বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আবারও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকট এখন শুধু উৎপাদন ব্যাহত করছে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নতুন রফতানি আদেশের ওপরও। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য হয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে, আবার অনেক কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত আগামী কয়েক মাসে আরও বড় চাপের মুখে পড়বে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেশি, আর ক্রেতারা এখন সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে—এমন দেশগুলোর দিকেই ঝুঁকছেন।
এক হাজারের বেশি কারখানায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানায় উৎপাদন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অনেক কারখানায় দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও আবার পুরো শিফটই বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আগে রাতে কিছুটা হলেও গ্যাস পাওয়া যেত। এখন সরবরাহ লাইনে গ্যাসই নেই। ফলে দিন-রাত কোনও পার্থক্য থাকছে না। উৎপাদন বন্ধ থাকায় সময়মতো ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না, যা ভবিষ্যতের রফতানি আদেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।’’
উৎপাদন ব্যাহত: বাড়তি খরচে আকাশপথে যাচ্ছে পণ্য
গাজীপুরের ইন্টারলুপ বিডির মতো অনেক প্রতিষ্ঠান গত দুই সপ্তাহে একাধিক দিন কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সিএনজি স্টেশন থেকে বিকল্পভাবে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করা হলেও এখন সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদন একটি ধারাবাহিক চেইন। একটি ধাপ বন্ধ হলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা থেমে যায়। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিপমেন্ট নিশ্চিত করতে গত এক মাসে কয়েকবার আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু তারপরও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ শুরু করতে পারে।
অর্ডার কমছে, উদ্বেগ বাড়ছে
রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বোঝার অন্যতম সূচক ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি)। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে নতুন রফতানি আদেশ প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি শুধু একটি মাসের পরিসংখ্যান নয়; বরং সামনে আরও বড় সংকটের পূর্বাভাস।
একাধিক রফতানিকারক জানিয়েছেন, অনেক বিদেশি ক্রেতা ইতোমধ্যে নতুন অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ উৎপাদনের সময় বাড়ালেও অনেকে বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছেন। সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
নিট খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে নিট পোশাক শিল্পে। কারণ এই খাতের প্রায় পুরো ফেব্রিক্সই স্থানীয় বস্ত্রকল থেকে আসে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে স্পিনিং, ডাইং ও ফিনিশিং মিলগুলোর উৎপাদনও অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
ফলে পোশাক কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় কাপড় সময়মতো পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে কাপড় আমদানি করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং লিড টাইম আরও দীর্ঘ করছে।
বস্ত্রকলেও ভয়াবহ সংকট
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, শিল্পে গ্যাস সংকট এখন জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, শুধু পোশাক নয়, বস্ত্র, সিরামিক, স্টিল, কাগজসহ প্রায় সব শিল্পই এর প্রভাবের মুখে পড়েছে।
তিনি জানান, গত দুই বছরে প্রায় ১৫০টি বস্ত্রকল বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি মিলগুলোর অধিকাংশই ৬০ শতাংশের কম সক্ষমতায় চলছে। স্থানীয় সুতা ও কাপড় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে, যার ফলে দেশের মূল্য সংযোজন কমছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
জুলাইয়ে রফতানি বেশি, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে বাংলাদেশ ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে, যা গত ১২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে গত বছরের একই মাসের তুলনায় রফতানি প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রতি বছরই জুলাই মাসে শীতকালীন পোশাকের শিপমেন্ট বেশি থাকে। তাই এই মাসে রফতানি বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এটিকে ভবিষ্যতের ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ নতুন অর্ডার কমছে, গ্যাস সংকট বাড়ছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
বিজিএমইএ’র সতর্কবার্তা
বিজিএমইএ জানিয়েছে, জুলাই মাসে পোশাক রফতানি ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার হলেও ইউডির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এটি ভবিষ্যতে রফতানি স্থবির হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর আস্থা আবার ফিরতে পারে। কিন্তু বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে।’’
ব্যয় বাড়ছে, দাম বাড়ছে না
গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত ডিজেল ব্যবহার, আকাশপথে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন বিলম্ব এবং শ্রমিকদের অলস সময়ের মজুরি—সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন। ফলে অনেক কারখানা লোকসান গুনেও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ উৎপাদন কমিয়েছে, আবার কেউ কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
গাজীপুরে বাড়ছে কারখানা বন্ধের সংখ্যা
দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। গত কয়েক দিনে একাধিক পোশাক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করেছে। কোথাও গ্যাস সংকট, কোথাও অর্ডার কমে যাওয়া, কোথাও ব্যাংক ঋণের চাপ এবং শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
শিল্প-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে কয়েকশ’ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও চালু থাকলেও অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে।
অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্যাস সংকট এখন আর কেবল একটি জ্বালানি সমস্যা নয়—এটি রফতানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
তাদের মতে, রফতানি আদেশ একবার অন্য দেশে চলে গেলে তা আবার ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। তাই এই সংকট দ্রুত সমাধান করতে না পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারাতে পারে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
রফতানিকারকদের মতে, সামনের মাসগুলো আরও কঠিন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং পোল্যান্ডভিত্তিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এলপিপির পেমেন্ট জটিলতার মতো নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যেই দেশের শিল্প খাতকে গ্যাস সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শুধু নতুন রফতানি আদেশই কমবে না, বিদ্যমান ক্রেতারাও বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকবেন। তখন শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনামও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বর্তমান বাস্তবতা বলছে, জুলাই মাসের রফতানি পরিসংখ্যান কিছুটা স্বস্তি দিলেও শিল্পাঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উৎপাদন ব্যাহত, নতুন রফতানি আদেশ কমে যাওয়া এবং ক্রেতাদের আস্থা দুর্বল হওয়ার যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা দ্রুত থামানো না গেলে আগামী মাসগুলোতে দেশের রফতানি খাত আরও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।