অ্যান্টিবায়োটিক সেবনকালে মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার (মাইক্রোবায়োম) গুরুতর ক্ষতি করতে পারে, যা পরবর্তীতে শরীরের জন্য মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
মেমোরিয়াল স্লোয়ান কেটারিং ক্যান্সার সেন্টার, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ল্যাঙ্গোন হেলথ এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের সিটি অব হোপ ক্যান্সার সেন্টারের গবেষকদের যৌথ পরিচালনায় গবেষণাটি সম্পন্ন হয়। স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে টানা অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা নেওয়া ১৭৩ জন ক্যান্সার রোগীর সংগৃহীত ১ হাজারের বেশি মল নমুনা এবং হাসপাতালে তৈরি ৯ হাজার ৪০০টিরও বেশি খাবারের ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয়।
মানবদেহের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন সংখ্যক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্যান্য অণুজীব বাস করে, যা হজম, প্রয়োজনীয় ভিটামিন তৈরি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রক্ষা এবং মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার (যেমন সেরোটোনিন) তৈরিতে ভূমিকা রাখে। সাধারণ নিয়মে, অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য যত বেশি হয়, স্বাস্থ্য তত ভালো থাকে এবং তা ক্ষতিকর অণুজীবকে (প্যাথোবায়োন্টস) বাসা বাঁধতে বাধা দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের সময় প্রতি ১০০ গ্রাম (৩.৫ আউন্স) মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণের ফলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য প্রায় ২৪ শতাংশ হ্রাস পায়। এতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া কমে যায় এবং এন্টেরোকক্কাস ফেসিয়াম-এর মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এই ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের দেয়াল ভেদ করে রক্তে প্রবেশ করলে সেপসিস কিংবা স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পর ‘গ্রাফ্ট ভার্সেস হোস্ট ডিজিজ’-এর মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। এমনকি গড় মাত্রার চেয়ে বেশি মিষ্টি খাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনের পর মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে।
মেমোরিয়াল স্লোয়ান কেটারিংয়ের চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ড. জোনাথন পেলড বলেন, এই গবেষণাকে অন্য গবেষণা থেকে আলাদা করেছে কারণ এখানে রোগীদের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম ও পুষ্টির অবস্থা উভয়ই ক্যান্সার চিকিৎসার কারণে ব্যাহত হচ্ছিল।
তিনি আরও বলেন, আমরা ডেটা নানাভাবে বিশ্লেষণ করেছি। যে বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে তা হলো, যে ধরনের চিনিই হোক না কেন, বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত অতিরিক্ত চিনি, তা মাইক্রোবায়োমের ক্ষতি করার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে যৌথভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
ইঁদুরের ওপর গবেষণাতেও দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি খাওয়ালে ছয় দিনের মধ্যে এন্টেরোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ ৩৩ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
গবেষণায় যুক্ত না থাকা হিউস্টনের বেলর কলেজ অব মেডিসিনের ভাইরাস ও অণুজীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. অ্যান্থনি মারেসো বলেন, এটি বেশ একটি চমৎকার গবেষণা। আমার ধারণা এটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করবে।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসায় রোগীদের সংক্রমণের ভয়টাই প্রধান চিন্তার বিষয়। এটি আমাকে ভাবিয়ে তুলছে যে হাসপাতালের খাবারের তালিকায় আমাদের পরিবর্তন আনা উচিত কি না।
পুরো জীবন চিনি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হলেও, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের নির্দিষ্ট সময়টুকুতে মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার করার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষক ড. জোনাথন পেলড।
সূত্র: সিএনএন