এত অভিযান-গ্রেফতারের পরও কেন ‘অনিরাপদ’ ঢাকা?

ঢাকা কি ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে? আন্তর্জাতিক একটি সূচক অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাভুক্ত শহরগুলোর মধ্যে অপরাধ সূচকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান সবচেয়ে খারাপ। নিরাপত্তা সূচকেও রয়েছে তলানিতে।

অথচ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে নিয়মিত। বিশেষ অভিযানেও গ্রেফতার হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ৮৮ দিনে সারা দেশে বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৯৩ জনকে। ৮ আগস্ট পর্যন্ত এ সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। এর বাইরে নিয়মিত মামলা ও অন্যান্য অভিযানে গ্রেফতারের সংখ্যা আরও বেশি।

তারপরও থামছে না চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন ও চাঁদাবাজি। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে শুধু ঢাকাতেই ৮৪১টি চুরির মামলা এবং ১১০টি হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে।

তাহলে এত অভিযান ও গ্রেফতারের পরও রাজধানী কেন নিরাপদ হচ্ছে না?

অপরাধ বিশ্লেষক ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসাবাড়িতে চুরি থেকে শুরু করে রাস্তায় ছিনতাই, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি—বিভিন্ন ধরনের অপরাধই নগরবাসীর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদক, অবৈধ অস্ত্র, কিশোর গ্যাং এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা।

তালা দিয়ে গিয়েছিলেন, ফিরে দেখলেন ঘর খালি

মা অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়ে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী গিয়েছিলেন রতন। রাজধানীর মগবাজারের সোনালীবাগে একটি ভবনের চতুর্থ তলায় থাকেন তিনি। গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

গত ২৪ জুলাই সকালে বাসায় তালা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি যান রতন। ২৭ জুলাই দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ফিরে দেখেন, দরজায় আর তালা নেই।

কেয়ারটেকার ও প্রতিবেশীদের নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখেন আলমারি ও ড্রয়ার খোলা। কাপড়চোপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পুরো ঘর তছনছ। আলমারিতে থাকা প্রায় তিন ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা নেই।

রতনের ধারণা, বাসায় কেউ না থাকার সুযোগে দরজার তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে চোরেরা আলমারি থেকে এসব নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছেন তিনি। ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ।

রতনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই একই ধরনের চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। কয়েক দিনের জন্য বাসা ফাঁকা রেখে বাইরে যাওয়ার পর ফিরে এসে ঘর তছনছ পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়।

রাস্তায়ও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কোথাও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কোথাও মোটরসাইকেলে এসে ব্যাগ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাধা দিলে হামলা চালানো হচ্ছে ধারালো অস্ত্র দিয়ে। কোথাও আবার আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে লুট করা হচ্ছে। ছিনতাইকারীদের হামলায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।

এক সময় গভীর রাত কিংবা ভোরকে রাজধানীর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সময় মনে করা হতো। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এখন অনেক এলাকায় সময়ের সেই বিভাজনও আর স্পষ্ট নয়।

ছয় মাসে ৮৪১ চুরি

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজধানীর থানাগুলোতে ৮৪১টি চুরির মামলা হয়েছে।

এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৪৩টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২৬টি, মার্চে ১৬১টি, এপ্রিলে ১৪৪টি, মে মাসে ১২৩টি এবং জুনে ১৪৪টি মামলা হয়েছে।

অর্থাৎ ছয় মাসে প্রতিদিন গড়ে চারটির বেশি চুরির ঘটনা থানার খাতায় নথিভুক্ত হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন পুলিশ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা। কারণ, সব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না। বিশেষ করে মোবাইল ফোন, টাকা বা ছোটখাটো জিনিস ছিনতাইয়ের পর অনেকে আইনি ঝামেলা এড়াতে থানায় যেতে চান না।

ছয় মাসে ১১০ হত্যা

একই সময়ে রাজধানীতে ১১০টি হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে। জানুয়ারিতে ১৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৫টি, মার্চে ২২টি, এপ্রিলে ১৬টি, মে মাসে ১৮টি এবং জুনে ২৩টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে।

অর্থাৎ গড়ে প্রতি দুই দিনেরও কম সময়ে একটি হত্যাকাণ্ড পুলিশের খাতায় উঠেছে।

এ সময়ে রাজধানীতে ২৩টি ডাকাতির ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। জানুয়ারিতে আটটি, ফেব্রুয়ারিতে তিনটি, মার্চে পাঁচটি, এপ্রিলে তিনটি এবং মে ও জুনে দুটি করে ডাকাতির মামলা হয়েছে।

এর বাইরে মাদক, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র, আধিপত্য বিস্তার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিভিন্ন ঘটনাও ঘটছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় অপরাধ সূচকে শীর্ষে ঢাকা

এই পরিস্থিতির মধ্যেই বৈশ্বিক তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘নাম্বিও’র ২০২৬ সালের ক্রাইম অ্যান্ড সেফটি ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাভুক্ত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অপরাধ সূচক সবচেয়ে বেশি। ঢাকার ক্রাইম ইনডেক্স ৬২ দশমিক ২ এবং সেফটি ইনডেক্স ৩৭ দশমিক ৮।

সূচকে দিল্লি, গাজিয়াবাদ, করাচি, কলম্বো, লাহোর ও কাঠমান্ডুর অবস্থান ঢাকার চেয়ে ভালো।

তবে নাম্বিওর সূচক সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। ব্যবহারকারীদের দেওয়া তথ্য, অপরাধের অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উপলব্ধির ভিত্তিতে এই তুলনামূলক সূচক তৈরি করা হয়। দিন বা রাতে একা চলাফেরার নিরাপত্তাবোধ, বাসায় চুরির আশঙ্কা, ছিনতাই, ডাকাতি, সহিংসতা ও মাদকসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের মতামত এতে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

তাই এই সূচককে সরাসরি অপরাধের সরকারি চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে ঢাকায় মানুষের নিরাপত্তাবোধ যে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে, তা এর মাধ্যমে বোঝা যায়।

৮৮ দিনে ৩৯ হাজার গ্রেফতার

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় পরিসরে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ৮৮ দিনের বিশেষ অভিযানে সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৯ হাজার ২৯৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৮ আগস্ট পর্যন্ত এ সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। বিশেষ অভিযানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এর বাইরে নিয়মিত মামলা ও অন্যান্য অভিযানে একই সময়ে গ্রেফতারের সংখ্যা লক্ষাধিক।

তারপরও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না—এটাই প্রশ্ন তুলছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত কৌশল নিয়ে।

‘চুরি-ছিনতাইকে ছোট অপরাধ ভাবার দিন শেষ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢাকায় চুরি ও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আর কাজ হবে না।

তার মতে, চুরি-ছিনতাইকে কেন্দ্র করে এখন সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে। এসব চক্রের সদস্যদের হাতে দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে। অপরাধের কৌশলও তারা রপ্ত করছে।

তিনি বলেন, চুরি-ছিনতাইকে খুব মাইনর ক্রাইম বা সহজে জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখার দিন শেষ।

তৌহিদুল হকের মতে, এসব অপরাধীর একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। ফলে অপরাধের সময় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ছিনতাইয়ের সময় ভুক্তভোগীকে গুরুতর আহত করা হচ্ছে, কোনো কোনো ঘটনায় প্রাণও যাচ্ছে।

বারবার একই অপরাধে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের বিশেষ নজর প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অপরাধীদের পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপরও জোর দেন তিনি।

নেপথ্যে মাদক ও সংঘবদ্ধ চক্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বেকারত্ব, আবাসন সংকট, মাদক এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র—সব মিলিয়ে রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিদিন কাজের সন্ধানে বিপুল মানুষ ঢাকায় আসছেন। কিন্তু সবার কর্মসংস্থান হচ্ছে না, আবাসনের ব্যবস্থাও নেই। এর একটি অংশ একপর্যায়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসায়ীরাও এসব মানুষকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে।

রেজাউল করিম বলেন, অপরাধীদের নেপথ্যে কেউ সুরক্ষা দিলে শুধু গ্রেফতার করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। পরিবার, কমিউনিটি, পুলিশ, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

পুলিশ বলছে, অপরাধ কমছে

তবে পুলিশ বলছে, রাজধানীর অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অপরাধের হার নিম্নমুখী।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাজধানীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চলছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তার দাবি, বর্তমানে অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এবং অপরাধের হারও কমছে। প্রতিটি ঘটনার সঠিক তদন্তের পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেফতারে কাজ করছে পুলিশ।

সম্প্রতি মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি ও অপহরণের মতো গুরুতর মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশও দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

শুধু গ্রেফতার নয়, ভাঙতে হবে অপরাধের অর্থনীতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেফতার বাড়ালে হবে না। অপরাধের পেছনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোও ভাঙতে হবে।

তাদের মতে, মাদকের সরবরাহ বন্ধ করা, অবৈধ অস্ত্রের উৎস শনাক্ত করা, চোরাই পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রক ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা এবং একই অপরাধী যাতে বারবার অপরাধে ফিরতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

কারণ একটি শহরের নিরাপত্তা শুধু কতজনকে গ্রেফতার করা হলো, সেই সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। নগরবাসী কতটা নিরাপদ বোধ করছেন এবং অপরাধের মূল কারণগুলো কতটা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে—সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি শহরের নিরাপত্তার আসল পরীক্ষা।