনও কিছুরই সমাধান সম্ভব নয়।’
তার আগে গত ১৪ আগস্ট নিজ জেলা সিরাজগঞ্জে এক সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এত ঋণ করে গেছে যে, ঠিকমতো পরিকল্পনা না করলে একদিন সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে।’
অবশ্য এ বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর মহাখালীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে আগামী ২৭ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে ১০ বছর মেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, সংকট নিরসনে সরকার কাজ করছে। এ নিয়ে তিনি জনগণকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান। এছাড়াও বিরোধী দলের ভালো কোনও পরামর্শ গ্রহণেরও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কর্মসূচি নিয়ে চিন্তার ভাঁজ!
দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের উদ্বিগ্নতার মধ্যেই সরকারের দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা জানান দিচ্ছে। গত ৯ আগস্ট রাজধানীতে এক সমাবেশে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে বিভাগীয় সদর পর্যন্ত লংমার্চ এবং ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের কথা জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
অপরদিকে গত ৫ আগস্ট ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অডিও বার্তায় ঘোষণা করেছেন, ডিসেম্বরে তিনি যেকোনও মূল্যে দেশে ফিরতে চান। এরপর তার দলের নেতাকর্মীরাও দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল বের করছেন। এই দুই রাজনৈতিক শক্তি আগামী দিনে রাজপথ উত্তপ্ত করলে সরকার বা বিএনপি কীভাবে মোকাবিলা করবে? এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি কারও গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করে না। বিরোধী দল তাদের গঠনমূলক কাজ তো করছেই। তবে ধ্বংসাত্মক কোনও কর্মসূচি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা দেখবে। বিএনপি পরিস্থিতি অনুযায়ী অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবে। এছাড়া নিষিদ্ধ কোনও সংগঠন কী ঘোষণা দিয়েছে, সেটা অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার বিষয়।’ এ নিয়ে সরকারের আলাদা উদ্বিগ্নতা নেই বলে তার দাবি।
একলা চলো নীতি, নাকি রাজনৈতিক সমঝোতা?
দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে সরকারের মধ্যে উদ্বেগের পাশাপাশি দলগতভাবে বিএনপি এক ধরনের চাপ অনুভব করছে বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান দলীয় এক সংসদ সদস্য।
তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী যেকোনও সংকটকালে অংশীজনদের নিয়ে পথচলার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের স্বার্থে তিনি যেকোনও ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি যুগপৎ শরিকদের অভিমান ভাঙাতে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন। তাদের কথা শুনেছেন। আগামী দিনে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনে বিরোধী দলের সঙ্গেও আলোচনা করবেন তিনি।’ তার দাবি, এ ক্ষেত্রে একলা চলো নীতি চায়নি দলটি।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার তেমন চাপে নেই। একটি নতুন সরকার, মাত্র ছয় মাস অতিক্রম করলো। আগের সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি রেখে গেছে। গ্যাসের সংকট আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে থেকেই ছিল। জ্বালানি ছিল আমদানি-নির্ভর। সাগর থেকে তারা গ্যাস উত্তোলন করলে তো এমন পরিস্থিতি হতো না। তবে সরকার গ্যাস উত্তোলনসহ সংকট নিরসনে আপ্রাণ চেষ্টা করছে।’
বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে দুদু বলেন, ‘তারা তো বিনা বাধায় তাদের কাজ করছে। তারা কী ধরনের কর্মসূচি দেবে, সেটা তাদের ব্যাপার।’
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার বিষয়ে দুদু বলেন, ‘বিগত দেড় দশকে তারা গণহত্যা করেছে। কিন্তু তাদের কোনও অনুশোচনা নেই। দলটির চরিত্রেরও কোনও পরিবর্তন নেই। বরং তারা নানা ধরনের উসকানি দিয়েই যাচ্ছে। তারা এখনও জাতির কাছে ক্ষমাও চায়নি। এমন পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ শেখ হাসিনাকে ফিরতে দেবে বলে মনে হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব সময়ই উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। সংকট নিরসনের বিষয়ে তিনি তাদের যেকোনও ভালো প্রস্তাব গ্রহণ করার কথা বলেছেন।’ প্রয়োজনে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনাও হতে পারে বলে তিনি জানান।

সরকার উল্টো পথে হাঁটছে: আখতার হোসেন
ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ বাস্তবায়নে জামায়াতের বৈঠক
সরকার ছয় মাসে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি: জামায়াত







