পাকিস্তানের রাজনৈতিক মানচিত্রে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করা হতে পারে। বর্তমানে পাকিস্তান পাঞ্জাব, সিন্ধুর, খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং বেলুচিস্তান- এই চার প্রদেশে বিভক্ত। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এই বড় প্রদেশগুলোকে ভেঙে ছোট অঙ্গরাজ্যে পরিণত করতে চান। এর ফলে সম্ভাব্যভাবে ১২ থেকে ১৫টি নতুন প্রদেশ বা এমনকি ১৬০টি ছোট অঞ্চল তৈরি হতে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে পুরো পাকিস্তানে ক্ষমতার বিন্যাসে এক মৌলিক পরিবর্তন আসবে। এটি কেবল মানচিত্রের নাম বা সীমানা বদলানোর বিষয় নয়। পাকিস্তানের বিশাল প্রদেশগুলোকে ভেঙে ফেললে বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো দুর্বল হতে পারে এবং দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো সামরিক সংস্থার দাবির প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
কাগজে-কলমে পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে পুনর্গঠনের একটি স্পষ্ট যুক্তি রয়েছে। বিদ্যমান চারটি প্রদেশের জনসংখ্যা ও আয়তনের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। দেশের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবের জনসংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ, যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। অন্যদিকে আয়তনের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তানের জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখের মতো।
পাঞ্জাবের বিশাল জনসংখ্যা শাসন করতে গিয়ে মারাত্মক প্রশাসনিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের সরকারি সেবা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়। এছাড়া পাঞ্জাবের এক চতুর্থাংশের কম মানুষের বাড়িতে নিরাপদ খাওয়ার পানির ব্যবস্থা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেনাপ্রধান মুনির যুক্তি দিয়েছেন, প্রদেশগুলো শাসনের জন্য এতটাই বড় যে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা অসম্ভব, যা পাকিস্তানের দুর্বল পারফরম্যান্সে ভূমিকা রাখছে। তবে পাকিস্তানের সমস্যাগুলোর মূল কারণ কেবল প্রদেশের আকার নয়; দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং চড়া ঋণ পরিশোধের ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
পাকিস্তানের ইতিহাসের অর্ধেকের বেশি সময় ধরে সামরিক বাহিনী সরাসরি শাসন করেছে এবং নির্বাচিত সরকারগুলো প্রায়শই তাদের ছায়াতলে কাজ করেছে। দ্য ইকোনমিস্টের মতে, আসিম মুনির ছোট প্রদেশগুলোর মাধ্যমে যে সমস্যার সমাধান করতে চান, তার অনেকগুলোর জন্যই সামরিক বাহিনী নিজেই দায়ী। মূল্যবান ভূমি ও ব্যবসার ওপর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় অংশের ভাগ নেওয়ার বিষয়টিও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে প্রাদেশিক সরকারগুলোকে ছোট অঙ্গরাজ্যে ভেঙে দেওয়াকে জনগণের দোরগোড়ায় সরকার পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে নতুন ইউনিটগুলো যদি দুর্বল এবং কেন্দ্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়, তবে এই পুনর্গঠন সামরিক সংস্থার জন্য তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা আরও সহজ করে তুলতে পারে।
পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ কেবল প্রশাসনিক বিভাগ নয়, এগুলো প্রধান রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রও। পাঞ্জাবে ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং সিন্ধুতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। সামরিক শাসনের আমলেও এই দুই প্রদেশে বিকল্প রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। এ কারণে সেগুলোকে ভেঙে ছোট অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের এই ধারণা নতুন নয়। পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল এর আগে আরও বেশি প্রদেশ এবং ছোট প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। বর্তমান সেনাপ্রধান আসিম মুনির এমন এক সময়ে এই ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন, যখন তিনি নির্বাচিত সরকারের অস্তিত্ব সত্ত্বেও কার্যত পাকিস্তান শাসন করছেন। পিএমএল-এন এবং পিপিপির সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি পাকিস্তানের তৃতীয় প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ইমরান খানকে কারাবন্দি রেখে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন।
এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে প্রস্তাবিত পুনর্গঠনকে পাকিস্তানের ক্ষমতার লড়াই থেকে আলাদা করা কঠিন। ইতোমধ্যে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআই এবং সরকারের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর হাজার হাজার সমর্থক ইসলামাবাদের দিকে মার্চ শুরু করে। অন্যদিকে বেলুচিস্তানে স্বাধীনতা, সম্পদ এবং ইসলামাবাদের ভূমিকার বিরোধিতায় বছরের পর বছর ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা চলছে। এছাড়া পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরেও শাসনব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্য, কর ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে।
১৯৪৭ সালের পর থেকে পাকিস্তানের জনসংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে এবং এর কিছু বর্তমান রাষ্ট্র বিশাল ও শাসন করা কঠিন। তবে চার শক্তিশালী প্রদেশকে ভেঙে ছোট অঙ্গরাজ্যে পরিণত করলে তা কেবল পাকিস্তানের প্রশাসনিক মানচিত্রই বদলাবে না, বরং এটি পাকিস্তানের ক্ষমতার ভারসাম্যকেও চিরতরে বদলে দিতে পারে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
ফোর্ট হুডে ১৩ জনের হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করবে পেন্টাগন
তিন দেশের কাছে ২০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্রের