গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট, আর সড়কে তীব্র যানজট—সব মিলিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজধানীবাসী। দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক বাসাবাড়িতে রান্না করা যাচ্ছে না। কোথাও পুরোপুরি গ্যাস না থাকায় বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা বা লাকড়ির চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। একই সময়ে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় বাড়ছে দুর্ভোগ। গ্যাসের সংকটে রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। এর সঙ্গে বৃষ্টি, উন্নয়নকাজ, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিসহ নানা কারণে সড়কে যানজটও বাড়ছে।
তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) সাইদুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সামিটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তিতাস ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট করে গ্যাস পাচ্ছে। তিতাসের অধীন এলাকায় গ্যাসের চাহিদা ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এলএনজি সমস্যার আগে ২১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল।
কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলএনজি না আসা পর্যন্ত খুব বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। আবহাওয়া ভালো হলে দুই-এক দিনের মধ্যে সামিটের এলএনজি পাওয়া যেতে পারে। সেটি পাওয়া গেলে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে কিছুটা ঘাটতি কাটবে বলে আশা করছেন তিনি।
এদিকে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় সামিট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে সামিট এলএনজি টার্মিনা। ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়িয়ে ১৫ আগস্ট রাত ২টার দিকে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই গ্যাস সরবরাহ শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য গ্রাহকের গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়াতে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা এবং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গ্যাসের সংকটে চুলা বন্ধ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ একেবারেই কমে গেছে। কোথাও সকাল থেকে চুলায় গ্যাস নেই, কোথাও আবার রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারকে বিকল্প উপায়ে রান্না করতে হচ্ছে।
শান্তিনগরের বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, বাসায় গ্যাসের চাপ না থাকায় ঠিকমতো রান্না করা যাচ্ছে না। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ও রাইস কুকার কেনার পর এখন বিদ্যুৎও চলে যাচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই সংকটেই পরিবারের সবাইকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
বনশ্রীর বাসিন্দা মিঠি চৌধুরী জানান, সকাল থেকে চুলায় গ্যাস নেই। কখনও হোটেল থেকে খাবার আনতে হচ্ছে, আবার কখনও রাতে অল্প গ্যাস এলে রান্না করছেন। এর মধ্যে লোডশেডিং হলে পানি তোলাও সম্ভব হচ্ছে না।
বাড্ডার গৃহবধূ আরিফা আক্তার বলেন, গ্যাস না থাকায় লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। তাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে ইলেকট্রিক চুলা কেনা সম্ভব নয়।
উত্তরা, মিরপুর, আগারগাঁও, রামপুরা, মালিবাগ, মগবাজার ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকটের কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
গ্যাসের সঙ্গে লোডশেডিং
গ্যাসের সংকটের মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কোথাও কোথাও লোডশেডিং হচ্ছে।
ডেসকো ও ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ডিপিডিসির অধীন এলাকায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা প্রায় ২ হাজার ১০০ মেগাওয়াট এবং ডেসকোর অধীন এলাকায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৪০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড়ে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে শুক্রবার বিকালে ছুটির দিনের কারণে ডিপিডিসির চাহিদা ছিল ১ হাজার ৭৩৫ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ছিল ৮২ মেগাওয়াট।
মিরপুরের বাসিন্দা সাথি আক্তার বলেন, গ্যাসের চাপ এত কম যে চুলা জ্বালানোই যাচ্ছে না। এর মধ্যে রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বাচ্চারা পড়তে বসা কিংবা পরিবারের রাতের খাবারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। গরমের মধ্যে এক ঘণ্টা লোডশেডিংও অসহনীয় হয়ে উঠছে।
পিজিসিবির হিসাবে, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৮২০ মেগাওয়াট, বিপরীতে লোডশেডিং হচ্ছিল ২০ মেগাওয়াট। পরে রাত ৮টার দিকে সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৬৭৩ মেগাওয়াট, বিপরীতে লোডশেডিং ২১১ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টরা জানান, রাতে চাহিদা ও লোডশেডিং—দুটিই বাড়তে পারে।
সিএনজি পাম্পে দীর্ঘ লাইন
গ্যাসের সংকটে রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতেও ভোগান্তি চরমে উঠেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অল্প পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন চালকরা। অনেক ক্ষেত্রে গ্যাস নিতে একাধিকবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
শুক্রবার ভোরে হাজিপাড়া সিএনজি পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, দুই দিকে গাড়ির দীর্ঘ সারি। এক পাশের প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন বিটিভি পেরিয়ে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত এবং অন্য পাশের লাইন মালিবাগ মোড় পেরিয়ে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
প্রাইভেটকার চালক সোহেল রানা বলেন, এমন দীর্ঘ সিরিয়াল তিনি জীবনে দেখেননি। ভোর ৪টার দিকে এসে দেখেন, লাইন বিটিভি পর্যন্ত চলে গেছে।
চালক সুমন জানান, ভোর ৪টায় লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্তও গ্যাস পাননি। আরও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতে পারে। তাও সর্বোচ্চ ২০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
প্রায় ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর ১৭৯ টাকার গ্যাস পাওয়া রিপন মিয়া বলেন, এই পরিমাণ গ্যাসে কতক্ষণ চলবেন, সেটিই এখন চিন্তার বিষয়।
আরেক চালক আবু বকর জানান, রাতে লাইনে দাঁড়িয়ে ৭০-৮০, কখনও ১০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। অল্প গ্যাসে দুই-তিনটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে দিনের বড় একটা সময় গ্যাসের জন্য অপেক্ষাতেই চলে যাচ্ছে।
মেরুল বাড্ডার জামান ফিলিং স্টেশন, তেজগাঁওয়ের আকিজসহ মহাখালী, উত্তরা, মিরপুর, গাবতলী ও কমলাপুরের বিভিন্ন পাম্পেও দীর্ঘ লাইনের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক পাম্প সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
পাম্পের বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানান, দিনের বেলায় অনেক সময় গ্যাস থাকে না। থাকলেও চাপ খুব কম থাকায় পাম্প বন্ধ রাখতে হয়।
গ্রামাঞ্চলেও লোডশেডিং
রাজধানীর বাইরে গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ভোগান্তির কথা জানা গেছে। দিনের মধ্যে কয়বার বিদ্যুৎ আসছে, সেটিই অনেক এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখন লোডশেডিং হচ্ছে, তার হিসাব রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ভ্যাপসা গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিদ্যুৎ সংকটে ছোট ছোট কারখানাগুলোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
যানজটেও দুর্ভোগ
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি রাজধানীর সড়কে যানজটও নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়িয়েছে। গত কয়েকদিনে বৃষ্টি, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি, সংঘর্ষ এবং উন্নয়নকাজের কারণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
শুক্রবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাজধানীর যানজটের পেছনে ট্রাফিক বিভাগের অব্যবস্থাপনার চেয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ বড় ভূমিকা রাখছে।
তিনি জানান, গত সোমবার ভারী বৃষ্টিপাতে মানিক মিয়া এভিনিউসহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় যানজট সৃষ্টি হয়। এর আগে চকবাজার, সায়েন্স ল্যাব ও ঢাকা কলেজ এলাকায় ছাত্র সংগঠনগুলোর মারামারির ঘটনাও যান চলাচলে প্রভাব ফেলেছে।
রাস্তার ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ী, দয়াগঞ্জ ও কুড়িল বিশ্বরোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় রাস্তার ওপর স্টেজ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রগতি সরণিতে মেট্রোরেল ও ইউটিলিটি শিফটিং এবং ধানমন্ডিতে ওয়াসার উন্নয়নকাজ চলায় সড়ক সংকুচিত হয়ে যানজট আরও বাড়ছে বলে জানান তিনি।
জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতি সপ্তাহে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান অতিরিক্ত কমিশনার। এতে কোন সড়ক কতক্ষণ বন্ধ ছিল এবং সুনির্দিষ্ট কী কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে, তা তুলে ধরা হবে।
একসঙ্গে নানা সংকট
এদিকে গ্যাস সংকটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যা ও বৈরী আবহাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। দুটি এফএসআরইউয়ের ওপর দেশের এলএনজি সরবরাহ নির্ভরশীল। একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির পর সরবরাহ কমে যায়। পরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্য টার্মিনাল থেকেও স্বাভাবিকভাবে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়।
দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট হলেও দৈনিক সরবরাহ নেমে এসেছে ২ হাজার ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। একদিকে গ্যাসের তীব্র ঘাটতি, অন্যদিকে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া এবং সড়কে যানজট—সব মিলিয়ে একসঙ্গে নানা সংকটে নাকাল হয়ে পড়েছেন রাজধানীবাসী।
সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে। সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি নতুন করে দেড়শ কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের দায় বর্তমান সরকারের নয়। অন্যদিকে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশীয় উৎপাদন ঘাটতির কারণে গ্যাস আমদানি করতে হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় রাতারাতি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়।









