অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৫২আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৫২

দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাভুক্ত ১১৭টি ওষুধের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রেখেছে ওষুধ কোম্পানিগুলো। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের দাম সমন্বয় না হওয়ায় এসব ওষুধ উৎপাদনে লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি)। 

ফলে তালিকাভুক্ত অনেক ওষুধ বাজারে সহজলভ্য না হওয়ায় রোগীদের তুলনামূলক বেশি দামের বিকল্প ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। 

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাপির কার্যালয়ে ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সংগঠনটির নেতারা এসব তথ্য তুলে ধরেন। সভায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ, মূল্য নির্ধারণের নীতিমালা সংস্কার এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়। 

বাপির নেতারা বলেন, “বর্তমানে ১৯৯৪ সালের মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। গত ৩২ বছরে মাত্র দুবার এসব ওষুধের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। যদিও বছরে গড়ে ৮ শতাংশ হারে মূল্য সমন্বয়ের কথা ছিল।” 

তাদের দাবি, এই দীর্ঘ সময়ে মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামসহ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী ওষুধের দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে অনেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন আর্থিকভাবে টেকসই থাকছে না। 

বাপির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, “১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতি দেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ওই সময় ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৯টি ওষুধ উৎপাদনের জন্য নিবন্ধন করা হয়নি। ফলে ৯৮টি ওষুধের প্রাপ্যতা ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।” 

তিনি বলেন, “বর্তমানে এসব ওষুধের অনেকগুলোর উৎপাদন খরচই বিক্রয়মূল্য থেকে উঠে আসে না। দাম সমন্বয় না হওয়ায় প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।” 

সমিতির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, “ওষুধ শিল্পকে শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।” 

তিনি বলেন, “অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার বিষয়ে ওষুধ শিল্পের মালিকদের কোনও আপত্তি নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে ওষুধের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত ও নিয়মিত সমন্বয়যোগ্য একটি প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন।” 

ডা. জাকির হোসেন বলেন, “প্রয়োজনীয় ওষুধ সুলভ মূল্যে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সরকার চাইলে ভর্তুকি অথবা সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে কম দামে এসব ওষুধ সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু কোনো ধরনের ভর্তুকি ছাড়া বেসরকারি উৎপাদনকারীদের দীর্ঘদিন কম দামে ওষুধ উৎপাদনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।” 

রাষ্ট্রায়ত্ত এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) সঙ্গে বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোর সরাসরি তুলনা করাও যৌক্তিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ইডিসিএলের নির্দিষ্ট সরকারি ক্রয়াদেশ ও নিশ্চিত বাজার রয়েছে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বিপণন ব্যয়ের চাপও তাদের বহন করতে হয় না। 

সরকার চাইলে ইডিসিএলের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে সরকারি হাসপাতালের রোগীদের বিনা মূল্যে অথবা কম দামে সরবরাহ করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাপির মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান। তিনি বলেন, “কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোকে জেনারেটর, বড় ইউপিএস ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।” 

তিনি বলেন, “ওষুধ উৎপাদনের প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে তা মাঝপথে বন্ধ করা যায় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে কারখানাগুলোতে জেনারেটর ও বড় ইউপিএসের ব্যাকআপ রাখতে হয়।” 

গ্যাসের সংকটে জেনারেটর চালাতেও ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত ডিজেল মজুতের সক্ষমতা নেই। মজুত শেষ হয়ে গেলে দ্রুত বাজার থেকে ডিজেল সংগ্রহ করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।” 

বাপির নেতারা বলেন, “অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছ, টেকসই ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।” একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

/জিএম/এসটি/ 
সম্পর্কিত
উপসর্গ মিললেই ওষুধ নয়, ইন্টারনেট দেখে চিকিৎসা নিতে যেসব সাবধানতা অবলম্বন করবেন
ওষুধের মূল্যনিয়ন্ত্রণ নীতি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
‘অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ বাতিলে সরকারি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের
সর্বশেষ খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
ট্রাফিক আইন ভাঙায় রাজধানীতে একদিনে ২৩৮৩ মামলা
ট্রাফিক আইন ভাঙায় রাজধানীতে একদিনে ২৩৮৩ মামলা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নে যা বললেন আইনমন্ত্রী
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নে যা বললেন আইনমন্ত্রী
রহস্য উদঘাটন করে পিবিআই বলছে ঘটনাটি ‘গোপন সম্পর্কের’ বলি
রহস্য উদঘাটন করে পিবিআই বলছে ঘটনাটি ‘গোপন সম্পর্কের’ বলি
সর্বাধিক পঠিত
শেখ হাসিনার আত্মীয় বলায় যা বললেন আন্দালিভ রহমান পার্থ
শেখ হাসিনার আত্মীয় বলায় যা বললেন আন্দালিভ রহমান পার্থ
প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকবেন ৩ মন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকবেন ৩ মন্ত্রী
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
ঘুম থেকে তুলে ছেলেকে পুলিশের হাতে দিই, গায়ে ছিল গেঞ্জি: সিদ্ধার্থের বাবা
বিদ্রোহী শিবির ঘুরে আবারও মমতার কাছে ফিরলেন কাসেম সিদ্দিকী
বিদ্রোহী শিবির ঘুরে আবারও মমতার কাছে ফিরলেন কাসেম সিদ্দিকী
৫০ পেরিয়ে যে সত্যটা অনেকেই প্রথমবার বুঝতে পারেন
৫০ পেরিয়ে যে সত্যটা অনেকেই প্রথমবার বুঝতে পারেন