X
শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪
১ আষাঢ় ১৪৩১
অফশোর ব্যাংকিং

কোন জাদুতে খেলাপি ঋণ ‘শূন্যে’ নামলো

গোলাম মওলা
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২২:০০আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ২২:২৯

বিদেশি উৎস থেকে আমানত সংগ্রহ করে বিদেশি কোম্পানিকেই ঋণ দেওয়ার জন্য গড়ে তোলা ‘অফশোর ব্যাংকিং’নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে। ডলার-সংকটে যখন ব্যাংকগুলোর অফশোর ইউনিটের ব্যবসা স্থবির, তখনও ঋণ বিতরণে বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত দুই বছরে এই খাতে বেশ কিছু ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়লেও ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ নেমেছে শূন্যে। অফশোর ইউনিটের ঋণ বিতরণে বড় প্রবৃদ্ধির অন্তত ১২টি ব্যাংকের কোনও খেলাপি ঋণ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের (২০২৩) সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক ১৭ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা বিতরণ করলেও ব্যাংকটির একটি টাকাও খেলাপি হয়নি। একইভাবে অগ্রণী ব্যাংক বিতরণ করেছে ৮২৩ কোটি টাকা, এর মধ্যে কোনও টাকা খেলাপি হয়নি।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউন বলেন, ‘অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কোনও প্রজেক্টে ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে। এই ধরনের ঋণের মেয়াদ থাকে বেশি। এছাড়া গ্রেস পিরিয়ড পায় অনেক বেশি। ফলে ঋণ বিতরণ বাড়লেও নির্ধারিত সময় খেলাপি হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি। এসব উদ্যোক্তা বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ করে যাচ্ছেন। যে কারণে খেলাপি হচ্ছে না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংকের এমডি বলেছেন, যারা অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে ঋণ নিয়েছেন— তাদের সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক অনেক ভালো। এ কারণে কোনও কোনও ব্যাংক ইচ্ছে করেই খেলাপি দেখায়নি। বিশেষ করে ব্যাংক ও গ্রাহক— দুই পক্ষই এই ঋণ নিয়মিত রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকায় খেলাপি হয়নি। এই ঋণ দীর্ঘ মেয়াদি হওয়ায় কিছু কিছু ব্যাংক খেলাপি করতে পারেনি। এছাড়া অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের বিতরণ করা ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণেও এই ঋণগুলো খেলাপি হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন সাধারণত ব্যাংকের মালিক উদ্যোক্তারা। তারা ফেরত না দিলেও এই ঋণকে ব্যাংকগুলো খেলাপি দেখায় না। এর একটি অন্যতম কারণ, মন্দ হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংক ইচ্ছে করেই কাগজে-কলমে ভালো দেখানোর চেষ্টা করেছে। দ্বিতীয়ত, কিছু গ্রাহক সত্যি সত্যি সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেছেন। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি কোনও প্রজেক্টে ঋণ দেওয়ার কারণে কোনও কোনও ব্যাংকের ঋণ এখনও খেলাপির আওতায় আসেনি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শূন্য খেলাপিতে থাকা প্রাইম ব্যাংক বিতরণ করেছে ৫ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক বিতরণ করেছে ৩ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক বিতরণ করেছে ৩ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। এই তিনটি ব্যাংকের অফশোর ইউনিট খেলাপিমুক্ত। বেসরকারি ব্যাংক এশিয়ার অফশোর ইউনিট বিতরণ করেছে ২ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। অথচ ব্যংকটি খেলাপি ঋণ শূন্য। একইভাবে বেসরকারি আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এক হাজার ২৫৬ কোটি টাকা বিতরণ করলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ শূন্য। শূন্য খেলাপির ডাচ বাংলা ব্যাংক বিতরণ করেছে ২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট বিতরণ করেছে ১ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা, কিন্তু খেলাপি শূন্য। একইভাবে শূন্য খেলাপির সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক বিতরণ করেছে ১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, সাউথ ইস্ট ব্যাংক বিতরণ করেছে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকটির খেলাপির পরিমাণ শূন্য। বিদেশি খাতের সিটি ব্যাংক এনএ বিতরণ করেছে ১ হাজার ৭৩ কোটি টাকা। এই ব্যাংকটিরও খেলাপি শূন্য।

এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ( ব্যবস্থাপনা পরিচালক ) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খেলাপি শূন্য হওয়ার কারণ হলো— অফশোর  ইউনিটের সম্পদের সিংহভাগ স্বল্পমেয়াদি ক্রেডিট ফর্মে রয়েছে। আবার এখান থেকে আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ (বায়ার্স ক্রেডিট) নিয়েছেন। তাই  মেয়াদপূর্তির সময়ে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ বা ব্যাংক অফশোর স্বল্পমেয়াদি ক্রেডিট পরিশোধের জন্য বেশিরভাগ সময় বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা করে রাখে। যে কারণে বেশিরভাগ ব্যাংকের এ ধরনের ঋণে খেলাপি শূন্য।’

অবশ্য ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে অফশোর ইউনিটগুলোর মোট ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। এই ইউনিটের খেলাপি ঋণ বেড়ে ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকায় উঠেছে, যা মোট ঋণের ২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। যদিও ২০২১ সালের জুনে ব্যাংকগুলোর অফশোর ইউনিটের দেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৩ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। তখন খেলাপি ছিল মাত্র ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১ শতাংশের কিছুটা বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের অফশোর ইউনিটের ঋণ ছিল ৩ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এই ব্যাংকটির খেলাপি এখন ১৩৬ কোটি টাকা। এছাড়া ৪ হাজার ২০৭ কোটি টাকা বিতরণ করা ইস্টার্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখন ২০৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিতরণ করা ১ হাজার ৫১ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৭৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিদেশি খাতের এইচএসবিসি ব্যাংকের বিতরণ করা ১১ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৪২১ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বিতরণ করা ৭ হাজার ৯৫ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। ঢাকা ব্যাংকের বিতরণ করা ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১৫৮ কোটি টাকা। এবি ব্যাংকের অফশোর ঋণের ৬৮ শতাংশই এখন খেলাপি। এটির অফশোর ইউনিটের ঋণ ৭৭৭ কোটি টাকা, আর খেলাপির পরিমাণ ৫৩৫ কোটি টাকা। বিদেশি খাতের উরি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৬ কোটি টাকা ।

প্রসঙ্গত, অফশোর ইউনিটের আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ দুটোই হয়ে থাকে বৈদেশিক মুদ্রায়। ঋণের সুদ কম হওয়ায় ও ডলার সরবরাহ ভালো থাকায় দুই-তিন বছর আগে দেশে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে ব্যবসায়ে নজর বাড়িয়েছিল ব্যাংকগুলো। তখন এ নিয়ে তেমন কোনও আইনকানুন ছিল না। মূল ব্যাংকের দেওয়া অর্থেই পরিচালিত হতো অফশোর ইউনিটগুলো।

বর্তমানে ডলার-সংকটের মধ্যে অফশোর ইউনিটের মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠায় সম্প্রতি কড়াকড়ি আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ডিসেম্বরে এ নিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর অফশোর ইউনিট আগের মতো নিজস্ব উৎস থেকে ফান্ড সুবিধা পাবে না। আগে ব্যাংকগুলোর তার অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে রেগুলেটরি মূলধনের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফান্ড স্থানান্তরের সুযোগ ছিল। এদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলো যাতে অফশোর ইউনিটে তাদের তহবিল রাখে, এ জন্য সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি এসব বিনিয়োগের ওপর কর উঠিয়ে নেওয়ারও পরিকল্পনা করছে সরকার। ফলে অফশোর ইউনিটের এক বছর পর্যন্ত ঋণে সুদহার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। আর আমানতের সুদহার বেড়ে হয়েছে ৭ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত।

অফশোর ব্যাংকিং কী

অফশোর ব্যাংকিং হলো— ব্যাংকের অভ্যন্তরে পৃথক এক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এখানে বৈদেশিক মুদ্রায় হিসাব হয়। বাংলাদেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর কোনও নিয়ম-নীতিমালা অফশোর ব্যাংকিংয়ে প্রয়োগ হয় না। শুধু মুনাফা ও লোকসানের হিসাব যোগ হয়। দেশে ১৯৮৫ সালে অফশোর ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন দেওয়া হলেও এ সংক্রান্ত নীতিমালা জারি হয় ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। এখন দেশের ৩৯টি ব্যাংক অফশোর ইউনিটের মাধ্যমে এই ব্যবসা করছে।

/ইউএস/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বাড়লো বাংলাদেশিদের
আবারও ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা
তিন মাসে খেলাপি ঋণ বাড়লো আরও ৩৬ হাজার কোটি টাকা
সর্বশেষ খবর
আমরা আক্রান্ত হলে ছেড়ে দেবো না: সেন্টমার্টিন নিয়ে ওবায়দুল কাদের
আমরা আক্রান্ত হলে ছেড়ে দেবো না: সেন্টমার্টিন নিয়ে ওবায়দুল কাদের
তীব্র গরমে আরাফাত ময়দানে জড়ো হচ্ছেন ১৫ লক্ষাধিক হাজি
তীব্র গরমে আরাফাত ময়দানে জড়ো হচ্ছেন ১৫ লক্ষাধিক হাজি
বেনাপোলে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনে ভোগান্তি
বেনাপোলে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনে ভোগান্তি
কমলাপুরে টিকিট পেতে দীর্ঘ লাইন
কমলাপুরে টিকিট পেতে দীর্ঘ লাইন
সর্বাধিক পঠিত
অবশেষে বদলি হলেন সাতক্ষীরা পৌরসভার সেই সিইও
অবশেষে বদলি হলেন সাতক্ষীরা পৌরসভার সেই সিইও
সেন্টমার্টিনে খাদ্যসংকট, কক্সবাজার থেকে গেলো পণ্যবোঝাই জাহাজ
সেন্টমার্টিনে খাদ্যসংকট, কক্সবাজার থেকে গেলো পণ্যবোঝাই জাহাজ
যানজট এড়াতে ঘুরতে হচ্ছে ২৯ কিলোমিটার সড়ক
যানজট এড়াতে ঘুরতে হচ্ছে ২৯ কিলোমিটার সড়ক
রুশ সম্পদ ‘চুরি’র পরিণতি পশ্চিমাদের ভুগতে হবে, হুঁশিয়ারি পুতিনের
রুশ সম্পদ ‘চুরি’র পরিণতি পশ্চিমাদের ভুগতে হবে, হুঁশিয়ারি পুতিনের
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ‘পিঁপড়ার গতিতে’ চলছে গাড়ি
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ‘পিঁপড়ার গতিতে’ চলছে গাড়ি