দেশ থেকে প্রতিবছরই টাকা পাচার বাড়ছে। কিন্তু তা ফেরত আনার ব্যাপারে তেমন কোনও উদ্যোগ নেই। এর ফলে একদিকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বিনিয়োগ থেকে, অন্যদিকে যুবকরা বঞ্চিত হচ্ছে চাকরি থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ স্বাভাবিক না থাকায় উদ্যোক্তারা নানা উপায়ে দেশের বাইরে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন।
অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ বছর ধরে (২০০৭-২০১৫) বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা বিরাজ করছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫ হাজার ৫৮৮ কোটি ডলার বা ৪ লাখ ১৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭২ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। সংস্থাটির সর্বশেষ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ওই অর্থ বাংলাদেশের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, পল্লী উন্নয়ন, শিল্প ও ভৌত অবকাঠামো খাতের মোট উন্নয়ন বাজেটের সমান।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘দেশ থেকে সব সময় কমবেশি টাকা পাচার হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০১৩ সালে দেশ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। তখনকার হিসাবে তিনটি পদ্মা সেতু নির্মাণের সমপরিমাণ ছিল এ অর্থ।’ অর্থপাচারের পেছনে দেশের মানুষের পাশাপাশি বাইরের কিছু দুষ্ট প্রকৃতির মানুষও জড়িত ছিলেন বলে তিনি মনে করেন। ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘বিনিয়োগ স্থবিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উদ্যোক্তা অন্য দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। এটা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।’
জিএফআই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা সম্পদ গড়েন, তারাই মূলত এ অর্থ পাচার করেন। পাশাপাশি দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নিজেদের পরিবার এবং সন্তানদের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জন্য বিভিন্নভাবে অর্থ বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ ভারতসহ ৩৭টি দেশে টাকা পাচার করেছেন। পাচার করা অর্থের বেশির ভাগই মালয়েশিয়া, ব্যাংকক ও দুবাই চলে গেছে। সেকেন্ড হোমের সুবিধা নিয়েও দেশ থেকে প্রচুর টাকা পাচার হয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত রয়েছে, সেই সব দেশের আবাসিক ভবন, জমি ক্রয়, হোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। এদের মধ্যে অনেকে অফসোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচার করেছেন, অনেকে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন। এছাড়া বিদেশি নাগরিকদের চাকরি দেওয়া বা কনসালটেন্ট নিয়োগের নামেও বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার হয়েছে। বিদেশে পাচারকৃত অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলকে ব্যবহার করে পাচার হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী পণ্য আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিং করে, অর্থাৎ পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা বিদেশে পাচার করছেন। আবার পণ্য রফতানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং করে, অর্থাৎ পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে রফতানি পণ্যের মূল্যের একটি অংশ বিদেশেই রেখে দিচ্ছে। এভাবে আমদানি-রফতানির মাধ্যমে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে অর্থ পাচার করছেন।
এদিকে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণের একটি অংশ বিদেশে পাচার করার কারণে অনেক ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেন না। এর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। এর বাইরে ব্যাংক আগের খেলাপি হওয়া ৪১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪৮ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, পাচার হওয়া অর্থ দেশে বিনিয়োগ করলে কর্মসংস্থান কয়েকগুণ বেড়ে যেত। তিনি বলেন, ‘জীবনের নিরাপত্তা যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন দেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পান বিনিয়োগকারীরা। এজন্য তারা তাদের মূলধন বিদেশে নিয়ে যান অনৈতিক পন্থায়।’
মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা যদি দেশে বিনিয়োগ করা হতো তাহলে দেশের চেহারাই পাল্টে যেত। এমনকি যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তার অর্ধেকও যদি বিনিয়োগ করা হতো, ওই বিনিয়োগ থেকে উৎপাদিত পণ্য দিয়ে বর্ধিত হারে দেশের চাহিদা মেটানো যেত।’ তিনি বলেন, ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে রাখতে হলে জাতীয় উৎপাদনে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হতে হবে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তা ২১ শতাংশের ওপরে যাচ্ছে না।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ না বাড়ায় কমে গেছে কর্মসংস্থান। আবার বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস)-এর প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৫ অনুযায়ী, গত দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৩ লাখ মানুষ চাকরি বা কাজ পেয়েছেন।
অন্যদিকে, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারপ্রেস নেটওয়ার্ক (আইপিএন)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিবছর প্রায় ২৭ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে আসেন। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ পান মাত্র ২ লাখ মানুষ। বিনিয়োগ পরিবেশ ভাল না থাকায় গত দুই বছরে অর্ধকোটি মানুষ বেকার হয়েছে।
আইপিএন-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ ভাল না থাকায় অর্থ পাচার বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ না থাকা এবং বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার সহজলভ্য হওয়ায়, এর পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জিএফআই-এর ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে পাচার হয়েছে ৭৩ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা, ২০১২ সালে ৫৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, ২০১১ সালে ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা, ২০১০ সালে ৩০ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা এবং ২০০৯ সালে ৪৯ হাজার ১৬ কোটি টাকা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর ২০০৭ ও ২০০৮ সালে পাচার হয়েছে ৮৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে আইপিএন-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক আনোয়ারুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার সহজলভ্য হওয়ায় প্রভাবশালীরা প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে নিয়ে যান। দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ ভাল না থাকায় অনেকে ঝুঁকি নিয়েও অর্থ পাচার করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিনিয়োগ পরিবেশ স্বাভাবিক হলে অর্থ পাচার বাড়তো না, বরং কমতো। এতে করে দেশের বেকার যুবকেরা ভাল ভাল চাকরি পেত।’
এদিকে, অর্থ পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত ৩৮টি দেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও টাকা ফেরত আনার বিষয়ে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছরে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ভিত্তিতে ইতোমধ্যে অর্থ পাচার সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ৩৮টি দেশের সঙ্গে চুক্তি (এমওইউ) করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।’
আরও পড়ুন-
যে পরিস্থিতিতে দেশে ফিরবেন তারেক রহমান!
ক্রসফায়ারের মুখেও বেপরোয়া জঙ্গিরা
/এসএ/ এপিএইচ/







