পাচারের পর ফেরত আনা অর্থ এখন কোথায়?

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৮:১৭, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৮, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০

টাকাদেশ থেকে প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া এই টাকা ফিরিয়ে আনার নজির কমই।  তবে অতি সামান্য হলেও পাচারের কিছু অর্থ দেশে ফেরত এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত পাচারের মাত্র দুটি ঘটনার টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। এর একটি হলো বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা অর্থ ফেরত আনা হয়েছে। অন্যটি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফেরত এসেছে।

অনেকেরই জিজ্ঞাসা, পাচারের পর ফেরত আনা সেই  টাকার পরিমাণ কত এবং এই টাকা কোথায় রাখা হয়েছে? এই টাকা  কোন কোন খাতে ব্যবহার করা হয়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিন দফায় সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে থাকা আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা ২১ কোটি টাকা ফেরত আনা হয়। এছাড়া  ফিলিপাইন থেকে এখনও পর্যন্ত ফেরত এসেছে এক কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং শ্রীলঙ্কা থেকে এসেছে দুই কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন,  রিজার্ভ থেকে  হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হওয়ার পর ফেরত আনা অর্থ রিজার্ভেই রয়েছে। আর আরাফাত রহমান কোকোর পাচারের অর্থ ফেরত এনে অর্থপাচার প্রতিরোধ কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে  বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা টাকা ফেরত এনে তখনই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক ) কে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মূলত এই টাকা ব্যয় হয়েছে অর্থপাচার ও দুর্নীতি প্রতিরোধে। এছাড়া ফিলিপাইনে যাওয়া রিজার্ভের এক কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং শ্রীলঙ্কায় যাওয়া দুই কোটি ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে জমা হয়েছে।’ এখনও সেই টাকা রিজার্ভেই জমা আছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়ে যায়। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার যায় ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে। আর দুই কোটি ডলার যায় শ্রীলঙ্কায়।

বিশ্বব্যাপী আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা  এক মাসেরও বেশি সময় গোপন রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে এই ঘটনায় ১৬ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গর্ভনর ড. আতিউর রহমান  ও দুই ডেপুটি গর্ভনর পদত্যাগ করেন।

এদিকে ২০১২ ও ২০১৩ সালে আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংক থেকে ২১ কোটি ৫৫ হাজার টাকা তিন দফায় দেশে ফেরত আনা হয়। প্রথম দফায় আসে ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় দফায় ১৫ লাখ টাকা এবং তৃতীয় দফায় আসে সাত কোটি ৪৩ লাখ ৬৯ হাজার ৪১৫ টাকা।

জানা গেছে, ২০১২ সালের  নভেম্বরে প্রথম দফায় ২০ লাখ ৪১ হাজার ৫৩৪ দশমিক ৮৮ সিঙ্গাপুরের ডলার দেশে ফেরত আনে দুদক— যা বাংলাদেশি টাকায় ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এরপর দ্বিতীয় দফায় ২০১৩ সালের ৩ জানুয়ারি ২৩ হাজার ৮০০ সিঙ্গাপুরি ডলার— যা বাংলাদেশি প্রায় ১৫ লাখ টাকা আনে দুদক এবং একই বছরের ১৩ আগস্ট সিঙ্গাপুর ওভারসিস ব্যাংক থেকে আরও নয় লাখ ৫৬ হাজার ৩৮৭ মার্কিন ডলার বাংলাদেশে পাঠানো হয়। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ সাত কোটি ৪৩ লাখ ৬৯ হাজার ৪১৫ টাকা। এ অর্থ বহুজাতিক কোম্পানি সিমেন্স থেকে ঘুষ হিসেবে নিয়েছিলেন কোকো।

জানা গেছে, কোকোর পাচারের টাকা ফেরত পেতে সরকারকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর করা মামলার রায়ে পাচারের বিষয়টি উঠে আসে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফএফআই) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, ‘এফবিআইয়ের করা মামলা হলেও আমাদের চেষ্টার ফলে কোকোর পাচারের টাকা ফেরত এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘বিএফএফআই ছাড়াও  দুর্নীতি দমন কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টায় কোকোর পাচার করা অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।’ তবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা একটি জটিল প্রক্রিয়া বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে টাকা পাচারকারীর প্রকৃত সংখ্যা জানা না গেলেও বছরে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, তার ধারণা পাওয়া যায়  মার্কিন গবেষণা সংস্থাসহ কয়েকটি বিদেশি সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার ২৭০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে, যা স্থানীয় মুদ্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। আর সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৮’ শীর্ষক যে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় পাঁচ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ