চাপাতির কোপ ও বজ্রপাত

চিররঞ্জন সরকার
২১ মে ২০১৬, ১৩:৪২আপডেট : ২১ মে ২০১৬, ১৪:০০

চিররঞ্জন সরকার আমাদের দেশে বর্তমানে চাপাতি আর বজ্রপাত থেকে মাথা রক্ষা করাটাই নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাপাতির কোপ ও বজ্রপাতে মৃত্যু বর্তমানে মহামারি রূপ ধারণ করেছে। এপ্রিল ও মে মাসেই বেশ কয়েকটি চাপাতি হামলার ঘটনা ঘটে। ৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর সূত্রাপুরের একরামপুর মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিমুদ্দিন সামাদকে। এর পর ধারাবাহিক ভাবেই চলছে এই চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা।
২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করীম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২৬ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগানে বাসায় ঢুকে জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। জুলহাজ সমকামীদের অধিকারবিষয়ক পত্রিকা ‘রূপবান’-এর সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তনয় মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ৩০ এপ্রিল টাঙ্গাইলের গোপালপুরে একই কায়দায় চাপাতির কোপে খুন হন নিখিল জোয়ারদার (৫০) নামের এক দর্জি।
৬ মে রাজশাহীর তানোরে শহিদুল্লাহ(৫৫) নামে সুফিবাদের প্রচারক এক ধর্মীয় নেতাকে চাপাতি দিয়ে গলা কেটে খুন করা হয়। ১৪ মে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ওপর চাকপাড়া বৌদ্ধ বিহারের বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা মংশৈউ চাককে (৭৭) গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০ মে কুষ্টিয়া সদরে সানোয়ার হোসেন নামে এক হোমিও চিকিৎসককে কুপিয়ে হত্যা করেছে।
চাপাতি এবং কসাই শব্দটা একে অপরের পরিপূরক। কারণ এই চাপাতির সাহায্যেই কসাই আপন সুখে মাংস টুকরো টুকরো করে। কিন্তু সেই চাপাতি দিয়ে এখন নিয়মিত মানুষ কোপানো হচ্ছে। খাসি কিংবা গরু নয়, ঘাতকরা এখন মানুষকেই চাপাতি দিয়ে টুকরো টুকরো করছে।

আরও পড়তে পারেন: তিন বছর পর ভিন্ন ঢাকা দেখবেন: আনিসুল হক
গত তিন বছর ধরে চাপাতির কোপে একের পর এক প্রাণ হারাচ্ছেন প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার মানুষ। হামলা হচ্ছে, কোপানো হচ্ছে, জবাই করা হচ্ছে, খুন হচ্ছে। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে একেকটি তরতাজা প্রাণ। বিনষ্ট করা হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ ও অসীম স্বপ্ন। কিন্তু এর কোনও প্রতিকার হচ্ছে না। হরতাল-অবরোধ ও আগুন-পেট্রোল বোমার রাজনীতি বন্ধ করতে সরকার সমর্থ হলেও দীর্ঘ ৩ বছরে চাপাতির কোপ বন্ধ হয়নি!
২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর পর থেকেই বেড়ে যায় মানুষ খুনের উদ্দেশ্যে চাপাতির ব্যবহার। সেই সময় নাস্তিকতার ইস্যু চাপিয়ে শুরু হয়েছিল ব্লগার হত্যা। প্রচারিত হতে থাকে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অপরাধ। অপরাধের জন্যে প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও বেছে নেওয়া হয় চাপাতি। চাপাতির আঘাতে মুক্তচিন্তার মানুষ খুন হচ্ছে তা নয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যারা কথা বলেছেন, যারা প্রচলিত বিশ্বাস ও জীবনাচরণের বাইরে কথা বলেছেন, যারা ভিন্ন ধর্ম পালন করছেন, আক্রান্ত হচ্ছেন তারাই। তবে এক্ষেত্রে কৌশলে নির্ধারিত হচ্ছে টার্গেট।

এখন যা পরিস্থিতি তাতে, যে কেউ-ই চাপাতির কোপে আক্রান্ত হতে পারেন। এ অবস্থায় চাপাতির কোপ থেকে বাঁচার উপায় বের করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে কিছুতেই যাওয়া যাবে না। সতর্ক থাকতে হবে, যেন কেউ ধর্ম অবমাননার কিংবা নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ না পায়। পাগল-ফকির-দরবেশ-হকার-হাইজাকার যা খুশি তাই হোন, কিন্তু ধর্ম নিয়ে কখনও কিছু বলবেন না। আপনি ভিন্ন ধর্মমতের মানুষ হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকে প্রশংসা করুন। প্রয়োজনে সেই ধর্ম গ্রহণ করতে পারেন। তা না হলে আখেরে চাপাতির কোপ জুটেও যেতে পারে। বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননাকারী ও নাস্তিকদের কোনও জায়গা নেই। আপনি ধর্ম অবমাননা করেছেন কিনা, আসলেই নাস্তিক কিনা সেটা বড় কথা নয়, আপনার নামে কেউ এগুলো রটিয়ে দিচ্ছে কিনা সেটাই আসল কথা। কেউ রটিয়ে দিলেই সর্বনাশ। আমাদের দেশে এখন এ ব্যাপারে ভয়ানক সমৃদ্ধি এসেছে। কারও বিরুদ্ধে ‘নাস্তিক’ বা ‘ধর্ম অবমাননাকারী’ এই ‘ট্যাগ’ লাগিয়ে দিতে পারলে খুনও জায়েজ। শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ লোক এই খুনের পক্ষেই অবস্থান নেন। পুরো বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধি-বিবেকের ঘাড় এখন সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদীদের ধারালো চাপাতির নিচে। যে কোনও সময় যে কারও ঘাড়ে, স্পাইনাল কর্ডে চাপাতির কোপ পড়বে।

খুনিরা কিন্তু ক্রমাগতভাবে শুধু ‘নাস্তিক’দের কতল করছে না। চাপাতিবাজি চলছে শিক্ষক, শিল্পী, বিদেশি, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, দর্জি, হোমিও চিকিৎসক, সাধু থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর। এমনকি ‘মডারেট মুসলিম’দের কারও কারও উপরেও হামলা হচ্ছে। এর কারণ কী? কারণ হলো, যারা চাপাতিবাজি করছে, তাদের চোখে তারা বাদে আর কেউই ‘যথাযথভাবে ধর্ম পালন’ করে না। তাদের ছকের একটু এদিক ওদিক হলেই চাপাতির কোপ খেতে হবে।

এ অবস্থায় পুরো ধর্মজীবী হয়ে যাওয়া এমনকি ভিন্নধর্মাবলম্বীদের রাষ্ট্রীয় ধর্মে দীক্ষা নেওয়া ছাড়া বাঁচার কোনও পথ আছে বলে মনে হয়! যেখানে প্রতিকার নেই, সেখানে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া আর উপায় কী?

সম্প্রতি বাংলাদেশে নতুন আরেক আপদ মানুষের জন্য ভীতির কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। সেই আপদের নাম হচ্ছে বজ্রপাত (অনেক অঞ্চলে একে বলে ঠাডা)। চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর বলছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে বজ্রপাতে মানুষ মারা যাওয়ার সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। এ বছর এখনও পর্যন্ত বজ্রপাতে শতাধিক মানুষ মারা গেছেন। এর মধ্যে গত ১২ ও ১৩ মে দুই দিনের বজ্রপাতেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৭০ জন মারা গেছে! উন্নত দেশগুলোতে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমলেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা বাড়ছে।

আরও পড়তে পারেন: পাঠ্য বইয়ে ভাইভার, স্কাইপকে ‘সেক্স ক্যামেরা’ আখ্যা!

বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ কী সেটি নিয়ে বাংলাদেশে বিস্তারিত কোনও গবেষণা নেই। তবে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন গবেষক-এর নানা কারণ তুলে ধরেন। কোনও কোনও গবেষক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে এবং তাপমাত্রা বাড়ছে বলে দেশে বজ্রপাত বাড়ছে। তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বড় গাছের অভাব বজ্রপাতে মৃত্যুর একটা কারণ হতে পারে। শহরাঞ্চলে ঘরবাড়ি বেশি হলেও সেখানে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা থাকায় বজ্রাঘাতে হতাহতের ঘটনা কম। কিন্তু গ্রামে এই নিরোধক হিসেবে কাজ করতো যে বড় বড় গাছ, তার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে গ্রামাঞ্চলে বজ্রাঘাতে প্রাণহানি বেশি ঘটতে দেখা যায়। কংক্রিটের নিচে ঠাঁই নেওয়া এবং যে কোনও ইলেকট্রনিং বস্তু থেকে দূরে থাকাই আপাতত বজ্রপাত থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সচেতনতা দরকার। আশেপাশে যদি কোনও উঁচু গাছ থাকে সেখান থেকে দূরে থাকা। টিনের ছাদ এড়িয়ে চলা। উপরে ছাদ আছে এমন জায়গায় চলে আসা। বজ্রপাতের সময় বিদ্যুতের খুঁটি ও টাওয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে। তাছাড়া জলাশয় ও পুকুর থেকে দূরে থাকাও দরকার। বন্যা এবং সাইক্লোনের মতো দুর্যোগের ক্ষেত্রে কিছু প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বজ্রপাতের বিষয়টি ভূমিকম্পের মতোই আকস্মিক। উল্লেখ্য, মেঘের নিচের অংশে সাধারণত  ঋণাত্মক আয়ন আর উপরের অংশে থাকে ধনাত্বক আয়ন। আর ভূপৃষ্ঠের থাকে ধনাত্মক আয়ন। এই ধনাত্বক আয়নের আকর্ষণই মূলত ভূপৃষ্ঠে বজ্রপাতের কারণ। প্রশ্ন হলো, এই বজ্রপাতের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া আসলেই কঠিন। কখন মেঘে মেঘে সংঘর্ষ হবে, বজ্রপাত হবে-আমরা কেমনে বুঝবো?

চাপাতি যেমন নতুন নয়, এর প্রয়োগটা নতুন, ঠিক তেমনি বজ্রপাতও নতুন নয়। এটা যখন-তখন আমাদের ওপর পড়ছে এবং মৃত্যুর কারণ ঘটাচ্ছে-এটাই নতুন।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বশেষসর্বাধিক