বনবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ১৯৬৬ সালের পর এ যাবতকালীন বনায়নের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ লাখ ৩৬ হাজার একর জায়গা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করে সরকার। বন আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী একে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৭ সালের ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিঝুম দ্বীপে এসে দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একে জাতীয় উদ্যানের ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণা অনুযায়ী ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল জাহাজমারা রেঞ্জের আওতাধীন ১১টি মৌজার ৪০ হাজার ৩৯০ একর জমি উদ্যানের অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপর ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর গেজেটের মাধ্যমে একে সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরমধ্যেই ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে নিঝুম দ্বীপকে নতুন ইউনিয়ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
চরওসমান, চরকমলা, চরআফতাব মিলে নিঝুম দ্বীপের আয়তন প্রায় ২০ হাজার একর। ওই ঘোষণার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন নিঝুম দ্বীপের সংরক্ষিত বনের জমি বন্দোবস্ত দিতে শুরু করে। তার আগেও বনদস্যুরা দ্বীপের গাছপালা কেটে ভূমিহীনদের মাঝে জমি বিক্রি করেছিল। ওই সময়ই নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের রাস্তারচর, দমারচর, কালামচর, চরমিজান, চরমাহিদসহ সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যানের অনেক বনভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়ে যায়। বনবিভাগের অভিযোগ, ভূমি অফিস থেকে সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যানের আওতাভুক্ত জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে।
নিঝুম দ্বীপকে ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবে ঘোষণা করার পর একে ৯টি ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়। এর প্রতিটি ওয়ার্ড সংরক্ষিত ও জাতীয় উদ্যানের একেকটি অংশ। নিঝুম দ্বীপকে ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবে ঘোষণা করার পর ইউনিয়ন পরিষদ ও বন বিভাগের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ইউনিয়ন পরিষদ তার ওয়ার্ড উন্নয়নের নামে জাতীয় উদ্যানের ভেতরে সড়ক নির্মাণ ও বসতি বসাতে শুরু করে। বসতি শুরু হওয়ার পর থেকে শুরু হয় বনের বৃক্ষনিধন
নিঝুম দ্বীপকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণার পর থেকে এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন মেহেরাজ উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে জাতীয় উদ্যানের গাছ কাটা, ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া ও বসতি নির্মাণসহ নানা কারণে ১৩টি মামলা করেছে বনবিভাগ। চেয়ারম্যান মেহেরাজ উদ্দিনের দাবি, নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান হলেও সবটাই তার ইউনিয়ন পরিষদের অংশ। সে কারণে জনবসতি শুরু হয়েছে। যে যার মালিকানাধীন ভূমির গাছ কেটে বসতি গড়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ইট-পাথর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। দ্বীপের ছোঁয়াখালী এলাকায় দেখা গেছে, ছোঁয়াখালী থেকে বন্দরটিলা বাজারের পশ্চিম পাশের বউবাজার পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্যানের বাগান কেটে চাষাবাদ ও বসতি গড়ে তোলা হয়েছে।
দ্বীপের ছোঁয়াখালী খালের ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি লাইট হাউজ নির্মাণ কাজ চলছে। কিন্তু নিঝুম দ্বীপে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও কীভাবে লাইট হাউজ নির্মাণ করা হচ্ছে সে বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।
প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেছেন জাহাজমারা রেঞ্জের নিঝুম দ্বীপ (চরওসমান) বিটের এক কর্মকর্তাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর চেয়ারম্যান মেহরাজ উদ্দিনকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি কোনও কথাই শুনছেন না। তার লোকজন দিয়ে বনের গাছ কেটে জমি দখল করেই চলেছেন।’
জানতে চাইলে রফিক উদ্দিন এনায়েত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে কীভাবে সরকার আবার ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করে সেটা আমার বুঝে আসছে না। আমরা এ নিয়ে আদালতেও গিয়েছি। এ সময় স্থানীয় চেয়ারম্যান মেহেরাজ উদ্দিন ২০১৪ সালের দিকে আদালতে একটি মামলা করেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রুল জারি করে নিঝুম দ্বীপে ইউনিয়ন ও বনবিভাগের জমি আলাদা করে সীমানা নির্ধারণের জন্য কেন আদেশ দেওয়া হবে না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জবাব চেয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত শুধু বনবিভাগ ছাড়া আর কেউ রুলের জবাব দেয়নি। পরে মামলাকারী চেয়ারম্যানও আর মামলাটি তদারকি করেননি। কারণ, আদালত সীমানা নির্ধারণের জন্য আদেশ দিলে ইউনিয়ন পরিষদ থাকবে না। ইউনিয়ন পরিষদ তো বনবিভাগের জমিতে। আর আমাদের মামলাটির আগামী তারিখে একটা রায় হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ ঘোষণা হয়েছে। তবে বন বিভাগের বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধারে একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, সরকারে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির রূপরেখা অনুসারে বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অনুমিত অবদান (এনডিসি), ২০১৫’তে জাতীয় প্রশমন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্যমাত্রার আলোকে বাংলাদেশ উপকূলীয় বনের সীমা বৃদ্ধিকে ̧গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সমন্বয়ে জলবায়ু প্রশমন সহায়ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বনায়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণমূলক প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করবে। কার্যক্রমের ধরনভেদে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটিএফ) হতে প্রদত্ত তহবিলের প্রায় ৫২ শতাংশ তহবিল (৩১৬ কোটি টাকা) বনায়ন ও বন ব্যবস্থাপনায়, ৩২ শতাংশ তহবিল (১৯৫ কোটি টাকা) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন এবং ১৬ শতাংশ তহবিল (৯৮ কোটি টাকা) প্রশমন সংক্রান্ত অন্যান্য কাজে ব্যয় করা হচ্ছে। এভাবে একটি অর্থ ব্যয় অন্যদিকে বন ধ্বংসের জন্য সহায়ক সিদ্ধান্ত জলবায়ুর জন্য ইতিবাচক হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ল্যান্ড বিভাগ একভাবে চলে আর বন বিভাগ এক ভাবে চলে। কারো সঙ্গে কারও সমন্বয় নেই। বন বিভাগের মতামত ছাড়া তো সরকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করতে পারে না।
আরও পড়ুন...
নিঝুম দ্বীপের বন সাবাড় করছে বন্দোবস্তপ্রাপ্তরা
সৌরবাতি প্রকল্পে মাটির নিচেই নষ্ট হলো কোটি টাকার যন্ত্র
জলবায়ুর টাকায় ফুট ওভারব্রিজ, ট্রাফিক বাতি!
বায়ুদূষণ কমাতে ৮০০ কোটি টাকা: বেতন-ভাতা, যন্ত্রপাতি আর বিদেশ ভ্রমণেই ফুরালো!
জলবায়ুর টাকা পুরোটাই গেছে জলে, ২৯৬ জনের বিদেশ সফর
৮ হাজার একর বন উজাড়, ক্ষতি সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা!
৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ৩০ কোটি নিলো পরামর্শকরাই!