মূলধন খোয়ানোর ভয়ে পুঁজিবাজারে হচ্ছে না প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২০:৪৫, অক্টোবর ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২১, অক্টোবর ২৬, ২০১৯

শেয়ারবাজারবাংলাদেশের পুঁজিবাজার চাঙা করতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ কাজে লাগছে না। পরপর দুই সপ্তাহ টানা পতনের পর সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) কিছুটা চাঙাভাব থাকলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি এই শেয়ারবাজার। এছাড়া, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকি নিয়ে এই ডুবন্ত বাজার থেকে শেয়ার কিনছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাজারের এই অবস্থা দেখে কেউই ঝুঁকি নিতে চাইছে না। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ হচ্ছে না মূলত মূলধন খোয়ানোর ভয়ে।’ তিনি বলেন, ‘বেশি মূল্যে শেয়ার কিনে কম মূল্যে বিক্রি করলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ‘কর্মাসিয়াল অডিটে’ ধরা হয়। এই ভয়ে শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ হচ্ছে না।’

তবে অচিরেই শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মন্তব্য করে ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘অনেকেই এখন দীর্ঘমেয়াদে এই বাজারে বিনিয়োগ করছেন। দীর্ঘমেয়াদের ভালো কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগ করলে লোকসান হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।’ তার মতে, ‘যে সব কোম্পানি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ডিভিডেন্ড দেয়, সেই সব কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করলে অনেক লাভ হওয়ার কথা। তবে, আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীদের বড় একটা অংশই স্বল্পমেয়াদে লাভ করার চিন্তাই বেশি করে।’

এদিকে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ভালো কোম্পানি যেন শেয়ারবাজারে আসতে পারে, সে জন্য উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এছাড়া, কোম্পানির প্রসপেক্টাসগুলো গভীরভাবে দেখভালের জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) নতুন করে এক্সপার্ট প্যানেল গঠন করতে যাচ্ছে।

এদিকে বাজারের গতি ফেরাতে বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও ডিএসই ব্রোকারের্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক করেছেন বিএসইসি’র চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন। বৈঠকে ডিএসই’র পরিচালকরা ও ডিবিএ’র প্রেসিডেন্ট বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অবশ্য এই পরিস্থিতিতেও কমিশন বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে উন্নয়ন ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বিএসইসি ও ডিএসই একযোগে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছে।

যদিও এর আগে শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে বৈঠক করেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়াতে নগদ অর্থ জোগান দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। আইনি সীমার মধ্যে থেকে যেসব ব্যাংকের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, তাদের রেপোর বিপরীতে নগদ অর্থ সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া এই সুবিধা নিতে এ পর্যন্ত খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না ব্যাংকগুলো।

কেন ব্যাংকগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে ড. জায়েদ বখত বলেন,  ‘কমার্সিয়াল অডিটে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে যেসব বিধি-নিষেধ আছে, সেগুলো যদি কিছুটা শিথিল করা যায় তাহলে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাহস নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ বাড়ালে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।’

ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘কর্মাসিয়াল অডিট শিথিল হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করার ব্যাপারে উৎসাহ পাবে। কারণ, এখন শেয়ারের খুবই মূল্য কম। এখন বিনিয়োগ করার ভালো সময়। এরপরও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাহস পাচ্ছে না, যদি আরও পড়ে যায় এই ভয়ে। মূল্য আরও পড়ে গেলে তখন কম মূল্যে বিক্রি করে বের হয়ে আসতে চাইলে কর্মাসিয়াল অডিটে ধরবে। এই ভয়টা এখন কাজ করছে।’

অগ্রণী ব্যাংকের এই চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘সার্বিকভাবে শেয়ার বিক্রি করে যদি লোকসান করি তাহলেই ধরা উচিত। মোট শেয়ার বিক্রির পর যদি লাভেও থাকি তাহলেও ধরা হয়।  বেশি মূল্যে শেয়ার কিনে কম মূল্যে বিক্রি করলেই কর্মাসিয়াল অডিটে আমাদের ধরা হয়। হয়তো এ জন্যই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাহস নিয়ে আসছে না। তবে কর্মাসিয়াল অডিট শিথিল হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাহস নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারবে।  

তথ্য বলছে, ডিএসইর প্রধান সূচকটি চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল গত ২৪ জানুয়ারি। ওই দিন সূচক ছিল ৫ হাজার ৯৫০ পয়েন্টে ও বাজার মূলধন ছিল প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। 

বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর)  সেই সূচক নেমে এসেছে ৪ হাজার ৭৭২ পয়েন্টে। আর বাজার মূলধন কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার কিছু ওপরে। প্রায় ৫০টি কোম্পানির শেয়ারদর এখন ফেসভ্যালুরও নিচে নেমে গেছে।

শেয়ারবাজারের এই মন্দা পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার কিনছে না। এমন অবস্থায় প্রতিনিয়ত দরপতনের কবলে পড়ছে এই বাজার। আর এতে পুঁজি হারাচ্ছেন ছোট ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা। লেনদেন কমতে কমতে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে চলে এসেছে। বৃহস্পতিবার ডিএসইতে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যদিও ২০১০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তিন হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হতো।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ