বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সহজ করতে চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রানং বন্দরের মধ্যে সরাসরি শিপিং রুট চালু করতে উদ্যোগ নিয়েছে থাইল্যান্ড। নতুন এই রুট চালু হলে বর্তমানে প্রায় দুই সপ্তাহের ট্রানজিট সময় কমে তিন থেকে পাঁচ দিনে নেমে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত থিতিপর্ন চিরাসাওয়াদি।
রবিবার (১৬ আগস্ট) বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন কার্যালয় পরিদর্শনে এসে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার সময় রাষ্ট্রদূত এসব কথা বলেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে পণ্য পরিবহনে সিঙ্গাপুর হয়ে মালাক্কা প্রণালী ব্যবহার করতে হয়। এতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে। প্রস্তাবিত নতুন রুটটি থাইল্যান্ডের আন্দামান উপকূলের রানং বন্দরকে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করবে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে তুলনামূলক কম দূরত্বের একটি বিকল্প সামুদ্রিক রুট চালুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, কয়েকটি থাই কোম্পানি প্রস্তাবিত রুটে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। জরিপে রুটটি বাস্তবায়নযোগ্য হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এপ্রিলেই উদ্যোগটি শুরুর পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং চলমান সংঘাতের কারণে তা পিছিয়ে যায়। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে রুটটি চালু করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এফটিএ আলোচনাও এগিয়ে নিতে চায় থাইল্যান্ড
বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগ্রহের কথাও জানান থাই রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দুই দেশ এফটিএ নিয়ে কনসেন্ট লেটার বিনিময় করলেও পরবর্তী সময়ে আলোচনা ধীর হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি প্রাথমিক আলোচনা দ্রুত শুরু করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
দুই দেশের বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এতে বাংলাদেশের বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪ সালে থাইল্যান্ড বাংলাদেশে প্রায় ১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করলেও বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ৮৪ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।
রাষ্ট্রদূত বলেন, থাইল্যান্ডে বাংলাদেশি পণ্যের রফতানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কোন কোন পণ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে রফতানি বাড়ানো যায়, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ-চিয়াং মাই সরাসরি বিমান যোগাযোগের ভাবনা
বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই পর্যন্ত সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন বলে জানান রাষ্ট্রদূত।
আলোচনায় দুই দেশের পর্যটন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের যোগাযোগ নিয়েও কথা হয়। বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে থাইল্যান্ডের জনপ্রিয়তার বিষয়টিও উঠে আসে।
প্রতিদিন ৮০০ ভিসা আবেদন
থাই দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০০টি ভিসা আবেদন জমা পড়ে। ঈদের আগে এই সংখ্যা দৈনিক ২ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
সম্পূর্ণ ও সঠিক কাগজপত্রসহ আবেদন করলে সাধারণত সাত কার্যদিবসের মধ্যে ভিসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। তবে ভুয়া বা অসম্পূর্ণ নথি জমা দেওয়ার কারণে ভিসা প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
তারা বলেন, প্রতিদিনের আবেদনের একটি বড় অংশে ভুয়া নথি পাওয়া যাচ্ছে। অসম্পূর্ণ ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও আর্থিক কাগজপত্রও যাচাই প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলছে।
কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে থাই ভিসা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিভিন্ন এজেন্সির বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছে দূতাবাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে আবেদনকারীদের সতর্ক করা হচ্ছে।
মিয়ানমার নিয়ে থাইল্যান্ডের ‘পুনঃসম্পৃক্ততার’ প্রস্তাব
আলোচনায় মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও এর প্রভাবও উঠে আসে। রাষ্ট্রদূত বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে মিয়ানমারের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন।
মিয়ানমারকে আসিয়ান সংলাপে ফিরিয়ে আনতে থাইল্যান্ড ‘ক্যালিব্রেটেড রি-এনগেজমেন্ট’ বা ধাপে ধাপে পুনঃসম্পৃক্ততার পদ্ধতির প্রস্তাব দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়।
ঢাকার নৌপথ উন্নয়নে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আগ্রহ
ব্যাংককের খাল ও নগর নৌপথ ব্যবস্থাপনায় থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা ঢাকার সঙ্গে বিনিময়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ঢাকার খাল পুনরুদ্ধার এবং বৃত্তাকার নৌপথ উন্নয়নে থাই বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
রাষ্ট্রদূত বলেন, এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমের মধ্যে সহযোগিতা এবং সাংবাদিকদের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। সফরকালে থাই দূতাবাসের প্রতিনিধিরা বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের নিউজরুম পরিদর্শন করেন। আলোচনায় দুই প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক ও থাই দূতাবাসের কর্মকর্তারা অংশ নেন।









