জলবায়ুজনিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। ঝুঁকি কমাতে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হলেও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না কোনোটির। জলবায়ু তহবিলের প্রকল্পগুলোতেও চলছে অর্থের তছরুপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অদক্ষতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নানা দিক ও এ খাতের অনিয়ম নিয়ে শাহেদ শফিকের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে ত্রয়োদশ পর্ব
দায়িত্বে থাকা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকেও বারবার আপত্তি জানানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চুক্তির শর্তানুযায়ী করপোরেশন থেকে তারা সহযোগিতা পাচ্ছে না। তাছাড়া করোনার কারণে কেন্দ্র পরিচালনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদরঘাট লঞ্চ টারমিনালের উত্তর-পূর্ব কোণে ভবনটির অবস্থান। ভবনটির দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশে আলাদা চারটি কক্ষ নিয়ে কাউন্সিলর কার্যালয়। জানতে চাইলে কাউন্সিলর আবদুর রহমান মিয়াজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবনটি নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হয়নি। নকশায় এতে একটি কাউন্সিলর কার্যালয় রয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে কাউন্সিলর কার্যালয় উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে আমার একটি রিট আবেদন করা আছে। আদালত সে পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।’
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, সদরঘাটের ভবনটি দীর্ঘদিন ফাঁকা পড়ে থাকার পর নগরীতে অবস্থানরত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য বেসরকারি সংস্থা সাজেদা ফাউন্ডেশনকে দায়িত্ব দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে তার নামেই এর নামকরণ করা হয়। এ জন্য করপোরেশনের বোর্ডসভার অনুমোদনও নেওয়া হয়। কিন্তু বোর্ডসভার অনুমোদনের পরও স্থানীয় কাউন্সিলরের বাধার মুখে পড়ে আশ্রয়কেন্দ্রটি। তিনি ভবনের চারটি কক্ষ ও ভবনের নিচে থাকা পাবলিক টয়লেটটিও দখলে রাখেন। কথা ছিল অত্যাধুনিক এই পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের জন্য যে অর্থ পাওয়া যাবে তা আশ্রয়কেন্দ্রের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
বোর্ডসভার অনুমোদনের পরও কার্যালয় সরিয়ে না নেওয়াটা করপোরেশনের কাজে বাধার সামিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুর রহমান মিয়াজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি বোর্ডসভায় এলাকাবাসীর দাবি উত্থাপন করেছি। তখন বলা হয়েছিল এ নিয়ে আমার সঙ্গে বসা হবে। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ না করেই সাজেদা ফাউন্ডেশনকে ভবনটি দিয়ে দিয়েছে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির প্রতিটি ফ্লোরে আধুনিক ব্যবস্থা থাকলেও তাতে কোনো জলবায়ু উদ্বাস্তুর দেখা মেলেনি। প্রতিটি কক্ষ প্রায় ফাঁকা রয়েছে। তবে শিশুদের কক্ষগুলোতে ৪-৫ জন শিশুকে খেলতে দেখা গেছে। ভবনের মূল ফটকে কয়েকজন দায়িত্ব পালন করছেন।
ভবনের তৃতীয় তলার বাম পাশে রয়েছে দুই থেকে ছয় বছর বয়সী ৮৫ জন শিশুর জন্য প্রারম্ভিক বিকাশ কার্যক্রম (ইসিডি) ও দিবাযত্ন কেন্দ্র। এ ছাড়া ৭ থেকে ১০ বছরের শিশুদের শিক্ষাসহ সব শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাদ্য ও বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে। ডান পাশে ৮৫ জন স্কুলপড়ুয়া শিশুর জন্য শিক্ষা, শারীরিক বা মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম ও সচেতনতামূলক শিক্ষা সেশন রয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় রয়েছে ৪৫২ জনের জন্য আবাসন সুবিধাসহ জীবিকা উন্নয়ন ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুবিধা। ভবনসংলগ্ন একটি উন্নতমানের প্রতিবন্ধীবান্ধব সেবাকেন্দ্র এবং পাবলিক টয়লেট ও মানবিক অধিকার নিশ্চিতকরণে রয়েছে একটি মাতৃদুগ্ধপান কেন্দ্র। এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য রয়েছে কমিউনিটিভিত্তিক মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানের সুব্যবস্থা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাজেদা ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা জানান, ‘সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি হয়েছে সেটা তারা পুরোপুরি পালন করতে পারেনি। কাউন্সিলর কার্যালয়টি সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও সরেনি। পাবলিক টয়লেটটিও তার দখলে। এখন পর্যন্ত সব কিছু আমাদের অর্থেই চলছে। সব মিলিয়ে আমাদের মতামত কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখন তাদের সঙ্গে বসে বিষয়টি সুরাহা করা হবে।’
জলবায়ু উদ্বাস্তু আশ্রয়কেন্দ্রটি তদারকির দায়িত্বে রয়েছে ডিএসসিসির বস্তি উন্নয়ন বিভাগ। জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা একেএম লুৎফুর রহমান সিদ্দীক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা জলবায়ু উদ্বাস্তু আশ্রয়কেন্দ্রটি নিয়ে স্থানীয় কাউন্সিলরের সঙ্গে ঝামেলা চলছে। তাকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার জন্য আমরা কয়েকবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তিনি সরেননি। এখন কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত দেবে তা বাস্তবায়ন করা হবে।’
জানতে চাইলে সাজেদা ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, ‘ভবনটি আর পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা বিষয়টি জানিয়ে গত অক্টোবর মাসে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি। তাতে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। চিঠি পেয়ে ডিএসসিসি মেয়র আমাদের সঙ্গে বসবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এখনো তারিখ নির্ধারণ হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তিতে যেসব শর্ত ছিল তার কিছুই মানেনি ডিএসসিসি। ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের প্রভাবে কোনও কাজও করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যে সেবামূলক কাজের জন্য ভবনটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম সেটা না হলে অযথা চুক্তি রেখে লাভ কী?’
আরও পড়ুন...
জাতীয় উদ্যান-সংরক্ষিত বনাঞ্চল যখন ইউনিয়ন পরিষদ!
বিলুপ্তির পথে নিঝুম দ্বীপের চিত্রা হরিণ
সৌরবাতি প্রকল্পে মাটির নিচেই নষ্ট হলো কোটি টাকার যন্ত্র
জলবায়ুর টাকায় ফুট ওভারব্রিজ, ট্রাফিক বাতি!
বায়ুদূষণ কমাতে ৮০০ কোটি টাকা: বেতন-ভাতা, যন্ত্রপাতি আর বিদেশ ভ্রমণেই ফুরালো!
জলবায়ুর টাকা পুরোটাই গেছে জলে, ২৯৬ জনের বিদেশ সফর
৮ হাজার একর বন উজাড়, ক্ষতি সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা!
৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ৩০ কোটি নিলো পরামর্শকরাই!