সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করার পর সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসীন আলী।
ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়াসীন আলী গত সোমবার (১০ আগস্ট) দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগটি করেন। তার অভিযোগ, সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক থাকা অবস্থায় এবং এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেডের ঋণসীমা ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। পরে ওই অর্থ যোগসাজশের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগ দায়েরের পরদিনই ইয়াসীন আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আলোচনা বা অনুমোদন ছাড়াই তিনি সরাসরি দুদকে অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, “ব্যাংকের কোনও কর্মকর্তা সরাসরি দুদকে অভিযোগ করার বিধান নেই। কোনও মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নিতে হলে আদালতের মাধ্যমে করতে হয়।”
তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যের সঙ্গে হাতে আসা কিছু নথির অসঙ্গতি রয়েছে। নথি অনুযায়ী, গত ২৬ জুলাই সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড, এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্যালাক্সি সোয়েটার এবং সংশ্লিষ্ট অনিয়মের বিষয়ে দুদকে অভিযোগ দায়েরের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয় ইয়াসীন আলীকে। পরদিন ২৭ জুলাই শাখা ব্যবস্থাপক আব্দুল কাদের সরদারের সই করা চিঠিতে তাকে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতাও দেওয়া হয়।
অর্থাৎ অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাংকের বক্তব্য এবং নথিতে থাকা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
দুদকে দেওয়া অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম, ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনিরুল মওলাসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতিতে অভিযুক্ত অ্যাননটেক্স গ্রুপের মালিকানাধীন সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেডের ঋণসীমা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। পরে ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
ইয়াসীন আলীর অভিযোগ অনুযায়ী, ঋণসীমা বাড়ানো এবং অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়ার সঙ্গে তৎকালীন ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. সাহাবুদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনিরুল মওলাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জড়িত ছিলেন।
তবে দুদকে করা অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দুদকের অনুসন্ধান ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত বিষয় হবে।
গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ব্যবস্থা
ইয়াসীন আলী দুদকে অভিযোগ করার পর সোমবার ও মঙ্গলবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হয়। এরপরই তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন বলেন, “ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমতি ছাড়া ওই কর্মকর্তা নিজ উদ্যোগে দুদকে অভিযোগ করেছিলেন। একারণেই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে ২৬ ও ২৭ জুলাইয়ের নথিতে অভিযোগসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদনের তথ্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তদন্তে এখন মূলত স্পষ্ট হওয়ার বিষয় হলো ইয়াসীন আলীকে দুদকে অভিযোগ করার জন্য কী ধরনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং সেই অনুমোদনের সীমা কতটুকু ছিল।
ইয়াসীন আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, সাইফুল আলম ও অভিযোগে নাম আসা অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এদিকে অভিযোগের পর একজন ব্যাংক কর্মকর্তার সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন ও অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে ইসলামী ব্যাংকের অভিযোগ 







