আইএমএফের ঋণ পাওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ

গোলাম মওলা
২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়া এখন কেবল অর্থের জোগান নয়— বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, জ্বালানি সংকট, বাজেট ঘাটতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে এই ঋণ কর্মসূচি সচল রাখা নীতিনির্ধারকদের জন্য অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও বাজেট সহায়তার জন্য আইএমএফসহ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে একটি বড় আকারের ঋণ প্যাকেজ পাওয়ার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই প্যাকেজের আকার ৩০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।

ঋণের পথ মসৃণ করতে জ্বালানির দাম সমন্বয়

আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমিল ও বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপের মুখে সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু অভ্যন্তরীণ চাপ সামাল দেওয়ার জন্য নয়— বরং আইএমএফের ঋণ প্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, অতিরিক্ত ভর্তুকি বাজেট ঘাটতি বাড়ায় এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে। সেই বিবেচনায় জ্বালানির দাম সমন্বয়কে একটি কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বহুমাত্রিক চাপে অর্থনীতি

বাংলাদেশ বর্তমানে একাধিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে—বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং বাড়তে থাকা ব্যয়। এসব কারণে অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের ঋণ শুধু অর্থের উৎস নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত আস্থার সংকেত। অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের কিস্তি আটকে গেলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নও ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে বৈদেশিক লেনদেন, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

ভর্তুকির চাপ কমাতে বাধ্য সরকার

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করতে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে আসছিল সরকার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা—বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ভর্তুকির চাপ বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।

রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে না বাড়া এবং ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে যায়। ফলে ভর্তুকি কমাতে জ্বালানির দাম সমন্বয় ছিল প্রায় অনিবার্য।

ঋণ ছাড়ের শর্ত পূরণে বার্তা

বর্তমানে আইএমএফের একটি বড় কিস্তি ঝুলে আছে। সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ভর্তুকি কমানোসহ কাঠামোগত সংস্কারে অগ্রগতি না হলে ঋণ ছাড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম সমন্বয়কে অর্থনীতিবিদরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে সরকার আইএমএফকে দেখাতে চেয়েছে যে, কঠিন হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে তারা প্রস্তুত।

বাড়ছে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের ওপর, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই ধাক্কা সামাল দিতে অন্তত স্বল্পমেয়াদে একটি জরুরি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রয়োজন— যেখানে খাদ্য সহায়তা ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।

সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা

বিশ্লেষকদের মতে, ভর্তুকি দিয়ে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় আগেই বেড়ে গিয়েছিল, যা পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

এখন জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা। তা না হলে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।

আস্থার প্রতীক হিসেবে আইএমএফ

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আইএমএফকে একটি ‘সিগন্যালিং ইনস্টিটিউশন”’ হিসেবে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, কোনও দেশের অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কারে আইএমএফ সন্তুষ্ট থাকলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাও সেই দেশের প্রতি আস্থা পায়।

ফলে আইএমএফ কর্মসূচি সচল থাকলে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা বা আইএফসির মতো সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও সহজে অর্থায়ন পাওয়া যায়। বিপরীতে, এই সম্পর্ক দুর্বল হলে বহুপাক্ষিক সহায়তার প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বৈদেশিক মুদ্রার চাপ মোকাবিলা

বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে রয়েছে, একইসঙ্গে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আইএমএফের ঋণ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়াতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া এই ঋণ বাজেট সহায়তা হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে, যা সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি আনে— বিশেষ করে বড় আমদানি ব্যয় বা ঋণ পরিশোধের সময়।

সংস্কার বাস্তবায়নের চাপ

আইএমএফের ঋণের সঙ্গে যুক্ত শর্তগুলো স্বল্পমেয়াদে কঠিন হলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশকে ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভ্যাট কাঠামো সরলীকরণ এবং বিনিময় হার ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে বলা হয়েছে।

তবে বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর। রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, ভ্যাট কাঠামো এখনো জটিল, এবং ব্যাংক খাতের সংস্কারও অসম্পূর্ণ। ফলে পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কিস্তি ছাড়ের অনিশ্চয়তা

বর্তমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। বাকি ১৮৬ কোটি ডলারের মধ্যে ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার এখনও ছাড় হয়নি।

আইএমএফের পর্যালোচনা মিশন মে মাসে ঢাকায় আসতে পারে। ফলে জুনের বোর্ড সভায় কিস্তি ছাড়ের সম্ভাবনা কমে গেছে। সরকার এখন জুলাইয়ের বোর্ড সভায় অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে।

সরকারের অবস্থান

সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দাবি, আইএমএফ বৈঠকের আগেই দেশে তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকির মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হলেও এতে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর বড় চাপ তৈরি হচ্ছিল। সেই চাপ সামাল দিতেই সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।’’ আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এই বৃদ্ধি এখনও সহনীয় বলেও দাবি করেন তিনি।

এখন কেন গুরুত্বপূর্ণ

বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে আইএমএফের ঋণ বাংলাদেশের জন্য তিনটি কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ— এটি সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়, অন্যান্য দাতার কাছ থেকে অর্থায়নের পথ সহজ করে এবং অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে নীতিগত চাপ সৃষ্টি করে।

সব মিলিয়ে, আইএমএফের ঋণ এখন বাংলাদেশের জন্য কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়— এটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

একদিকে এই ঋণ নিশ্চিত করা, অপরদিকে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
শিক্ষার খরচ বাড়ছে, ঝুঁকিতে নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা
শ্রমিকদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, সতর্ক থাকতে হবে: তাসলিমা আখতার
তীব্র গরমে অর্থনীতির ক্ষতি ১৭৫০ কোটি ডলার: প্রতিবেদন
সর্বশেষ খবর
লন্ডনে সাবেক গণিত শিক্ষকের ১০ বছরের কারাদণ্ড
লন্ডনে সাবেক গণিত শিক্ষকের ১০ বছরের কারাদণ্ড
ধর্মীয় পরিচয় কোনও বিভাজনের কারণ হতে পারে না: ডেপুটি স্পিকার
ধর্মীয় পরিচয় কোনও বিভাজনের কারণ হতে পারে না: ডেপুটি স্পিকার
আবারও কালিতে ঢেকে দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি, পাশেই লাগিয়েছে প্রচারপত্র
আবারও কালিতে ঢেকে দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতি, পাশেই লাগিয়েছে প্রচারপত্র
হোটেলের বেসিনে গুদামের সাইনবোর্ড লাগিয়ে সার ডিলার হলেন কৃষকদল নেতা
হোটেলের বেসিনে গুদামের সাইনবোর্ড লাগিয়ে সার ডিলার হলেন কৃষকদল নেতা
সর্বাধিক পঠিত
সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় সংসার চলে যাদের, তাদের জন্য সুখবর নাকি দুঃসংবাদ?
সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় সংসার চলে যাদের, তাদের জন্য সুখবর নাকি দুঃসংবাদ?
প্রথমদিন সেন্টমার্টিনে ৮৩৭ পর্যটক, যেতে খরচ লাগে কত
প্রথমদিন সেন্টমার্টিনে ৮৩৭ পর্যটক, যেতে খরচ লাগে কত
গাজীপুর সাফারি পার্কে জন্ম নিয়েছে নীলগাইয়ের চার শাবক
গাজীপুর সাফারি পার্কে জন্ম নিয়েছে নীলগাইয়ের চার শাবক
প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহকর্মী, একসঙ্গে কয়টি সিনেমা করেছেন মৌসুমী-শাবনূর
প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহকর্মী, একসঙ্গে কয়টি সিনেমা করেছেন মৌসুমী-শাবনূর
কেন ভারতের এই গ্রামটিকে বলা হয় ‘মিলিয়নিয়ার ভিলেজ’
কেন ভারতের এই গ্রামটিকে বলা হয় ‘মিলিয়নিয়ার ভিলেজ’