কী, কেন, কীভাবে

যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেন ১০ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ সরিয়ে নিলো নেদারল্যান্ডস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৫৫আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৫৫

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের মজুত সরিয়ে যুক্তরাজ্যে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডাচ সেন্ট্রাল ব্যাংক (ডিএনবি) বলছে, বড় ধরনের সংকট মোকাবিলায় আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতেই এই সিদ্ধান্ত।

বুধবার ডিএনবি জানায়, স্বর্ণের মজুত সরানোর মাধ্যমে এগুলোকে আরও সহজে লেনদেনযোগ্য করা হয়েছে। তবে কোন ধরনের সংকটের জন্য এই প্রস্তুতি, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি ব্যাংকটি।

ডিএনবির প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লেইপেন বলেন, এই স্থানান্তরের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বর্ণের মজুত আরও সহজে লেনদেনযোগ্য করেছি। আমরা আশা করি, কখনোই এগুলো ব্যবহার করতে হবে না। তবে আমাদের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে হবে।

নেদারল্যান্ডসের কাছে কত স্বর্ণ আছে

নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণের মজুত ৬১২ দশমিক ৪ টন। এর মূল্য প্রায় ৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো বা ৮৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। সম্ভাব্য সংকটে নিয়মিত আর্থিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়লে এসব স্বর্ণ নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করতে পারে।

ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত বিভিন্ন স্থানে স্বর্ণের মজুত রাখে। নেদারল্যান্ডসও তার স্বর্ণ নিজ দেশে এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখে।

আগে নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল জেইস্টে, ১৮ দশমিক ১ শতাংশ লন্ডনে, ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ নিউইয়র্কে এবং ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ অটোয়ায়।

স্বর্ণ সরানোর পর লন্ডনে নেদারল্যান্ডসের মজুত বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ। জেইস্টে রয়েছে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ, নিউইয়র্কে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অটোয়ায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

কীভাবে সরানো হলো

স্থানান্তর করা স্বর্ণের মূল্য ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ছিল প্রায় ১০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ইউরো বা ১১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার। বুধবার স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায় এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইউরো।

দুইভাবে স্বর্ণ সরানো হয়েছে। একদিকে নিউ ইয়র্কে স্বর্ণ বিক্রি করে লন্ডনে স্বর্ণ কেনা হয়েছে। অন্যদিকে কিছু স্বর্ণের বার সরাসরি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া হয়েছে।

ডিএনবি জানায়, নিউইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করা হয়। এর মূল্য ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এরপর লন্ডনে স্বর্ণ কেনা হয়।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ জেইস্টে নেওয়া হয়। এর মূল্য ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। একই পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাজারের মানসম্পন্ন স্বর্ণ জেইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। এতে স্বর্ণের বার গলিয়ে নতুন করে তৈরির প্রয়োজন হয়নি।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মূল্য হিসাবে নিউইয়র্ক থেকে মোট প্রায় ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ সরানো হয়েছে। অটোয়া থেকে সরানো হয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি মূল্যের স্বর্ণ।

ডিএনবি বলেছে, সাম্প্রতিক স্থানান্তরের পর নেদারল্যান্ডসের স্বর্ণের মজুত এখন ভৌগোলিকভাবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দুই দেশেই এখন ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ করে স্বর্ণ রয়েছে।

কেন সরানো হলো

ডিএনবির ভাষ্য, স্বর্ণ সরানোর সিদ্ধান্তটি ঝুঁকি কমানোর কৌশলের অংশ। কেনাবেচা ও সরাসরি পরিবহন দুই পদ্ধতি ব্যবহার করায় একটি জটিল স্থানান্তর কার্যক্রমের ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষতা ও খরচের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

ব্যাংকটি বলেছে, ভবিষ্যতে কোনও সংকটের সময় আবার স্বর্ণ সরানোর প্রয়োজন হলে এই দুই পদ্ধতির অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। পরিস্থিতির কারণে কোনও একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা অসম্ভব হলে অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে। এটি সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মঙ্গলবারের এক বিবৃতিতে ডিএনবি বলেছে, তারা স্বর্ণের মজুত এমন জায়গায় রাখতে চায়, যেখানে প্রয়োজনে তা সহজে লেনদেনযোগ্য হবে। এ ক্ষেত্রে লন্ডনকে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচনা করছে তারা।

ডিএনবি বলেছে, স্বর্ণকে চূড়ান্ত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়, কারণ চরম ব্যবস্থাগত ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে এটি আদর্শ।

ব্যাংকটির মতে, নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় থাকা স্বর্ণের মজুত এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। তবে কোন ধরনের ব্যবস্থাগত ঝুঁকি মোকাবিলার কথা বলা হচ্ছে, তা ডিএনবি ব্যাখ্যা করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন

নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্তের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ি খাতের ওপর শুল্ক আরোপ করে। চলতি বছরের আগস্টে বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর কানাডার ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন।

জবাবে অটোয়া ২০ বিলিয়ন ডলারের ৭০০টির বেশি মার্কিন পণ্যের ওপর ১৫, ২৫ ও ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এসব শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা।

এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধও চলছে। একই সময়ে কিউবার আশপাশে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। এরপর ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন চুক্তিও করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন বেড়েছে। ইরানের যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর অংশ না নেওয়ায় ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গত বছর গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে ইউরোপীয় দেশগুলোকে বাণিজ্য শুল্কের হুমকিও দেন তিনি।

চলতি বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোকে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সংগ্রহের কথা বলেন। তার মন্তব্যের আগে ফ্রান্স ইসরায়েলি বিমানকে অস্ত্র নিয়ে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারে বাধা দেয়। ইতালি মার্কিন বোমারু বিমানকে সিসিলিতে অবতরণের অনুমতি দেয়নি। স্পেন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। যুক্তরাজ্য ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিলেও যুদ্ধে জড়ায়নি।

ট্রাম্প তখন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক স্পষ্টতই আগের মতো নেই।

রাশিয়ার সম্পদ জব্দের প্রভাব

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম সম্পদ জব্দ করে। এটি রাশিয়ার মোট ৬৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের প্রায় অর্ধেক।

২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জি৭ দেশগুলো জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে অর্জিত মুনাফা ব্যবহার করে ইউক্রেনের জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্যাকেজ তৈরির ব্যবস্থা করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ জব্দ রাখার সিদ্ধান্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর রাখার বিষয়েও একমত হয় ইইউ।

আর কোন দেশ স্বর্ণ সরিয়েছে

এ বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ সরানো প্রথম দেশ নয় নেদারল্যান্ডস।

জানুয়ারিতে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক দ্য ফ্রান্স নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা ১২৯ টন স্বর্ণ ফ্রান্সে ফিরিয়ে নেয়। এর মূল্য ছিল প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। কারিগরি উন্নয়ন ও আরও ভালো মুনাফার কারণ দেখিয়ে নিউইয়র্কে স্বর্ণ বিক্রি করে প্যারিসে স্বর্ণের বার কেনা হয়।

এর আগে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে জার্মানি নিউইয়র্ক থেকে ৬০০ টনের বেশি স্বর্ণ ফ্রাঙ্কফুর্টে সরিয়ে নেয়। এর মূল্য ছিল প্রায় ৭৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। জার্মানি জানিয়েছিল, জাতীয় স্বর্ণের মজুত আরও নিরাপদ রাখতেই এই স্থানান্তর করা হয়েছিল।

সূত্র: আল জাজিরা

/এএ/
সম্পর্কিত
‘হাবিবি, কাম টু ইরান’: হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে খোঁচা তেহরানের
মালয়েশিয়ায় মাল্টিপল ভিসায় কড়াকড়ি, সুযোগ পাবে মাত্র ৩১ দেশ
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভিডিও ছাড়ায় আদমজী ক্যান্টনমেন্টের ছাত্রকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেলো পুলিশ
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভিডিও ছাড়ায় আদমজী ক্যান্টনমেন্টের ছাত্রকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেলো পুলিশ
পোশাকের অর্ডার ও উৎপাদন কমেছে: রফতানি বাড়লো কীভাবে  
পোশাকের অর্ডার ও উৎপাদন কমেছে: রফতানি বাড়লো কীভাবে  
‘হাবিবি, কাম টু ইরান’: হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে খোঁচা তেহরানের
‘হাবিবি, কাম টু ইরান’: হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে খোঁচা তেহরানের
মালয়েশিয়ায় মাল্টিপল ভিসায় কড়াকড়ি, সুযোগ পাবে মাত্র ৩১ দেশ
মালয়েশিয়ায় মাল্টিপল ভিসায় কড়াকড়ি, সুযোগ পাবে মাত্র ৩১ দেশ
সর্বাধিক পঠিত
জেমস-রথীর সেই পুরোনো ছবি, আজ শুধুই স্মৃতি
জেমস-রথীর সেই পুরোনো ছবি, আজ শুধুই স্মৃতি
কেন ভারত ছাড়লেন আনুশকা-বিরাট? মুখ খুললেন মাধুরীর স্বামী
কেন ভারত ছাড়লেন আনুশকা-বিরাট? মুখ খুললেন মাধুরীর স্বামী
বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভাস্কর্য
বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের ভাস্কর্য
জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপি নজরুল ইসলামকে নিয়ে স্পিকার বললেন, ‘জিএম তো নাই’
জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপি নজরুল ইসলামকে নিয়ে স্পিকার বললেন, ‘জিএম তো নাই’
রুশদের পা ধরেও রেহাই পাইনি, প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ বাংলাদেশি মারা গেছেন
রুশদের পা ধরেও রেহাই পাইনি, প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ বাংলাদেশি মারা গেছেন