স্যামসন এইচ চৌধুরীর সন্তানদের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে স্কয়ার গ্রুপ

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৮:১৭, অক্টোবর ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৪, অক্টোবর ০১, ২০২০

স্কয়ার গ্রুপ

চার বন্ধুর মাত্র ২০ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে ১৯৫৮ সালে পাবনার আতাইকুলায় যাত্রা শুরু হয়েছিল স্কয়ারের। যদিও যাত্রার শুরুতে প্রথম তিন বছর কোনও লাভের মুখ দেখেনি কোম্পানিটি। সেই স্কয়ার এখন দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী। দেশের গন্ডি পেরিয়ে অনেক আগেই নিজেদের পণ্য ভিনদেশে নিয়ে গেছেন তারা। স্কয়ার প্রতিনিয়তই উন্নত ও প্রসারিত হচ্ছে। স্কয়ারের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ বর্তমানে ১১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। বিদেশেও শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছে স্কয়ার।

২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার সন্তানরাই (তিন ভাই  ও এক বোন) স্কয়ারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন স্যামসন এইচ চৌধুরীর নাতি-নাতনিরাও। স্কয়ারকে বহুজাতিক কোম্পানি করার উদ্যোগটি মূলত তারাই নিয়েছেন। সেই লক্ষ্যেই  প্রায় ১৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানা।

বর্তমানে স্কয়ার গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন স্যামসন এইচ চৌধুরীর তিন ছেলের মধ্যে বড় স্যামুয়েল এস চৌধুরী ওরফে স্বপন চৌধুরী। তিনি বর্তমানে স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান। মেজো ছেলে তপন চৌধুরী স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল ও স্কয়ার হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।  ছোট ছেলে অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু মাছরাঙা টেলিভিশন, স্কয়ার টয়লেট্রিজ ও স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। একমাত্র মেয়ে রত্না পাত্র স্কয়ার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। আর স্কয়ারের নেপথ্যের প্রেরণাদাতা হিসেবে রয়েছেন তাদের মা অনিতা চৌধুরী। ব্যবসায়িক বা পারিবারিক যেকোনও বিষয়ে ভাই-বোনের মধ্যে মতভেদ দেখা দিলে বা যেকোনও জটিল পরিস্থিতির সমাধানে নেপথ্যে  কাজ করেন তাদের মা। এছাড়াও বিশেষ বিশেষ সিদ্ধান্ত দেন মা অনিতা চৌধুরী।

স্কয়ারের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘তিন ছেলেই তাদের প্রয়াত বাবা স্যামসন এইচ চৌধুরীর মিশন ও ভিশন অব্যাহত রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। স্যামসন চৌধুরী বেঁচে থাকা অবস্থায় তার উত্তরসূরি বিশেষ করে সন্তানদের মধ্যে তার সম্পদ  বণ্টন করে দিয়ে গেছেন। স্কয়ার বর্তমানে সেভাবেই চলছে। ছেলেদের যার যে ব্যবসা  তিনিই তা দেখভাল করছেন। ফলে কারও সঙ্গে কারও বিবাদ হওয়ার সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গত, স্যামসন এইচ চৌধুরীর নেতৃত্বে চার বন্ধু ডা. কাজী হারুনার রশিদ, ডা. পিকে সাহা এবং রাধা বিনোদ রায় মিলে পাবনা শহরের শালগাড়িয়ায় ১৯৫৮ সালে স্কয়ারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তখন নাম ছিল স্কয়ার ফার্মা। ২০ হাজার টাকা মূলধনের সেই কারখানায় শ্রমিক ছিল মাত্র ১২ জন। ১৯৬৪ সালে স্কয়ার ফার্মা নাম বদল করে হয়  স্কয়ার ফর্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড। 

জানা গেছে, চার জনের সমান বিনিয়োগ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়েছিল স্কয়ার। ১৯৭১ সালে রাধাবিনোদ রায় নিজের মালিকানার অংশ ছেড়ে দেন। হারুনার রশিদ ও পি. কে. সাহার মালিকানার অংশ এখনও রয়ে গেছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সাল ছিল স্কয়ারের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। ওই বছর কয়েকটি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে স্কয়ারের চুক্তি হয়। স্কয়ারকে সম্পূর্ণ আধুনিক রূপ দেন স্যামসন চৌধুরী। আশির দশকে দেশের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করে নেয় স্কয়ার। ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি শুরু করে স্কয়ার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বর্তমানে বিশ্বের ৪২টি দেশে ওষুধ রফতানি করছে স্কয়ার। এরমধ্যে রয়েছে এশিয়ার ১৯টি দেশ, আফ্রিকার ১৩টি, ওশেনিয়া অঞ্চলের ৩টি, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার ৬টি এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ রফতানি করা হয়।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের এখনকার টার্গেট বিদেশে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে এরইমধ্যে কেনিয়ায় কারখানা তৈরি করছে কোম্পানিটি। চলতি বছরের শেষ নাগাদ কেনিয়ার কারখানায় ওষুধের উৎপাদন শুরু করতে চায় স্কয়ার। এর মাধ্যমে কেনিয়াসহ পূর্ব আফ্রিকার ছয়টি দেশের ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের ওষুধের বাজার ধরতে চান তারা।

১৯৮৭ সালে স্কয়ার প্রথম তাদের তৈরি ওষুধ বিদেশে রফতানি করে। নব্বই দশকের শুরুতে কোম্পানিটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে বাজারে শেয়ার ছাড়ে। ১৯৫৮ সালের সেই ছোট উদ্যোগই আজকের  স্কয়ার গ্রুপ ।

১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করে ‘স্কয়ার টয়লেট্রিজ’। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্প গড়ে উঠতে শুরু করে। তখন স্পিনিং মিল করার সিদ্ধান্ত নেয় স্কয়ার। বর্তমানে গাজীপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা ও হবিগঞ্জে স্কয়ারের বস্ত্র ও পোশাক কারখানা রয়েছে। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্কয়ার টেক্সটাইল লিমিটেড। দুই যুগের ব্যবধানে স্কয়ার বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্রকল। কয়েক বছর পর স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘অ্যাগ্রো কেমিক্যালস ভেটেরিনারি’ ইউনিট খোলা হয়। স্যামসন চৌধুরীর ব্যবসায়িক দক্ষতায় কয়েক বছরের মধ্যেই একে একে যাত্রা শুরু করে স্কয়ার স্পিনিং লিমিটেড, স্কয়ার নিট ফেব্রিকস লিমিটেড, স্কয়ার ফ্যাশন লিমিটেড, স্কয়ার কনজিউমার প্রডাক্ট লিমিটেড, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, স্কয়ার ইনফরমেটিক্স এবং স্কয়ার হসপিটাল। পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতাল বর্তমানে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। তবে সেই মুনাফা উদ্যোক্তারা নেন না। পুনর্বিনিয়োগ করেন। এমনকি নিজেরাও এ  হাসপাতালে নগদ অর্থ দিয়ে চিকিৎসা নেন।

বর্তমানে ভোগ্যপণ্য, বস্ত্র, মিডিয়া, তথ্যপ্রযুক্তি, হাসপাতাল, নিরাপত্তা সেবা, ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স, হেলিকপ্টার সার্ভিস ও কৃষিপণ্য খাতে তাদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০টি। বর্তমানে কর্মী রয়েছে ৫৫ হাজারের বেশি।

স্কয়ার গ্রুপের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভাবনীয় ভালোবাসা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা স্কয়ারকে এগিয়ে নিতে সাহস জোগাচ্ছে বলে মনে করেন স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক ও স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাড়িচালক থেকে শুরু করে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকেই এ প্রতিষ্ঠানকে নিজের মনে করেন।’ তিনি উল্লেখ করেন, সবার আস্থাই আমাদের শক্তি। এত বছরে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে সবার মাঝে যে আস্থা তৈরি হয়েছে, সামনের দিনগুলোতে যেন তা আরও সুদৃঢ় হয়—সেই চেষ্টা আমাদের অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন স্কয়ার বহুজাতিক কোম্পানি হবে। বিশ্বের মানুষ এটিকে বাংলাদেশি কোম্পানি হিসেবে চিনবে।’

স্কয়ারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান:

১. স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ২. স্কয়ার টেক্সটাইলস, ৩. স্কয়ার ফ্যাশনস, ৪. স্কয়ার ইয়ার্ন, ৫. স্কয়ার হেস্ককন,

৬. স্কয়ার হসপিটাল, ৭. স্কয়ার টয়লেট্রিজ, ৮. স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ৯. স্কয়ার সিকিউরিটিজ ম্যানেজমেন্ট,

১০. ফার্মা প্যাকেজেস, ১১. মিডিয়াকম, ১২. স্কয়ার এয়ার, ১৩. স্কয়ার ইনফরমেটিকস,৪. এজেস সার্ভিস, ১৫. স্কয়ার ফ্যাশন ইয়ার্ন, ১৬. মাছরাঙা কমিউনিকেশনস,

১৭. স্কয়ার অ্যাগ্রো ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্রসেসিং, ১৮. সাবাজপুর টি কোম্পানি, ১৯. স্কয়ার ডেনিম এবং

২০. স্কয়ার অ্যাপারেলস।

এছাড়া বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্কয়ার গ্রুপের অংশীদারিত্ব রয়েছে।

 

/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ
X