কী, কেন, কীভাবে

ইরানি জাহাজে কেন হামলা চালালো ইউক্রেন

কাস্পিয়ান সাগরে শনিবার একটি ইরানি জাহাজে ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার পর তেহরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া উভয় দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরম অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিগত ছয় বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে যে টানাপোড়েন চলছিল, এই ঘটনার পর তা এক বিপজ্জনক ও সংঘাতময় নতুন ধাপে গিয়ে পৌঁছেছে।

তেহরান ইউক্রেনের এই পদক্ষেপকে বিপজ্জনক দুঃসাহসিকতা হিসেবে আখ্যায়িত করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বলেছে, জবাব না দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানের কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিশোধ নেওয়া এবং তেহরান থেকে ইউক্রেনীয় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের বহিষ্কারের জোর দাবি জানিয়েছে।

এমন এক সময়ে এই ঘটনাটি ঘটলো, যখন ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাম্প্রতিক বৈঠক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তেহরান ও মস্কোর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের সংঘাতগুলো দিন দিন কতটা গভীরভাবে একসূত্রে গেঁথে যাচ্ছে।

গত মঙ্গলবার ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে একটি ‘চমৎকার’ বৈঠকের পর ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, অন্যান্য বেশ কয়েকটি পরিকল্পনার পাশাপাশি তারা দুজন প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন।

ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে ইউক্রেন এখন আর কেবল রাশিয়ার সঙ্গে নিজস্ব যুদ্ধে লিপ্ত থাকা কোনও ইউরোপীয় দেশ নয়। বরং তেহরানের চোখে ইউক্রেন এখন পশ্চিমাদের পরিচালিত ইরানবিরোধী বৃহত্তর সামরিক অভিযানের একটি সক্রিয় অংশ হিসেবে রূপ নিয়েছে।

বছরজুড়ে সম্পর্কের অবক্ষয়

ইরান ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই সম্পর্কের ধস এক দিনে তৈরি হয়নি, বরং বছরের পর বছর ধরে এর পথ সুগম হয়েছে।

দুই দেশের সম্পর্কের প্রথম বড় ধরনের ফাটল ধরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। সে সময় তেহরান থেকে উড্ডয়নের পরপরই ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের পিএস৭৫২ ফ্লাইটটি ভুলবশত গুলি করে ভূপাতিত করে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ১৭৬ জন আরোহীর সবাই নিহত হন। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং ঘটনার দায় স্বীকার, ক্ষতিপূরণ প্রদান ও ইরানের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের সূচনা হয়।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর এই উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হয়। কিয়েভ এবং পশ্চিমা বিশ্ব বারবার তেহরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, তারা মস্কোকে এমন ড্রোন সরবরাহ করছে যা ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলায় প্রধান ভূমিকা রাখছে। যদিও ইরান ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ড্রোন সরবরাহের বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং তাদের যুক্তি, রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা যুদ্ধ শুরুর বহু আগে থেকেই বিদ্যমান।

তবে এই অভিযোগগুলোর কারণে ইউক্রেন ইউরোপে তেহরানের সবচেয়ে সোচ্চার সমালোচকে পরিণত হয়। কিয়েভ ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এক ধাপ নিচে নামিয়ে আনে এবং ইরানি রাষ্ট্রদূতের স্বীকৃতি বাতিল করে। পাল্টা জবাবে ইরানি কর্মকর্তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তেহরানের ওপর পশ্চিমা চাপ প্রয়োগের কৌশল অনুসরণের অভিযোগ তোলেন।

সাম্প্রতিক সংঘাতটি এই বিরোধকে কূটনৈতিক শত্রুতার সীমা ছাড়িয়ে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের অভিযোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ইউক্রেনের দাবি, তারা জাহাজটিতে হামলা চালিয়েছে কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল এটি রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম পরিবহন করছিল। এ বিষয়ে জেলেনস্কি উল্লেখ করেছেন, কিয়েভ তাদের মিত্র ও সহযোগীদের কাছে তথ্য প্রদান করবে, যা তেহরানের প্রতি মস্কোর নতুন সহায়তার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরবে।

তবে ইরান দাবি করেছে যে আক্রান্ত জাহাজটি একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজ ছিল এবং এই হামলায় তাদের একজন নাবিক নিহত হয়েছেন।

ইরানের বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-র তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই ঘটনাকে একটি বিপজ্জনক দুঃসাহসিকতা, যা আমাদের পক্ষ থেকে জবাবহীন থাকবে না বলে বর্ণনা করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, কিয়েভ নিজেকে ভূরাজনৈতিক বিরোধের হাতিয়ার বানিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জেলেনস্কির মালিকদের অবশ্যই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। তার এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তেহরান বিশ্বাস করে কিয়েভ স্বাধীনভাবে নয়, বরং পশ্চিমাদের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এই হামলা চালিয়েছে।

তেহরানের নিরাপত্তায় নতুন হুমকির মাত্রা

ইরানি কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত ভাষা প্রকাশ করে যে, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংঘাত তেহরানের বিশ্বভাবনাকে কীভাবে পুনর্গঠিত করেছে।

একই সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই অভিযোগ করেন, ইসরায়েল, ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্র মিলে একটি ‘দুষ্ট ত্রিভুজ’ গঠন করেছে। তিনি যুক্তি দেন যে, এই ধরনের জোট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য ‘ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’।

এই ভাবমূর্তি ইউক্রেনকে ইরানের ঐতিহ্যবাহী প্রধান শত্রুদের পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে। কিছুদিন আগেও কিয়েভের সঙ্গে তেহরানের সংঘাত মূলত রাশিয়া যুদ্ধ এবং সামরিক সহযোগিতার অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে ইরানি কর্মকর্তারা ইউক্রেনকে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের বৃহত্তর সংগ্রামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করছেন।

উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই মনোভাব আরও জোরালো হয়েছে, যেখানে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক হামলা পাল্টাহামলা চলছে।

ইরানি নেতারা বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন যে, মার্কিন বা ইসরায়েলি অভিযানে সাহায্যকারী যেকোনও দেশকে এর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। এর আগে আমেরিকান বিমান হামলার জন্য যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি ব্যবহার করার অভিযোগে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে দেওয়া একই ধরনের হুমকিও একই যুক্তির প্রতিফলন ঘটায়: তেহরান এখন তার শত্রুদের যেকোনও পরোক্ষ সহায়তা প্রদানকেও যুদ্ধের সরাসরি অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

ইরানের কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো সরকারকেও আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। মঙ্গলবার আইআরজিসি-সংযুক্ত তাসনিম নিউজ এজেন্সি-র এক নিবন্ধে দাবি করা হয় যে, ইউক্রেন এখন আমেরিকান-জায়নবাদী সামরিক অভিযানে প্রবেশ করেছে। পত্রিকাটি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে ইউক্রেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে বহিষ্কার এবং তেহরানে ইউক্রেনীয় দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে কিয়েভের এই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য ইউক্রেনকে ‘সামরিকভাবে শাস্তি’ দেওয়ারও দাবি তোলে তারা।

প্রতিশোধের ঝুঁকি ও সুদূরপ্রসারী পরিণতি

ইউক্রেনের ওপর সরাসরি ইরানি সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাবনা এখনও বেশ কম। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি বা ইসরায়েলের তুলনায় ইউক্রেনে ইরানের হামলা চালানোর মতো নাগালের মধ্যকার লক্ষ্যবস্তু অনেক কম। এ ছাড়া সরাসরি আক্রমণ ইউরোপে তেহরানের কূটনৈতিক একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

সামরিক হামলার চেয়ে ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের মধ্যে থাকতে পারে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা, সাইবার আক্রমণ, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরও প্রসারিত করা।

ইরান এমন উপায়ে ক্ষতি সাধন করতে চায় যাতে অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়ানো যায়, বিশেষ করে যখন তারা একসঙ্গে একাধিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়।

আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেন মোহেব্বি বলেছেন, ইরান উপযুক্ত সময়ে যথাযথ জবাব দেবে। অন্যদিকে কট্টরপন্থি এমপি ইব্রাহিম আজিজি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানের ওপর যেকোনও হামলার একটি চড়া মূল্য দিতে হয়।

এই ধরনের অস্পষ্ট ও কৌশলগত ভাষা তেহরানকে কোনও নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি না দিয়েই প্রতিপক্ষকে চাপের মুখে রাখতে সাহায্য করে।

রাশিয়ার জন্য এই ঘটনাটি ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার মধ্যবর্তী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ইউক্রেনে আক্রমণের পর থেকে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলেও দুই পক্ষই অস্বীকার করে আসছে যে তাদের এই অংশীদারত্ব কোনও তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নির্দেশিত নয়।

ইউরোপের জন্য এই পরিস্থিতি নতুন জটিলতার সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় সরকারগুলো ইতোমধ্যে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত এড়ানোর চেষ্টায় ভারসাম্য বজায় রাখছে। যে সংঘাতটি একসময় কেবল পূর্ব ইউরোপ কেন্দ্রিক ছিল, তা এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার আশঙ্কা জাগাচ্ছে।

কাস্পিয়ান সাগরের হামলার তাৎক্ষণিক ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু এর রাজনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট: তেহরান এখন ইউক্রেনকে কেবল এক দূরবর্তী যুদ্ধের মাধ্যম হিসেবে দেখছে না, বরং প্রত্যক্ষ শত্রু হিসেবে গণ্য করছে। আর এই মানসিকতার পরিবর্তন বছরের পর বছর ধরে চলা কূটনৈতিক বিরোধকে একটি ক্রমবিকাশমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

সূত্র: আল মনিটর