ভারতে ভূমিকম্পের সবচেয়ে ঝুঁকিতে কোন কোন অঞ্চল

আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ অঞ্চলে শনিবার রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর ফলে ভারতের জম্মু-কাশ্মীর এবং রাজধানী দিল্লি অঞ্চলেও মৃদু কম্পন অনুভূত হয়েছে। এই ভূমিকম্পে ভারতে বড় ধরনের কোনও ক্ষয়ক্ষতি না হলেও, ঘটনাটি দেশটির ভূমিকম্প-ঝুঁকি এবং এর মোকাবিলায় প্রস্তুতিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

বিভিন্ন কারণে ভারতের বেশ কিছু অংশে প্রায়ই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়ে থাকে। প্রথমত, আফগানিস্তান একটি সক্রিয় টেকটোনিক সংঘর্ষ অঞ্চলের ওপর অবস্থিত এবং হিন্দুকুশ অঞ্চলের ভূমিকম্পগুলো সাধারণত ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, ভূকম্পন তরঙ্গ সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চল দিয়ে খুব সহজেই পরিবাহিত হতে পারে। এবং সবশেষ কারণ হলো, উচ্চ তীব্রতার ভূমিকম্প থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, যার ফলে এর প্রভাব প্রতিবেশী ভারতের মতো দূরবর্তী এলাকাতেও অনুভূত হয়।

ভারতের ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (বিআইএস) দেশটির ভূমিকম্পের ঝুঁকির তীব্রতা অনুযায়ী একে চারটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বিভক্ত করেছে। এর মধ্যে ‘জোন-৫’ অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ‘জোন-২’ অঞ্চলকে সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের কিছু অংশ ‘জোন-২’ এর আওতাভুক্ত। অন্য দিকে কেরালা, গোয়া, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্রের বড় অংশ এবং উত্তর ও পশ্চিম ভারতের কিছু অংশ ‘জোন-৩’ বা মাঝারি ঝুঁকির অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

উচ্চ মাত্রার ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকা ‘জোন-৪’ অঞ্চলে রয়েছে দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশ।

সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ‘জোন-৫’-এর মধ্যে রয়েছে আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, জম্মু ও কাশ্মীরের কিছু অংশ, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, গুজরাটের কচ্ছের রণ অঞ্চল এবং বিহারের কিছু অংশ।

এই অঞ্চলগুলো কেন সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে?

ভারতীয় এবং ইউরেশীয় প্লেটের মধ্যকার সংঘর্ষ, হিমালয় অঞ্চলের সক্রিয় ফল্ট বা ফাটল রেখা, উত্তর-পূর্ব ভারতের জটিল টেকটোনিক গঠন, কচ্ছ অঞ্চলের ইন্ট্রাপ্লেট সিসমিক কার্যকারিতা এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাছের সাবডাকশন জোনের (যেখানে একটি টেকটোনিক প্লেট অপরটির নিচে চলে যায়) কারণে এসব অঞ্চলে ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়, যা একে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মূলত ভারতীয় প্লেটের গতিশীলতাই ভারতে ভূমিকম্প হওয়ার প্রধান কারণ। ভারতীয় প্লেটটি ক্রমাগত উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকায় প্লেটের সীমানা এবং ফাটল রেখাগুলোতে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়, যা সময় সময় ভূমিকম্পের মাধ্যমে মুক্ত হয়।

ভারত কীভাবে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ করে?

ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস) একটি শক্তিশালী ভূপৃষ্ঠ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশটির ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণের আনুষ্ঠানিক নোডাল সংস্থা হিসেবে কাজ করে। তাদের ২৪/৭ কমান্ড সেন্টার, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ডাটা স্ট্রিমিং এবং জনগণ ও সরকারকে তাৎক্ষণিক সতর্কতা বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থার কারণে এই সংস্থাটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি সম্ভব, এর সীমাবদ্ধতা কতটুকু?

বিজ্ঞানীরা নিখুঁতভাবে ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস দিতে পারেন না। তবে তারা কোন কোন অঞ্চলে ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা বেশি, তা চিহ্নিত করতে পারেন। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্যতা অনুমান করা এবং ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক দশক সেকেন্ডের মধ্যে প্রাথমিক সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব।

বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় ভারত কি প্রস্তুত?

ভারতের বর্তমান অবকাঠামো বিবেচনা করলে, একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প মোকাবিলায় দেশটির প্রস্তুতি বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী সন্তোষজনক নয়। দেশটিতে আধুনিক ভবন নির্মাণ বিধিমালা থাকলেও সেটির প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। কোনও আগাম সতর্কবার্তা ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু নেই। এ ছাড়া এই বিষয়ে জনসাধারণের সচেতনতা এবং প্রস্তুতিও খুবই নগণ্য।

তবে এই ধরনের কোনও দুর্যোগের ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হলো তাদের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (এনআরডিএফ)। ভারতের প্রস্তুতিকে আরও যে বিষয়গুলো সংকটে ফেলেছে তা হলো, প্রকৌশলগত নিয়ম না মেনে তৈরি করা প্রাচীন ভবনসমূহ, ভূমিকম্প প্রতিরোধী বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতার অভাব এবং অতিরিক্ত জনঘনত্বপূর্ণ নগর কেন্দ্রগুলো।

সূত্র: উইয়ন নিউজ