আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম প্রায় ৩০ টাকা বেশি নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসি লিটার প্রতি ৮১ টাকা দাম করার প্রস্তাব দিলেও এর প্রধান ক্রেতা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, বর্তমান বাজারদরে এই দাম ৫০ দশমিক ৮২ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কার্যালয়ে ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণে আয়োজিত প্রথমবারের মতো গণশুনানিতে এসব মতামত উঠে আসে।
বিপিসি ও পিডিবির যুক্তিতর্ক
গণশুনানিতে বিপিসি’র জেনারেল ম্যানেজার এটিএম সেলিম বলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে যখন দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয় তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ৪৭৮ দশমিক ৪৫ ডলার— দামের সূচক ছিল কমতির দিকে। ডিসেম্বর মাসে পাওয়া গেছে ৩৪০ দশমিক ৯৪ ডলারে। তখন ৮৫ টাকা প্রস্তাব করলেও ডিউটি এবং অন্যান্য খরচসহ লিটার প্রতি ৮১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিপিডিবির পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বিপিসির তথ্যের বিরোধিতা করে বলেন, “আমরা বিপিসির কাছ থেকে তেল কিনে বিপুল লোকসান দিচ্ছি, আর আমাদের কাছে তেল বিক্রি করেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা লাভ করেছে।” তিনি আরও জানান, যেখানে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ৫৭ টাকায় তেল আমদানি করছে, সেখানে বিপিসি আমাদের কাছ থেকে নিচ্ছে ৮৬ টাকা। এতে ইউনিট প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে ১৮ দশমিক ৪১ টাকা হচ্ছে, যা পাইকারি বিক্রয়মূল্যের (৬ দশমিক ৯৯ টাকা) কয়েকগুণ।
বিপিডিবি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, “ফার্নেস অয়েলের কারণেই বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাম সমন্বয় এবং জনগণকে স্বস্তি দেওয়া উচিত।” তিনি বিপিসির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “আমরা চাইনা কোনও কোম্পানি অলাভজনক হোক। তবে নিজে মুনাফা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ঠিক হবে না।”
বিইআরসি কারিগরি কমিটির মত
বিইআরসি কারিগরি কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বর্তমান দাম ৮৬ টাকা থেকে কমিয়ে ৭৪ দশমিক ০৪ টাকা করার সুপারিশ করেছে। শুনানিতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি ‘উইন-উইন’ আদেশ দেওয়া হবে, যাতে কোনও পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”
বিতরণ কোম্পানিগুলোর মুনাফা ও প্রফিট বোনাস
শুনানিতে বিপিসির অধীনস্থ তিন তেল বিপণন কোম্পানি (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা) তাদের ডিস্ট্রিবিউশন চার্জ বা মার্জিন বাড়ানোর দাবি করে। তবে জেরার মুখে তারা স্বীকার করে যে, কোম্পানিগুলো ধারাবাহিকভাবে মুনাফায় রয়েছে। গত অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের ১৮০ শতাংশ পর্যন্ত ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়েছে। এমনকি পদ্মা অয়েল কোম্পানি তাদের কর্মীদের ১৫ লাখ টাকা এবং মেঘনা অয়েল ৬ লাখ টাকা করে প্রফিট বোনাস দেওয়ার তথ্যও শুনানিতে উঠে আসে। এত মুনাফার পরও মার্জিন বাড়ানোর দাবিতে ভোক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ভোক্তাদের দাবি
শুনানিতে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা ডিজেল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম বিপিসি কর্তৃক নির্ধারণের কঠোর সমালোচনা করেন। তারা দাবি করেন, আইন অনুযায়ী সকল জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার বিইআরসির।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জানান, শুনানির বিষয়ে কোনও লিখিত মতামত থাকলে তা আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জমা দেওয়া যাবে। এরপর কমিশন চূড়ান্ত আদেশ ঘোষণা করবে।
গণশুনানিতে অংশ নেন কমিশনের সদস্য মো. আব্দুর রাজ্জাক, মো. মিজানুর রহমান, সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহিদ সারওয়ার।









