খুলনা অঞ্চলে পণ্য তুলেছেন মাত্র ২৩ শতাংশ ডিলার, দেওয়া হয়নি তেল-খেজুর

খুলনা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তালিকাভুক্ত পরিবেশক (ডিলার) ৩৫৮ জন।  এদের মধ্যে রমজানে পণ্য তুলেছেন মাত্র ৮৪ জন পরিবেশক ।  এ হিসাব অনুযায়ী এই রমজানে খুলনা অঞ্চলের মাত্র ২৩.৪৬ শতাংশ পরিবেশক টিসিবি’র পণ্য তুলে নিজ এলাকায় সরকার নির্ধারিত মূল্যে  বিক্রি করতে আগ্রহী হয়েছেন।  খুলনার সঙ্গে দূরত্ব বেশি হওয়ায় মেহেরপুরের কোনও ডিলার রমজানে টিসিবি’র পণ্য তোলেননি।

এর ফলে বিপুল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এই বিভাগের প্রধান শহরগুলোতে সিংহভাগ সাধারণ মানুষই রমজান মাসে নায্যমূল্যে সরকারের  সিংহভাগ ডিলার যখন পণ্য তুলতে ব্যর্থ হন অথবা  স্বেচ্ছায় বিরত থাকেন তখন এর পেছনে কোন কোন কারণ দায়ী- জনমনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে বেশ কয়েকটি তথ্য।  প্রথমত অনুমোদিত ডিলার হলেও সবার কাছে পণ্য ওঠানোর জন্য ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠায়নি খুলনা টিসিবি। এক্ষেত্রে ডিলার নির্বাচন হয়েছে টিসিবি’র নিজস্ব সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। কারণ, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডিলার বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন তারা টিসিবি’র কাছ থেকে পণ্য ওঠানোর জন্য কোন বরাদ্দপত্র, নির্দেশনা বা ক্ষুদে বার্তা পাননি।  গত বছর এসএমএস এর মাধ্যমেই টিসিবি এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছিল বলে জানিয়েছেন তারা।

খুলনা বিভাগ-২

দ্বিতীয়ত, ডিলারদের একটি বড় অংশ তাদের অনুমোদনপত্র (লাইসেন্স) নবায়ন করেননি। নিম্নমানের পণ্য দেওয়া, ওজনে কম দেওয়া, পণ্য পরিবহনে লাভ কম হওয়া এবং টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গিয়ে উল্টো ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণে তারা এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তৃতীয়ত, আগ্রহী ডিলারদের চাহিদা মতো পণ্য সরবরাহ করেনি টিসিবি। ক্রেতাদের কাছে বিপুল চাহিদা থাকলেও গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক কম পরিমাণ পণ্য দেওয়ার কথা ক্ষুদেবার্তাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আগ্রহী ডিলারদের জানিয়েছে টিসিবি। এত কম পরিমাণ পণ্য পরিবহন করে মুনাফা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা না থাকায় এসব ডিলারের বেশিরভাগই আর পণ্য উত্তোলনে আগ্রহ দেখাননি।  আবার খুলনা শহর ও আশেপাশের ডিলাররা জানিয়েছেন, প্রথম কিস্তির বরাদ্দ দেওয়া হলেও পরে তাদের অনেককেই আর এসব পণ্য দিতে চায়নি টিসিবি। ফলে তারা আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও টিসিবি’র পণ্য তুলে সাধারণ জনগণের কাছে নায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারেননি।

চতুর্থত: রাজধানীসহ দেশের অন্য কিছু এলাকায় রমজানের অত্যন্ত জরুরি ভোজ্যপণ্য সয়াবিন তেল দেওয়া হলেও খুলনা অঞ্চলের বেশিরভাগ ডিলারদের জন্য সয়াবিন তেলের বরাদ্দই ছিল না। বরাদ্দ ছিল না খেজুরেরও।  এসব কারণেও টিসিবি’র পণ্য তুলতে আগ্রহী ছিলেন না উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবেশক (ডিলার)।

খুলনা বিভাগ

এছাড়াও এবিষয়ে ছিল না প্রশাসনের নজরদারি। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য:

খুলনা

খুলনা প্রতিনিধি হেদায়েৎ হোসেন জানিয়েছেন, টিসিবির ১২০ জন ডিলার রয়েছেন। এদের মধ্যে পণ্য তুলেছেন ৬৮ জন। ৬০ জন দোকানে ও ৮ জন ট্রাকে পণ্য বিক্রি করছেন।  এ তথ্য জানিয়েছে খুলনা টিসিবি কার্যালয়।  টিসিবি খুলনা কার্যালয়ের ইনচার্জ রবিউল মোর্শেদ জানান, বাকি ৫২ জনের মধ্যে ৪৫ জনের অনুমোদনপত্র নবায়ন হয়নি।

টিসিবির পণ্য তুলেছেন এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক পরিবেশক মহানগরীর চরেরহাট এলাকার এম এস ব্রাদার্স। এর কর্মচারী মো. কালাম জানান, ট্রাকে করে মালামাল বিক্রি হচ্ছে ভালো, আর গুণগত মানও সন্তোষজনক। যদিও ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের সরবরাহ নেই। চিনি শেষ গেছে  ৬ দিনের মধ্যে, নতুন সরবরাহ আসেনি। সয়াবিন তেলও শেষ হয়ে গেছে।  

টিসিবির পণ্য উত্তোলন করেননি খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুরের গীলাবাড়ি এলাকার ডিলার খান স্টোরের সত্ত্বাধিকারী সাহেব আলী। তিনি জানান, টিসিবি খুবই কম মালামাল দেয়।  খুলনা থেকে কয়রায় বহন করে নিয়ে বিক্রির পর লাভ যা হয় তাতে খরচ ওঠে না।  তার দাবি, ডিলারদের জন্য বরাদ্দ আরও বাড়ানো উচিৎ।  সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিতের উদ্যোগও নেওয়া প্রয়োজন।

তবে পণ্যের অপ্রতুলতার অভিযোগ উঠলেও বিষয়টি মানতে নারাজ কার্যালয়ের ইনচার্জ রবিউল মোর্শেদ। তিনি মনে করেন, যা যোগান আছে, তাতে আরও এক সপ্তাহ চলবে।  সাধারণ মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনায়, ৮ জুন পর্যন্ত বিক্রির সময়সীমা সত্ত্বেও মহানগরীতে আটটি ট্রাকে ভ্রাম্যমাণভাবে এরপরেও পণ্য বিক্রি অব্যাহত রাখে।

যশোর

যশোর প্রতিনিধি তৌহিদ জামান জানিয়েছেন, জেলার আট উপজেলায় টিসিবির মোট ৮৫জন ডিলার রয়েছেন। এদের মধ্যে যশোর সদরে ২৯ জন, ঝিকরগাছায় ৫ জন, শার্শায় ১ জন, চৌগাছায় ৩ জন, কেশবপুরে ১৭ জন, বাঘারপাড়ায় ৩ জন, অভয়নগরে ১০ ও মনিরামপুরে ১৭ জন ডিলার রয়েছেন। এদের মধ্যে সিংহভাগই এবার পণ্য তোলেননি। সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটি নির্ণয় করা যায়নি। ডিলারদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, পণ্য তোলায় আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও যথেষ্ট চালানের আভাস না মেলায় তারা আর পণ্য উত্তোলন করেননি।  তবে সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে নিয়ে পণ্য তুলেছেন অল্পসংখ্যক ডিলার।  যদিও তারা বরাদ্দ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না।

পণ্য তোলেননি ডিলার অশোক কুণ্ডু।  তিনি জানান, এবার চিনি, ছোলা ও মসুরের ডাল দেওয়া হচ্ছে ৩০০ কেজি করে ৯০০ কেজি, যেখানে গতবার ২ টন পণ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া সয়াবিন তেল দেওয়া হয়নি এবার।  খুলনা থেকে মোটামুটিমানের এসব পণ্য পরিবহন করে নিয়ে আসা এবং এখানে গাড়িতে তা বিক্রি করা সব মিলিয়ে যে খরচ হয় তা লাভের অংকে পুষিয়ে যায় না। ক্ষতি গুণতে হয়।

পণ্য তুলেছেন গৌরাঙ্গ পাল।  তিনি জানান, পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন নেই, খুবই ভালো বলা চলে। প্রথম দফায় ডাল তুলেছিলেন ২০০ কেজি, চিনি ৩০০ কেজি ও ছোলা ৪০০ কেজি। প্রথম সপ্তাহেই তা শেষ হয়ে গেছে। চাহিদার তুলনায় পণ্য অর্ধেক প্রায়।  রমজান উপলক্ষে চিনি, ছোলা, খেজুর এসবের বেশি চাহিদার কথা মাথায় রেখে আরও পণ্য বরাদ্দ দেওয়া উচিৎ বলে তিনি মনে করেন।

কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি কুদরত-এ-খোদা সবুজ জানান, কুষ্টিয়ার ছয় উপজেলায় ৩২ জন ডিলার রয়েছেন টিসিবির। এদের মধ্যে কুষ্টিয়া সদরে ১৪ জন, ভেড়ামারায় ৩ জন, কুমারখালীতে ২ জন, খোকসায় ৩ জন, দৌলতপুরে ২ জন ও মিরপুরে ৮ জন ডিলার রয়েছেন।

এ বছর শুধুমাত্র একজন ব্যবসায়ী পণ্য উঠিয়েছেন। তিনি কুষ্টিয়ার বড় বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোকাররম হোসেন মোয়াজ্জেম। উঠিয়েছেন বটে, অসন্তোষও তৈরি হয়েছে ঢের।  তিনি জানান, ৩০০ কেজি চিনি, ২০০ কেজি মসুরের ডাল ও ৫০০ কেজি ছোলা দেওয়া হয়েছে এবার, চাহিদার তুলনায় যা একেবারেই কম। সয়াবিন তেল ও খেজুর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।  আর সামান্য এই পণ্য বহনে ও বিক্রিতে ভাড়া নিতে হচ্ছে ট্রাক।  তাই মুনাফা না হওয়ায় দ্বিতীয় কিস্তিতে টিসিবি’র পণ্য ওঠাতে আর আগ্রহ পাননি তিনি।

[রমজানে টিসিবি’র বিভাগভিত্তিক কার্যক্রম নিয়ে আজ রবিবার সারাদিন ও আগামীকাল সোমবার সিরিজ প্রতিবেদন থাকছে বাংলা ট্রিবিউন-এ। দেখতে চোখ রাখুন।]

পণ্য তোলেননি এমন একজন ডিলার উজারগ্রাম এলাকার গোলাম মোস্তফা ফরহাদ। পণ্য নিম্নমানের বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরিবহন খরচসহ আনুষঙ্গিত খরচ হিসাব করে লাভের আশা না থাকায় টিসিবি’র পণ্য ওঠাতে এবছর আগ্রহী হননি তিনি।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, নিম্নমানের পণ্যের বিষয়ে অভিযোগ আমরাও পেয়েছি। কিন্তু এসব অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ডিসি আদালত চত্বরে পাইকারি মূল্যে খুচরা পর্যায়ে চিনি বিক্রি হচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের এসব উদ্যোগ সফল হবে আশা করি।

জেলাভিত্তিক টিসিবি ডিলার ও তাদের কার্যক্রম

জেলা

ডিলার

পণ্য উঠিয়েছেন

পণ্য তোলেননি

মন্তব্য

খুলনা

১২০ জন

৬৮ জন

৫২ জন

 

যশোর

৮৫ জন

পুরো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুরো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বেশিরভাগই তোলেননি

 

বাগেরহাট

২৯ জন

৬ জন

২৩ জন

 

কুষ্টিয়া

৩২ জন

১ জন

৩১ জন

 

মেহেরপুর

১২ জন

০ জন

১২ জন

 

ঝিনাইদহ

৩৭ জন

৬ জন

৩১ জন

 

নড়াইল

৩৭ জন

১ জন

৩৬ জন

 

মাগুরা

৬ জন

২ জন

৪ জন

 

 

মাগুরা

মাগুরা প্রতিনিধি মাজহারুল হক লিপু জানান, মাগুরায় ছয়জন টিসিবি ডিলার রয়েছেন। এদের মধ্যে পণ্য তুলেছেন দুইজন। রোজায় আসা পণ্যের মান তুলনামূলক ভালো হলেও অপ্রতুলতা ও বরাদ্দ না পাওয়ায় পণ্য তুলতে পারেননি বাকিরা।

পণ্য তুলেছেন এমন দুইজনের একজন জেটিসি রোডে অবস্থিত এসএমবি ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী মইনুল আবেদিন। তিনি জানান, রমজান শুরু হওয়ার দিনকয়েক আগে ১২শ’ কেজি চিনি, ৫০০ কেজি ডাল, ৯০০ কেজি সয়াবিন ও ১৮০০ কেজি ছোলা বরাদ্দ পেয়েছিলেন। পণ্যের মান খুব একটা ভালো ছিল না। তবুও দাম কম হওয়ায় সব বিক্রি হয়ে গেছে। এই ব্যবসায়ী আরও জানান, রোজার প্রথম দিকে দ্বিতীয় কিস্তিতে বরাদ্দ পান ৪০০ কেজি চিনি ও ২০০ কেজি ছোলা যা একদিনেই বিক্রি হয়ে যায়। এরপর আর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। রোজায় আসা পণ্যের মান ভালো ছিল বলে জানান তিনি।

ঢাকা রোড বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন অপর ডিলার শিকদার এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দেখা যায় টিসিবির কোনও পণ্যই ওখানে নেই। তারা জানান, তাদের নামে টিসিবির পণ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

তবে জেলা বিপণন কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, ‘মাগুরায় পর্যাপ্ত পরিমাণ টিসিবি পণ্য আছে এবং তা খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে।’ কিন্তু, সাধারণ মানুষের অভিযোগ তারা এসব পণ্য পাচ্ছেন না, তাহলে কি এসব পণ্য কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে?-এমন প্রশ্নের জবাবে  তিনি বলেন, ‘আসলে এটি দেখভালের দায়িত্ব টিসিবি খুলনা অফিসের। আমাদের কারও কিছু করার নেই।’

নড়াইল

নড়াইল প্রতিনিধি সুলতান মাহমুদ জানিয়েছেন, নড়াইলে টিসিবির ডিলার আছেন ৩৭ জন। জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্র জানায়, অনুমোদনপত্র নবায়ন করেছেন এবার ৯ জন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অল্প সময়ের জন্য মাল তুলতে পেরেছেন শুধুমাত্র খোকন নামে রূপগঞ্জ বাজারের এক ব্যবসায়ী। আর কেউ বরাদ্দই পাননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও দু’জন ডিলার জানান, টিসিবির গড়িমসিই পণ্য তুলতে না পারার প্রধান কারণ। রমজান মাসে খোকন সাহেবকে একদিন মাল দিয়ে পরদিনই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে পণ্যের সরবরাহ।  

তবে রমজান উপলক্ষে নড়াইল জেলা সদরের বিভিন্ন পয়েন্টে ২৯ মে থেকে ৮জুন পর্যন্ত টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে ন্যায্যমূল্যে ছোলা, চিনি, ডাল ও সয়াবিন তেল বিক্রি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা চেম্বার অব কমার্স অফিস সূত্র।

আর নড়াইলের  জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ জানিয়েছেন, ৮ জুনের পর নড়াইল জেলায় টিসিবি পণ্য বিক্রি হয়নি।

বাগেরহাট

বাগেরহাট প্রতিনিধি এস এম সামছুর রহমান জানান, জেলায় টিসিবির মোট ডিলার রয়েছেন ২৯ জন। এদের মধ্যে বাগেরহাট সদরে ৩ জন, কচুয়ায় ২ জন, মোড়েলগঞ্জে ৪ জন, শরণখোলায় ৭ জন, রামপালে ১ জন, মংলায় ২ জন, ফকিরহাটে ২ জন, মোল্লাহাটে ৪ জন ও চিতলমারীতে ৪ জন। এ বছর অনুমোদনপত্র নবায়ন করেছেন ৯ জন।  এদের মধ্যে পণ্য তুলতে পেরেছেন ছয়জন। অবশিষ্টরা তুলতে পারেননি।  

পণ্য তুলেছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান মংলা উপজেলার ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, পণ্যের বরাদ্দ কম হওয়ায় ইতোমধ্যে তাদের আড়াই হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।

পণ্য তোলেনি এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি মেসার্স ফরিদা আক্তার বানু। এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউল করিম জানান, তাদের নামে মাত্র ছয় বস্তা চিনি ও কিছু নিম্নমানের ডাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কোনও তেল বরাদ্দ  ছিল না।  তাই মোটা অঙ্কের ক্ষতির আশঙ্কায় তারা পণ্য তোলেননি।  

এদিকে, আগেরবারের এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান জিয়াউল করিম। সেবার ৫ লিটার ভোজ্য তেলের ক্যানে তেল ছিল চার লিটার করে। ফলে কিনে নেওয়ার পর লোকজন আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে। বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্ট হয়। সে বছর লোকসান হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা। সবচেয়ে বড় সমস্যা তাদের ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। এ কারণে তারা এবছর রমজানে টিসিবি’র পণ্য তুলতে আগ্রহী হননি।

এসবের ধারাবাহিকতায় জেলার টিসিবি কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স আ্যাড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সভাপতি শাজাহান মিয়া বলেন, রোজার আগে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেছিলাম, জনস্বার্থে বাগেরহাটে টিসিবির কার্যক্রম চালু করুন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাগেরহাটের ডিলারদের নিয়ে একটি সভাও নাকি হয়েছিল। এরপর কিছু আর চোখে পড়েনি।

ঝিনাইদহ

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি নয়ন খন্দকার জানান, জেলায় টিসিবির মোট ডিলার রয়েছেন ৩৭ জন।  এদের মধ্যে সদরে ১২ জন, কালীগঞ্জে ৭ জন, কোটচাঁদপুরে ৭ জন, মহেশপুরে ৪ জন ও শৈলকুপায় ৭ জন ডিলার রয়েছেন। পণ্য উঠিয়েছেন মাত্র ছয়জন। ওঠাননি বাকি ৩৭ জন।

পণ্য তুলেছেন এমন ডিলারদের একজন কোটচাঁদপুর উপজেলার মতিয়ার রহমান । পণ্যের মান বিষয়ে তার মত ইতিবাচক। তবে আপত্তি জানান, চাহিদার দশ শতাংশ পণ্যও পাননি বলে। টিসিবি কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা তার কাম্য।

পণ্য তোলেননি এমন ডিলারদের একজন হাটখোলার আলাউদ্দীন ট্রেডার্সের একজন ইকরামুল হক। টিসিবির পণ্য নিয়ে তার তিক্ত পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা জানান। এর আগে যেবার পণ্য তুলেছিলেন, চাহিদার তুলনায় সামান্য পণ্যই পেয়েছিলেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যার মানও ভালো নয়।

এদিকে, সিংহভাগ ডিলার পণ্য না তোলায় স্বাভাবিকভাবেই গতিহীন ছিল জেলায় টিসিবি’র কার্যক্রম। ঝিনাইদহ জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এর সভাপতি মীর নাছির উদ্দীন জানান, ‘টিসিবির কার্যক্রম কাগজ কলমে থাকতে পারে, বাস্তবে কিছু নজরে পড়েনি। এ ব্যাপারে কিছু জানায়নি প্রশাসনও।’

মেহেরপুর

মেহেরপুর প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম জানান, সাত লাখ মানুষের জেলা মেহেরপুরে টিসিবির ডিলার রয়েছেন ১২ জন। এদের মধ্যে একজনও এবার পণ্য তুলতে পারেননি।

এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে পণ্যের অপ্রতুল বরাদ্দের পরিকল্পনাকেই দায়ী মনে করেন জেলার নেতৃস্থানীয় ডিলার আশিকুজ্জামান সবুজ। তিনি বলেন, ‘গত রোজায় ডিলার প্রতি দেওয়া হয়েছিল তিন হাজার কেজি মালামাল। সেক্ষেত্রে এবার মাত্র আটশ’ কেজি পণ্য দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে আবার তেল নেই। ‘ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘খুলনায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট দেখেছে অফিস প্রভাবিত করে দু’একটি জেলাকে মাল দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা গেলে পরে বেশি দামে তা বাজারে বিক্রি করে লাভবান হওয়া যায়।’

আশিকুজ্জামান পণ্য না তুলতে পারার আরও একটি কারণ হিসেবে দায়ী করেন টিসিবি’র খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্নতাকে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতি বছর টিসিবির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ডিলারদের মোবাইলে কল দিয়ে বা এসএমএস করে বরাদ্দের খবর জানানো হলেও এবার জানানো হয়নি। এর ফলে সময়মতো বরাদ্দ পাওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেননি অনেকে।

পণ্যের নিম্নমানের ব্যাপারে ডিলার সবুজের অভিযোগ, ‘‘ডিলাররা খুলনায় গিয়ে ‘ব্ল্যাকমেইলের’ শিকার হোন, মালামাল দেখে নেওয়ার কোনও সময় ও সুযোগ তাদের দেওয়া হয় না। বিগত বছরগুলোয় একবার দেওয়া হলো অত্যধিক ফরমালিন মেশানো খেজুর, পোকায় খাওয়া ছোলা। সেবার নিম্নমানের চিনির বস্তায় ছেঁড়া ময়লা স্যান্ডেলও পাওয়া গেছে। ’’

মাল বরাদ্দ দেওয়া বিষয়ে ডিলারদের না জানানোর বিষয়টি স্বীকার করেন খুলনার টিসিবি কার্যালয়ের প্রধান জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমিরুল মোর্শেদ। তবে জানানোর প্রয়োজনীয়তার বিপক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, সবাই জানে এসময় মাল বরাদ্দ করা হয় সেকারণে আলাদা ভাবে যোগাযোগ করা হয়নি তবে তাদেরও উচিত ছিল অফিস যোগাযোগ করা।

শিল্প ও বণিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মেহেরপুর হোটেল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল এনাম বকুল বলেন, ‘এবার রোজায় টিসিবি কর্তৃপক্ষ মেহেরপুর জেলার সাত লাখ মানুষকে ন্যায্য মূল্যে টিসিবির পণ্য পাওয়ার অধিকার থেকে কর্তৃপক্ষ কেন বঞ্চিত করল কেন তার জবাব দিতে হবে।’ মেহেরপুরের দূরত্ব খুলনার সঙ্গে তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এখানে টিসিবি’র আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

/এইচকে/টিএন/

আরও পড়ুন:

রোজায় ১৮ জেলায় পৌঁছায়নি টিসিবি’র পণ্য

রংপুর অঞ্চলের ডিলারদের অভিযোগ: ব্যাপক চাহিদা তবুও বন্ধ করা হয়েছে পণ্য সরবরাহ

চট্টগ্রামের ৬ জেলার মানুষ পাননি টিসিবি’র কোনও পণ্য