বাংলাদেশের শিল্প খাত এমন এক জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা শুধু কয়েকটি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ধীরে ধীরে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, রফতানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে, এমনকি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতেও বাধ্য হতে হতে পারে।
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির পর গত দুই সপ্তাহে দেশের গ্যাস সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় দুর্বলতাকে সামনে এনে দিয়েছে। একটি মাত্র টার্মিনাল বিকল হওয়ায় জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। এর প্রভাব এখন গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রামসহ প্রায় সব শিল্পাঞ্চলে স্পষ্ট।
উদ্যোক্তারা বলছেন, অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও কোথাও চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। ফলে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে সীমিত আকারে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে, অথচ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয় কমছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে ব্যয় বাড়ছে এবং আয় কমছে—যা শিল্প খাতকে এক কঠিন অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কারখানা বন্ধ নয়, কিন্তু উৎপাদনও স্বাভাবিক নয়
সম্প্রতি কয়েকটি পোশাক কারখানায় টানা কয়েক দিনের ছুটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ‘গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ’—এমন আলোচনা শুরু হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কোনো সদস্য কারখানা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেনি।’
তিনি জানান, ৫ আগস্টের সরকারি ছুটি, ৭ আগস্টের সাপ্তাহিক ছুটি এবং শ্রমিকদের অনুরোধের কারণে কয়েকটি কারখানা অতিরিক্ত এক-দুই দিন ছুটি যুক্ত করে টানা তিন থেকে চার দিনের ছুটি দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত কাজের মাধ্যমে এসব ছুটি সমন্বয় করা হবে।
তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যাখ্যা সঠিক হলেও বাস্তবতা হলো গ্যাস সংকটের কারণে অনেক ডাইং ইউনিট পর্যাপ্ত উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে প্রয়োজনীয় কাপড় না পাওয়ায় সেলাই কারখানাগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমে যাওয়া সময়টিকে ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতি কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছে।
একটি টার্মিনালের ত্রুটিতে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ
বর্তমান সংকটের মূল কারণ মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ড। এই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো। দুর্ঘটনার পর সেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বিপুল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল হয়ে গেলে পুরো দেশের শিল্প উৎপাদন কীভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
উৎপাদন কমছে প্রায় সব শিল্পে
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প। ডাইং কারখানায় গ্যাস না থাকায় কাপড় উৎপাদন কমে গেছে। ফলে অনেক গার্মেন্টস কারখানায় সেলাই লাইন অলস পড়ে আছে। অনেক কারখানা ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। স্পিনিং মিলগুলোতেও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। কোথাও প্রতিদিনের উৎপাদন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
এ সংকট শুধু পোশাক খাতে সীমাবদ্ধ নয়। কাচ, সিরামিক, ইস্পাত, ওষুধ, প্লাস্টিক, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও একই সমস্যায় পড়েছে।
বিশেষ করে কাচ ও সিরামিক শিল্পে চুল্লি দীর্ঘ সময় বন্ধ হয়ে গেলে কয়েকশ কোটি টাকার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইস্পাত শিল্পেও একবার উৎপাদন বন্ধ হলে পুনরায় চালু করতে দীর্ঘ সময় ও অতিরিক্ত ব্যয় প্রয়োজন হয়।
উৎপাদন ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ
গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক উদ্যোক্তা বলছেন, ইউটিলিটি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা অতিরিক্ত দাম দিতে রাজি নন। ফলে পুরো অতিরিক্ত ব্যয় উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে—এই দ্বিমুখী চাপ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
রফতানি আদেশ হারানোর শঙ্কা
বাংলাদেশের রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সময়মতো পণ্য সরবরাহ। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করতে পারছে না। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে বিলম্ব হচ্ছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে। আবার কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছেন।
শিল্প নেতারা বলছেন, একবার কোনো ক্রেতা উৎপাদন অন্য দেশে সরিয়ে নিলে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। ফলে বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের রফতানি বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমান গ্যাস সংকটকে শুধু একটি জ্বালানি সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন, রফতানি সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য একটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল—স্পিনিং, ডাইং, ফিনিশিং থেকে শুরু করে গার্মেন্টস উৎপাদন—গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এই শৃঙ্খলের একটি অংশ ব্যাহত হলেই পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সময়মতো পণ্য সরবরাহকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। উৎপাদনে বিলম্ব হলে শুধু একটি চালান দেরি হয় না, বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বৈশ্বিক বাজারে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো যখন নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণের চেষ্টা করছে, তখন দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের প্রতিযোগিতাগত অসুবিধা তৈরি করতে পারে।’
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ‘বর্তমানে অনেক কারখানা ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলছে। সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। উৎপাদন কমলেও শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অনেক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করে শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া রফতানি প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি কিংবা 'উৎপাদনবান্ধব বাংলাদেশ' গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।’
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে
বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিছুদিন ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সেই সক্ষমতা নেই। উৎপাদন কমলেও শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, কারখানার ভাড়া এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হলে অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্প টিকে থাকা নিয়েই সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
বাজারেও পড়তে পারে প্রভাব
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পকারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভোগ্যপণ্য, খাদ্য, প্লাস্টিক, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহও কমবে। সরবরাহ কমে গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ শিল্প সংকট শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়িয়ে দিতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া সংকট কাটবে না
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট কেবল একটি টার্মিনালের ত্রুটির ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতারও বহিঃপ্রকাশ।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়াতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন, স্থলভিত্তিক এলএনজি অবকাঠামো গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিল্পে জ্বালানির বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে
সরকার আশা করছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল ধাপে ধাপে চালু হলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়বে। তবে শিল্পমালিকরা বলছেন, সাময়িক উন্নতি হলেও স্থায়ী সমাধান ছাড়া এ ধরনের সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আর শুধু জ্বালানি সংকট নয়; এটি উৎপাদন, রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতিকে একসঙ্গে প্রভাবিত করা একটি জাতীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান শক্তি হলো উৎপাদন ও রফতানি। সেই শক্তির ভিত্তিই যদি গ্যাস সংকটে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে এর প্রভাব শুধু শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর দীর্ঘ ছায়া পড়বে। তাই শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষায়, এটি আর কেবল গ্যাসের সংকট নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে রক্ষার লড়াই।









