X
রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪
১ বৈশাখ ১৪৩১

‘পাট শিল্পকে বাঁচানোর উদ্যোগ নেই’

গোলাম মওলা
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:৩০আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:১৬

অনেকেই বলছেন পাটের স্বর্ণযুগ ফিরেছে। অথচ, সরকারি  সব পাটকল বন্ধ। বেসরকারিগুলোও ধুঁকছে। পাটশিল্পে জড়িতরা বলছেন, দিন যত যাচ্ছে এ শিল্প ততই সংকটে পড়ছে। পাট শিল্পের সমস্যা, পাটের উৎপাদন, বাজার নিয়ে সমস্যা ও সমাধান নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন-এর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান মো. জাহিদ মিয়া।

বাংলা ট্রিবিউন: এখন তো পাটের মৌসুম। কেমন চলছে পাট শিল্প?

মো. জাহিদ মিয়া: এক কথায় মহাসংকটে  আছে পাট। অনেকেই বলে থাকেন পাটের স্বর্ণযুগ ফিরছে। কিন্তু সরকারি সব পাটকল কিন্তু বন্ধ। বেসরকারি কলগুলোও চলছে ধুঁকে ধুঁকে।

বাংলা ট্রিবিউন:  সংকট মূলত কী কারণে?

মো. জাহিদ মিয়া: পাট আইন অমান্য করে যে কেউ পাট কিনে মাসের পর মাস গুদামজাত করছেন। কলগুলো পাট পাচ্ছে না। পাটজাত পণ্য রফতানির খরচও কয়েকগুণ বেড়েছে। পাটজাত পণ্য ব্যবহারের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাও মানা হচ্ছে না। পাটের চাকচিক্য বাড়ছে মনে হলেও বাস্তবে উদ্যোক্তারা আছেন মহাসংকটে।

নীতিমালায় বলা আছে, একজন লাইসেন্সধারী পাট ব্যবসায়ী সর্বোচ্চ এক হাজার মণ পাট গুদামজাত করতে পারবে। তাও সর্বোচ্চ একমাসের জন্য। কিন্তু এই নীতিমালার প্রয়োগ হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, অব্যবসায়ী ও লাইসেন্স নেই এমন লোকও পাট কিনে গুদামজাত করছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা ফায়দা লুটছে। তারা যদি শুনে এবার পাট উৎপাদন কম হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে মজুত করা শুরু করে।

বাংলা ট্রিবিউন: আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাবটা কেমন হবে?

মো. জাহিদ মিয়া: গতবার কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনে নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রতিমণ সাত হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।  এ কারণে কৃষকদের অনেকে এবার পাট বিক্রি করতে চাচ্ছেন না। তারাও সাত হাজার টাকার আশায় বসে আছেন। এখনই তিন হাজার টাকা মণ হয়েছে। পাট নিয়ে খেলা শুরু করেছে একটি গোষ্ঠী। ওরা বেশ চালাক। সংকট সৃষ্টি করতে তারা দেদার পাট কিনছে।

ওদের কারণে পাটকল মালিকরা গড়ে ৫০ শতাংশের বেশি পাট সংগ্রহ করতে পারছেন না। অর্থাৎ অধিকাংশ কারখানা তাদের সক্ষমতার অর্ধেক পাট-সুতা উৎপাদন করছে। এতে পাটজাত পণ্যের বাজার হারাতে বসেছি আমরা।

এদিকে, কার্পেট তৈরি হয় মূলত পাটের সুতা দিয়ে। পাটের সুতা না থাকায় বিকল্প হিসেবে তৈরি পোশাকের ঝুট সংগ্রহ করছে ক্রেতারা।

গতবছর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে বেশি দামে পাট কিনে বিপুল পরিমাণ লস করেছি। এবারও একই দশা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাহাজ কোম্পানিগুলো। তারা কন্টেইনারে পাটের সুতা নিতে আগ্রহী নয়। পাটের চেয়ে তৈরি পোশাক নিতে আগ্রহী তারা।

বাংলা ট্রিবিউন: পাটজাত পণ্য রফতানিতে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে?

মো. জাহিদ মিয়া: আগে বছরে এক টন সুতা রফতানিতে ৪০-৫০ ডলার খরচ হতো। এখন হচ্ছে ৩৫০ ডলার। শুধু কনটেইনার খরচই বেড়েছে ৩০০ ডলার। পরিস্থিতি এমন যে, আমরা সাড়ে ৩০০ ডলার দিতে চাইলেও শিপিং কোম্পানিগুলো পাটের সুতা নিতে চায় না। এমন ঘটনাও ঘটেছে, পাটের সুতা লোড হয়ে গেছে। কিন্তু তৈরি পোশাক চলে আসায় সুতা আনলোড করতে হয়েছে। এভাবে চললে এই শিল্প বিলীন হয়ে যাবে।

আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাটের সুতার চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু জাহাজ ভাড়ার কারণে চাহিদানুযায়ী পাঠাতে পারছি না।

এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি যে, বাংলাদেশের পাটের সুতা সবচেয়ে বেশি রফতানি হয় তুরস্কে । সারা পৃথিবীতে পাটের সুতা যে পরিমাণ রফতানি হয় তার ৪০ ভাগই যায় তুরস্কে।

স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পাট। স্বাধীনতার পরপর সত্যিকার অর্থে সোনালী আঁশ ছিল এটি। এটাই ছিল একমাত্র রফতানি পণ্য।

আগে পাটের মৌসুমে কৃষকরা ৫০ শতাংশ পাট বিক্রি করে দিতেন। এবার ব্যতিক্রম। পাটের পণ্য ব্যবহারে সরকারের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ প্রচার-প্রচারণা আছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।

১৯টি পণ্যে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও বাস্তবে শুধু চালের বস্তাটাই পাটের । বাকি ১৮টি পণ্য আগের মতোই আছে। পাট মন্ত্রণালয় আছে, পাট অধিদফতর আছে, কিন্তু পাট আইনের বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পাট শিল্পকে বাঁচানোর উদ্যোগও নেই।

বাংলা ট্রিবিউন: সমাধান কী হতে পারে?

মো. জাহিদ মিয়া: কৃষক পাটের দাম পাক, এটা আমরা চাই। কিন্তু অতি লোভের আশায় পাট ঘরে মজুত করা উচিৎ হবে না। বিশেষ করে মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা যেন পাট নিয়ে নয়-ছয় করতে না পারে সেটা দেখতে হবে। ইতোমধ্যে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এখন বেসরকারি পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে কৃষক পাট বিক্রি করবে কোথায়?

ভারত আমাদের দেশ থেকে কাঁচাপাট নেয়। কিন্তু পাটজাত পণ্য নেয় না। অথচ ভারতে আমাদের পাটজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা আছে।  আগে আমরা মোট পাটজাত পণ্যের ২০ শতাংশ ভারতেই রফতানি করতাম। শুল্ক আরোপের কারণে এটি কমে গেছে। কিন্তু ভারতে কাঁচা পাট রফতানিতে কোনও শুল্ক নেই। সরকার ভারতের সঙ্গে আলাপ করে বিষয়টির সুরাহা করতে পারে।

গতবার ভারতেও পাটের উৎপাদন কম হয়েছিল। কিন্তু তাতে ওই দেশের ব্যবসায়ীদের সমস্যায় পড়তে হয়নি। কারণ ওই দেশের জুট কমিশন সুন্দরভাবে সমস্যার সমাধান করেছিল। আমরাও সরকারকে বলেছি, শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে তেমন একটা কিছু করতে। শিল্প বেঁচে না থাকলেও কৃষকরাও পরে আর পাট  উৎপাদন করবে না।

গতবছর করোনার মধ্যে একমাত্র পাটের ব্যবসা  ছিল ভালো।  প্রবৃদ্ধি পজিটিভ ছিল। এখন ক্রমশ নিচের দিকে নামছে। এ শিল্পে নানাভাবে ৬০ লাখ মানুষ জড়িত। প্রত্যক্ষভাবে জড়িত শুধু শ্রমিকই আছে দুই-তিন লাখ।

গার্মেন্টস বলুন বা অন্য কোনও পণ্য, রফতানির আগে কাঁচামাল আমদানি করতে হয় আমাদের। কিন্তু একমাত্র পাটকলগুলোকে কোনও কাঁচামাল আমদানি করতে হয় না। পাটজাত পণ্য শতভাগ ভ্যালু যোগ করে। অর্থাৎ এক টাকার রফতানি হলেও সেটা রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে থেকে যায় । সেখানে এখন টিকে থাকতে আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারের দিকে তাকাতে হচ্ছে।

এদিকে, পাটের অধিকাংশ বীজ আসে ভারতের মহারাষ্ট্র থেকে। ৩৫  শতাংশ বীজ দেশে উৎপাদন হয়। ভারত থেকে যে বীজ আসছে সেটা থেকে গাছ অনেক লম্বা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ফাইবারের কোয়ালিটি খারাপ। এ কারণে আমাদের নিজস্ব একটি জাত থাকা উচিৎ।

এ ছাড়া, পাট চাষ আরও আধুনিক পদ্ধতিতে হওয়া দরকার। পাট পচানোর জন্য পানির সমস্যা দূর করতে হবে। পাট জাগ দেওয়ার জন্য জায়গাটাও আধুনিক হওয়া দরকার।

 

 /এফএ/
টাইমলাইন: পাট সম্পদ
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩:০০
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:৩০
‘পাট শিল্পকে বাঁচানোর উদ্যোগ নেই’
সম্পর্কিত
আইসিটির ‘ট্যাক্স হলিডে’ নিয়ে কাজ করতে হবে: নিয়াজ মোর্শেদ এলিট
ওয়ালটনের চিফ বিজনেস অফিসার মোস্তফা নাহিদ হোসেন‘দেশের টেলিভিশন বাজারের ৩০ শতাংশ ওয়ালটন টিভির দখলে’
যমুনা ইলেকট্রনিক্সের মার্কেটিং ডিরেক্টর সেলিম উল্যা সেলিম‘টিভি দেখার এক নতুন অভিজ্ঞতা এনে দিলো যমুনা টিভি’
সর্বশেষ খবর
‘অন্ধকার ভেদ করে আলো জ্বালার বার্তায়’ শেষ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা
‘অন্ধকার ভেদ করে আলো জ্বালার বার্তায়’ শেষ হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা
মুক্তির খবরে ২৩ নাবিকের পরিবারে স্বস্তি
মুক্তির খবরে ২৩ নাবিকের পরিবারে স্বস্তি
ঈদের চতুর্থ দিন: টিভি পর্দায় যা থাকছে
ঈদের চতুর্থ দিন: টিভি পর্দায় যা থাকছে
বিএনপি দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিশ্বস্ত ঠিকানা: কাদের
বিএনপি দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিশ্বস্ত ঠিকানা: কাদের
সর্বাধিক পঠিত
নৌযান আটকের পর ইরানকে ইসরায়েলের হুমকি
নৌযান আটকের পর ইরানকে ইসরায়েলের হুমকি
আজ পহেলা বৈশাখ
আজ পহেলা বৈশাখ
ইসরায়েলে ইরানি হামলার নিন্দা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর
ইসরায়েলে ইরানি হামলার নিন্দা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর
ভরা মৌসুমে অস্থির কেন পেঁয়াজের বাজার?
ভরা মৌসুমে অস্থির কেন পেঁয়াজের বাজার?
ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে ইরান: ইসরায়েলি সেনাবাহিনী
ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে ইরান: ইসরায়েলি সেনাবাহিনী