ইংরেজিতে ট্রিবিউন কথাটার আক্ষরিক অর্থ নেতৃত্ব। বাংলা ট্রিবিউন বাংলাদেশের কথা বলে, বাংলাদেশের মানুষের অধিকারকে এগিয়ে রাখে।
যারা সংবাদ খোঁজেন, তাদের সেই দিন আর নেই যে, সকালে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চোখের সামনে সংবাদপত্র মেলে ধরে খবর পড়া হবে। ‘যখন খবর তখনই চাই’- এমন চাহিদার কারণে এখন অনলাইনের জোয়ার। গণমাধ্যমের কাছে এক-এক পাঠকের এক-এক ধরনের প্রত্যাশা। বাংলা ট্রিবিউনের উদ্যোক্তা, ব্যবস্থাপনা কর্তৃৃপক্ষ ও সংবাদকর্মী সবাই ভাববেন, তারা পাঠকের চাহিদা মেটাতে গিয়ে উল্কার মতো ছুটবেন নাকি ধীরে-সুস্থে জায়গা করে নেবেন। গত দু’বছরে বাংলা ট্রিবিউন পাঠক চাহিদা পূরণের একটা আওয়াজ দিতে পেরেছে বলেই মনে হয়।
সাংবাদিকরা কাজ করেন মানুষের জন্য। অসংখ্য, অজানা মানুষের জন্য তাদের দিন-রাত। কিন্তু সেই প্রিয় মানুষ থেকেও তার অবস্থান দূর, স্বতন্ত্র। সত্যনিষ্ঠা এবং আরও বড় স্বপ্নের প্রতি বড় অঙ্গিকার নিয়েই শুরু হয় একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান। অনলাইন নিউজ পেপার মানে পাঠকের সঙ্গে তার জীবন্ত যোগাযোগ। তাই চটজলদি খবরের প্রয়োজন কখনোই ফুরাবে না।
কিন্তু এর বাইরে যা একটি সংবাদপত্রকে সবসময় মানুষের কাছে প্রিয় করে রাখবে, তা হলো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
আরও পড়তে পারেন: অনলাইন গণমাধ্যমের পরিধি ব্যাপক
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আছে বাংলা ট্রিবিউনে। কিন্তু ততটা নেই, যতটা সমাজকে আলোড়িত করতে পারে। আমি জানি প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তি-সীমাবদ্ধতা আছে। সেই সীমাবদ্ধতা কেবল বাংলা ট্রিবিউনের নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব সংবাদমাধ্যমের।
গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমকে বলা হয় চতুর্থ স্তম্ভ। বাংলাদেশের ভয়ানক সংকট-সন্ধিতে সাংবাদিকতার কঠিন দায়িত্ব নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে বাংলা ট্রিবিউন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে বেহাল দশা, তাতে সুস্থ সাংবাদিকতা এক প্রকার অসম্ভব। আমরা কথায় কথায় বস্তুনিষ্ঠতা, পক্ষপাতহীনতা, ন্যায্যতা, ভারসাম্যপূর্ণ সংবাদ পরিবশন নিয়ে যত গালভরা বুলিই ছাড়ি না কেন, বাস্তবতা হলো, একটি ভয়ঙ্কর অসহিষ্ণু সমাজে আমাদের সাংবাদিকতা করতে হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি সংবাদমাধ্যমের শক্তিশালী সম্পাদকীয় বিভাগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একটি সংবাদমাধ্যম কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারী হয়ে পড়লে সেটা আর গণমাধ্যম থাকে না। কথাটা সত্যি। কিন্তু নিরপেক্ষতার এই চরিত্র বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অসম্ভব, যখন গণমাধ্যমকর্মীর সামনে উপস্থিত হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্ন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রশ্ন, উদার আর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ দেখার অভিপ্রায়।
আরও পড়তে পারেন: শফিক রেহমানের প্রশ্ন : বাংলা ট্রিবিউন টাকা দেয়?
গণমাধ্যমের মালিকানার ধরন এখন আনেক স্থানেই আলোচিত। কতটা ব্যবসায়িক কারণে, কতটা দস্যুতা করে অর্জিত পুঁজিকে রক্ষা করার জন্য গণমাধ্যম বের হচ্ছে, এটা যেমন এক বিতর্ক, তেমনি বিতর্ক আছে গণমাধ্যম কি পারছে, তার ‘ওয়াচডগ রোল’ বা পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করতে? রাজনৈতিক প্রভাবের কথা যতটা আলোচনায় আছে, ততটা নেই করপোরেট পেশির কথা। যারা বিজ্ঞাপন দেন, তাদের কথা শুনতে হয়, রাখতে হয় আরও নানা স্তরের দাবি আর বায়নার কথাও।
বাংলাদেশে প্রচুর পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও। তবে সবচেয়ে বেশি বেশুমার অনলাইন। সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে যে প্রচ- বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা বিস্ময়কর। সংখ্যায় বাড়লে যা হয়, তাই হয়েছে আমাদের এই জগতে। মানহীন মাধ্যম প্রচুর। চারদিকে সমালোচনা। আবার সংবাদমাধ্যমের কাছেই মানুষের যত প্রত্যাশা। সুস্থ রুচি, গণতান্ত্রিক চেতনা, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ বিকাশের প্রধান একটা অবলম্বন হলো পত্র-পত্রিকা।
এই যে প্রত্যাশা, তার সঙ্গে নিয়মিত যুদ্ধ চলে সংবাদকর্মীর। বাংলা ট্রিবিউন সেই যুদ্ধ করছে আরও তীব্রভাবে, কারণ তার ময়দানটি ফাঁকা নয়। আরও অনেক অনলাইন আছে, জাতীয় দৈনিকগুলোর অনলাইন ভার্সন আছে, টেলিভিশনগুলোর আছে, আর আছে সামাজিক মাধ্যম।
বাংলা ট্রিবিউন গণমাধ্যম হিসেবে এখন সম্মুখ সমরে। তার টিকে থাকা, গুণগত মান নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, অসহিষ্ণু সমাজে সত্য বলার সাহস নিয়ে পথ চলা, অন্ধকারের শক্তিকে পরাজিত করতে আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের কথা বলা; কোনওটিই সহজ নয়। আবার অসম্ভব নয় যদি যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করার মতো যোগ্য বাহিনী থাকে।
লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।



