এবার ফেঁসে যাচ্ছেন কোটি টাকার গাড়ির মালিকরা  

গোলাম মওলা
০৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০:০৮ আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০:০৮

দেশে উচ্চমূল্যের বা বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের আয়কর রিটার্ন দাখিল ও সম্পদের তথ্য যাচাইয়ে নজরদারি বাড়াচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) গাড়ির মালিকানার তথ্যের সঙ্গে আয়কর নথি মিলিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তাদের।

এনবিআরের তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৫ হাজার ৪৮৯টি উচ্চমূল্যের বা বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭১৯টি গাড়ির তথ্য মালিকদের আয়কর নথিতে ঘোষণা করা হয়েছে। বিপরীতে ১ হাজার ৩৩৯টির বেশি গাড়ির তথ্য আয়কর নথিতে অপ্রদর্শিত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও বিআরটিএর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব গাড়ির মালিক নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন কিনা, গাড়ি কেনার অর্থের উৎস কী এবং তাদের ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে গাড়ির মূল্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা— এখনএসব বিষয় যাচাই করা হবে।

সম্প্রতি কর কমিশনারদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এ নির্দেশনা দেন। একই বৈঠকে কর ফাঁকি শনাক্তে কর অঞ্চলের অনুসন্ধান ও তদন্ত দলকে আরও সক্রিয় করা, উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং সঞ্চয়পত্রধারীদের রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়।

গাড়ির তথ্য মিলিয়ে দেখবে কর অঞ্চল

এনবিআর সূত্র জানায়, প্রতিটি কর অঞ্চলের অনুসন্ধান ও তদন্ত দল নিজ নিজ এলাকার উচ্চমূল্যের গাড়ির মালিকদের তথ্য যাচাই করবে। বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর নথি মিলিয়ে দেখা হবে।

যারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না, তাদের শনাক্ত করার পাশাপাশি রিটার্নে গাড়ির তথ্য ঘোষণা করা হয়েছে কিনা, সেটিও দেখা হবে। একইসঙ্গে গাড়ির মূল্য ও মালিকের ঘোষিত আয়-সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হবে।

কর কর্মকর্তাদের মতে, কোনও ব্যক্তির কাছে কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি থাকার পরও আয়কর নথিতে সেই সম্পদের তথ্য না থাকলে বিষয়টি আরও যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গাড়িটি কেনার অর্থের উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয় এবং সম্পদের বিবরণ পর্যালোচনা করা হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে বিআরটিএর তথ্যকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখছে এনবিআর। কারণ গাড়ির নিবন্ধনের তথ্যের মাধ্যমে মালিকের পরিচয় ও গাড়ির মালিকানা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্য আয়কর নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে রিটার্ন দাখিল না করা বা সম্পদের তথ্য অপ্রদর্শিত রাখার বিষয়টি শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

কোটি টাকা দামের গাড়ি

এনবিআর কর্মকর্তাদের প্রাথমিক হিসাবে, এসব উচ্চমূল্যের গাড়ির অনেকগুলোর বাজারমূল্য এক কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা বা তারও বেশি। গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষমতা ও সিসির ওপর ভিত্তি করে এসব গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-করও তুলনামূলকভাবে বেশি।

দেশে চলাচলকারী উচ্চমূল্যের গাড়ির মধ্যে রয়েছে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, অডি, ল্যান্ড রোভার, রেঞ্জ রোভার, পোর্শে, জাগুয়ার, লেক্সাস, ক্যাডিলাক, মাসেরাতি ও রোলস রয়েস। সীমিত সংখ্যায় ফেরারি, ল্যাম্বরগিনি ও টেসলার মতো গাড়িও রয়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, গাড়ির উচ্চমূল্য নিজে কর ফাঁকির প্রমাণ নয়। তবে কোনও ব্যক্তির ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে গাড়ির মূল্যের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে বিষয়টি যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে গাড়ি কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে এবং সেই অর্থের উৎস আয়কর নথিতে যথাযথভাবে দেখানো হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করা সম্ভব।

গতবছরও রিটার্নে ৪০৯ মালিকের গাড়ির তথ্য ছিল না

এর আগে গত বছর সিআইসির অনুসন্ধানে এমন ৪০৯ জন গাড়ির মালিকের তথ্য পাওয়া যায়, যারা বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিলাসবহুল গাড়ি কিনে ব্যবহার করছিলেন এবং বিআরটিএ থেকে গাড়ির নিবন্ধনও নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের তথ্য পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, তাদের গাড়ির মালিকানা থাকলেও আয়কর নথির আওতায় থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। ওই অনুসন্ধানের পর বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের তথ্যের সঙ্গে আয়কর নথি সমন্বয়ের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।

বর্তমান অনুসন্ধানে কর নথিতে ঘোষণা করা হয়নি—এমন ১ হাজার ৩৩৯টির বেশি গাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গাড়ির মালিকদের মধ্যে কারা নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করছেন, কারা রিটার্ন দাখিল করছেন না এবং কারও ঘোষিত আয়-সম্পদের সঙ্গে গাড়ির মূল্যের অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করবে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল।

শুধু গাড়ি নয়, নজরদারি অন্য ক্ষেত্রেও

আয়কর রিটার্নের আওতা বাড়াতে শুধু বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের ওপরই নয়, আরও কয়েকটি ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর।

এর মধ্যে রয়েছে উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকি এবং সঞ্চয়পত্রধারীদের রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করা। পাশাপাশি কর অঞ্চলের অনুসন্ধান ও তদন্ত দলকে সক্রিয় করে কর ফাঁকির সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যের সঙ্গে আয়কর নথির তথ্য সমন্বয় করা গেলে করযোগ্য ব্যক্তি শনাক্ত করা সহজ হবে। বিশেষ করে গাড়ি, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যের সঙ্গে আয়কর রিটার্নের তথ্য মিলিয়ে দেখলে আয় ও সম্পদের অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

এনবিআরের সাবেক সদস্য (কর নীতি) সৈয়দ আমিনুল করিম বলেন, বিভিন্ন উৎসের তথ্য একসঙ্গে যাচাই করা হলে রিটার্ন দাখিল না করা করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে আয় ও সম্পদের অসামঞ্জস্য এবং কর ফাঁকির ঘটনাও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে বিএমডব্লিউ জব্দ

এদিকে উচ্চমূল্যের গাড়িকে ঘিরে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে সম্প্রতি চট্টগ্রামে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।

গত ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকার সাত্তার মঞ্জিল থেকে গাড়িটি জব্দ করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযোগ, উচ্চহারের শুল্ক এড়াতে আস্ত গাড়িটিকে তিন থেকে চারটি বড় অংশে কেটে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দেশে আনা হয়েছিল। পরে অংশগুলো জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপ দেওয়া হয়।

সিআইআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রো-ঘ-১১-৩৬৫১ নম্বরের গাড়িটি শনাক্ত করা হয়। কর্মকর্তারা গাড়িটির ক্রয় ও আমদানি-সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাইলে বর্তমান মালিক দেশের বাইরে থাকায় তার স্ত্রী প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেননি।

এ ছাড়া গাড়িটির চাবি চাওয়া হলেও তা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয় বলে জানিয়েছে সিআইআইডি। পরে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না পাওয়া এবং চাবি না দেওয়ায় গাড়িটি জব্দ করা হয়।

শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গাড়িটি মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা হয়েছিল কিনা, কীভাবে দেশে আনা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে কত টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, বিআরটিএর গাড়ির তথ্যের সঙ্গে আয়কর নথি নিয়মিত সমন্বয় করা হলে শুধু রিটার্ন দাখিলের আওতা বাড়ানো নয়, সম্ভাব্য কর ফাঁকি ও আয়-সম্পদের অসামঞ্জস্যও শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এজন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই ও অনুসন্ধান আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সুতা আমদানির নিয়ম বদল: নতুন জটিলতায় পোশাক কারখানার মালিকরা 
এবার সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ফু-ওয়াং ক্লাবে এনবিআরের অভিযান
ভারতের যে সৈকতে গাড়ি নিয়ে ঢোকা যায়
সর্বশেষ খবর
সংবিধান সংশোধনে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বীকৃতির দাবি
সংবিধান সংশোধনে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বীকৃতির দাবি
নাইট ক্লাব কাণ্ডে ক্রীড়া ভাতা হারাতে পারেন সাদ-সোহেল!
নাইট ক্লাব কাণ্ডে ক্রীড়া ভাতা হারাতে পারেন সাদ-সোহেল!
প্রেমিকাকে নিয়ে মোমো খেতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে ধরা পড়লেন স্বামী, তারপর যা ঘটলো
প্রেমিকাকে নিয়ে মোমো খেতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে ধরা পড়লেন স্বামী, তারপর যা ঘটলো
১০১ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার
১০১ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার
সর্বাধিক পঠিত
রূপপুরের বিদ্যুৎ এলে কতটা কমবে লোডশেডিং?
রূপপুরের বিদ্যুৎ এলে কতটা কমবে লোডশেডিং?
অসুস্থতায় ৯ মাস শুটিংয়ে নেই, এবার ফিরতে চান তানিয়া বৃষ্টি
অসুস্থতায় ৯ মাস শুটিংয়ে নেই, এবার ফিরতে চান তানিয়া বৃষ্টি
সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপি নেত্রী
সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপি নেত্রী
সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী অভিযান
সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী অভিযান
পাকিস্তানের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘উদ্বেগের’: ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রধান
পাকিস্তানের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘উদ্বেগের’: ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রধান