আজ ১২ জুন। ১৯৯৬ সাল থেকে এই দিনটি এসেছে আমার জীবনে রাতের চেয়েও অন্ধকার নিয়ে। অপহরণের দিন পর্যন্ত কল্পনা চাকমা ছিলেন অবিভক্ত ‘হিল উইমেন ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক, পাহাড়ের প্রতিবাদী মুখ। বলার অপেক্ষা রাখে না কেন তাকে অপহৃত হতে হয়েছে। পাহাড়ে নির্যাতন আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন কল্পনা। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কল্পনা চাকমা আমার বন্ধু ছিলেন। ‘ছিলেন’ বললে ভুল হবে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম মানেই আমার কাছে এখনও কল্পনা চাকমা। আমার জীবনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নতুন বোঝাপড়া তৈরি করতে যে মানুষ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন নিঃসন্দেহে তিনি কল্পনা।
দেখে মনে হবে চুপচাপ, অন্তত প্রথম ১৯৯২ সালে প্রথম পরিচয়ে আমার তাই মনে হয়েছিল। আমরা দুজনেই তখন টিন এজার। লোগাং হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত একটি সমাবেশে দেখা। বর্তিকা চাকমা, নীরুপমা চাকমা তখন হিল উইমেন ফেডারেশনের নেত্রী। এর কয়েকদিন পর আবার দেখা। সেদিনও খানিকটা চুপচাপ। আমি জানতে পারিনি ওর অন্তর্গত শক্তির কথা, ওর ভেতরের সাহসের কথা। ১৯৯৫ সালের ১৫ মার্চে বান্দরবানে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের একটি অনুষ্ঠানে আমি যাই।
সেদিন একই জায়গায় বাঙালি সমঅধিকার আন্দোলনও কর্মসূচি দেয়। ফলে জারি হয় ১৪৪ ধারা। সেদিনের ঘটনায় ২ জন পাহাড়ি ছেলে প্রাণ হারান এবং মধ্যমপাড়া, উজানিপাড়াসহ আরও একটি পাড়ায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসি এবং প্রায় ১৫ দিন পর পাই কল্পনার চিঠি।
তিন পৃষ্ঠার সেই চিঠিতে এক নতুন কল্পনার সন্ধান পাই। আমার জন্য ভালোবাসা, উৎকণ্ঠা, দুঃশ্চিন্তার পাশাপাশি পাহাড়, পাহাড়ে সামরিকীকরণ, নারী নিপীড়ন, নিজ সমাজের পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গী। আমি ভাবতে পারি না সেই চুপচাপ মেয়েটির চিঠি এটি!
এসে গেল ১৯৯৬-এর সাধারণ নির্বাচন। কল্পনা জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এসেছিলেন ইপিজেডে একটি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা দিতে। অপহৃত হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে সেই সময়ে আমার সঙ্গে তার দেখা। এসেছিলেন জাহাঙ্গীরনগরে আমার সঙ্গে দেখা করতে।
১১ জুন নির্বাচনের রাতে কল্পনাকে অপহরণ করা হয় রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে। অপহরণের পরদিন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা বাদী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন। কল্পনার অপহরণ নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে তোলপাড় চলে। প্রতিবাদ ওঠে। সেই প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় স্মারক নং স্ব.ম.(রাজ-২) পার্বত্য ৩/৫ (অংশ) ৭/৯/৯৬ তারিখে দ্য কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট ১৯৫৬-এর ৩ প্যারার ক্ষমতাবলে তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে। এই কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রিপোর্ট পেশ করে। কিন্তু কোনও সরকারই এই রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৩৫ জন কর্মকর্তার হাতে ঘুরেছে মামলা। নেওয়া হয়েছে ৯৪ জনের সাক্ষ্য।
মামলা দায়ের করার ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে মামলাটির প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ১৪ বছর তদন্তাধীন থাকার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের ‘অজ্ঞাতনামা’ উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। বাদী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দিলে পরবর্তী সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন। সিআইডি দুই বছর সময় নিয়ে অবশেষে ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৩ রাঙামাটি মুখ্য হাকিমের আদালতে মামলাটির প্রথম দফা শুনানি হয় এবং ১৬ জানুয়ারি আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য রাঙামাটি জেলা এসপিকে আদেশ দেন। সেই নতুন তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতেই হয় শুনানি। এই মামলার সর্বশেষ তদন্ত করেছেন রাঙামাটিতে দায়িত্বে থাকা সাবেক এসপি আমেনা বেগম। এখন তিনি আবার বদলি হয়ে গেছেন।
নিয়মমাফিক নতুন তদন্ত কর্মকর্তা আসবেন। আবারও আবেদন পড়বে নতুন তদন্তের। আর এভাবেই ফাইলের ফিতা খোলা হবে ও বন্ধ করা হবে। কিন্তু মামলার সুরাহা হবে না। বরং নতুন মামলাটি চালিয়ে নিচ্ছেন যারা, তারা বলছেন, ভিকটিমকে না পেলে তদন্ত শেষ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ফলে এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াই।
গত বছরের জুনে আদালতে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মামলার ঘটনাটি যেহেতু দেড় যুগ আগের, ১৮ বছরে ভিকটিমের চেহারার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যেহেতু এই মামলার মূল সাক্ষী ভিকটিম কল্পনা নিজেই, তাই কল্পনা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত, কিংবা তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে মামলার ভিকটিম কল্পনা চাকমাকে উদ্ধারের জোর তৎপরতা অব্যাহত আছে।’ (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, ২৫ মে ২০১৫) কল্পনাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য যে মামলা, অপহরণের বিচারের জন্য যে মামলা, সেই মামলায় এখন কল্পনাই একমাত্র সাক্ষী? তার সাক্ষ্যই একমাত্র অবলম্বন?
যেকোনও অপরাধের ঘটনা তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা। অথচ তদন্ত কমিটি আশ্চর্যজনকভাবে প্রত্যক্ষদর্শী কালিন্দকুমার ও লালবিহারী চাকমার সাক্ষ্যকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং খারিজ করা হয়েছে নানা ছুতায়। লালবিহারী চাকমা (তদন্ত রিপোর্টের ২ নম্বর সাক্ষী) স্পষ্টভাবেই অপহরণকারীদের মধ্যে তিনজনকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তাদের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্রের বিবরণ দিয়েছিলেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা এই ঘটনায় জড়িত থাকা সেনাবাহিনীর সদস্যদের চিনতে পেরেছিলেন। কল্পনার ভাইদের অভিযোগ, মামলার আলামত নষ্ট করা হয়েছে অপহরণকারীদের অব্যাহতি দেওয়ার জন্য। কিন্তু পুলিশের এফআইআরে এই চিনতে পারা অপরাধীদের নাম না লিখে ‘অজ্ঞাত’ লেখা হয়।
বর্তমানে কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটি রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের অধীনে পুনঃ তদন্তাধীন। গত বছরের মে মাসে মামলার প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার কথা থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা তা দিতে সমর্থ হননি। বরং তিনি এ মামলার তদন্তভার থেকে অব্যাহতি চেয়ে মামলাটি আবারও সিআইডির কাছে হস্তান্তরের জন্য আবেদন করেছেন। তদন্ত কমিশন, পুলিশ, সিআইডি ফাইল ঘুরছে, ঘুরবে, তারপর?
কল্পনা অপহরণের ২০ বছর অতিবাহিত হলো। অপহরণের একবছর পরে শান্তি চুক্তিতেও কল্পনার অপহরণ বা পাহাড়ে নারী নিপীড়ন নিয়ে কোনও ধারা নেই। এই বিষয়ে অনেকটাই চুপ থেকেছেন পাহাড়ি নেতারাও। যতোটুকু মনে পড়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন চর্চিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী ঘরানার নারী আন্দোলনে কল্পনার অপহরণ প্রথম পাহাড়ি এবং বাঙালি নারী আন্দোলনের মধ্যে সেতু স্থাপন করে। সেই আন্দোলন থেকেই স্লোগান ওঠে, 'আমাদের ধমনীতে কল্পনা চাকমার রক্ত, এই রক্ত কোনোদিন পরাভব মানেনা...'। পাহাড়ি -বাঙালিরা কল্পনার অপহরণের বিচারের আওয়াজ জারি রাখলেও ২০ বছর ধরে মামলার তারিখ পরিবর্তনের মধ্যেই সীমিত মামলার একমাত্র ক্রিয়াশীলতা।
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]



