জাতীয় ঐক্যের কল্পনা করতেই পারি

মোস্তফা হোসেইন
০১ আগস্ট ২০১৬, ১৭:৪৩আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৬, ১৭:৪৬

মোস্তফা হোসেইন জঙ্গি হামলার  পরও আশাটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। নৈরাশ্য আর নেতিবাচক রাজনীতির মাঝখানে একটু হলেও আলো ছড়াতে পারে। আমরা আশা করতে পারি, বাংলাদেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অন্তত একটি ইস্যুতে নীতিগতভাবে একমত প্রকাশ করছে। বলছে, জঙ্গি দমন ইস্যুতে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
কেউ কেউ এখনও দুই দলের অবস্থানকে দেখাতে পারেন নেতিবাচক বলেই। দুই দলের নেতাকর্মীরা প্রচার করতে পারেন—ঐক্য হয়নি, হচ্ছে না প্রতিপক্ষের আন্তরিকতার অভাবে। খুব ভালো কথা, এটাও কিন্তু ‘না’ নয়। অন্তত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নপথে অভিন্ন স্বার্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়াকে নেতিবাচক বলব কিভাবে? দেখতে হবে, উভয়ের সামনেই একটা ইস্যু—জঙ্গিবাদ থেকে জাতিকে রক্ষা করা। তাই যে দল যে পথে যাক না কেন, লক্ষ্য তাদের এক এবং বলা যায় ৯০-এর দশকের গোড়ায় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় যেমন দুই দল এক হয়েছিল, তেমনি একটা আবহ নিশ্চয়ই তৈরি হতে শুরু করেছে। আর রূপকার এবং বাস্তবায়নকারীরা নিশ্চয়ই রাজনৈতিক নেতা। যাদের ওপর আমাদের ভরসা রাখতে হয়। তাই আমরা আশা করতে পারি,  নব্বইয়ের দশকে যেমন একপক্ষীয় একটা রেফারেন্ডাম হয়েছিল, সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হবে বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিবাদ উচ্ছেদের লক্ষ্যে।
সেজন্য আমরা অবশ্যই আশা করতে পারি, দুটি দল এখনই নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেবে আমাদের। তারা মুখে যা বলছেন কাজেও তা দেখিয়ে দেবেন। এইতো।
তার জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ, নিজেদের দুর্বলতাগুলো দূরীকরণ এবং অতি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ। জামায়াতের মতো দুর্বৃত্তের দলকে জোটভুক্ত করে বিএনপি জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলন করবে এটা হয় না। এ মতে বিশ্বাসীদের জন্য কিঞ্চিৎ ভরসা হিসেবে বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা এগিয়ে এসেছেন। আমরা উদাহরণ দিতে পারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের। একইসঙ্গে বলতে পারি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আহুত জাতীয় ঐক্য গঠনে করণীয় শীর্ষক আলোচনায় ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের কথাও। তারা সবাই বলেছেন, জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে বিএনপি যদি জামায়াত প্রীতি ত্যাগ করে তাহলে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সহজতর হবে। বিএনপির ভেতরে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কিছু নেতার মুখ থেকেও প্রকারান্তরে এমনই বক্তব্য আসছে। সুতরাং বাতাস যে ঘুরতে শুরু করেছে তা বলা যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, খালেদা জিয়া কি তাদের উপদেশ গ্রহণ করবেন? বিএনপিকে জামায়াতের খপ্পর থেকে আলাদা করতে পারবেন? এই জটিলতা থেকে মুক্তির পরামর্শও তাদের অনুসারী কিছু বুদ্ধিজীবী দিতে শুরু করেছেন। তাদের কথা—জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য ভোটকেন্দ্রিক। সুতরাং ঐক্য প্রক্রিয়ায় জামায়াতকে তারা সঙ্গে রাখবেন না। আবার জোটের ঐক্য রক্ষার্থে তারা জামায়াতকে ত্যাগও করবেন না। কারণ তারা আগেই বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐক্য হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক। সমালোচকরা তাই বলতেই পারেন, বিএনপি এখন দুই নৌকায় পা দিয়ে এগিয়ে যেতে চাইছে।

দ্বিমুখী নীতির পক্ষে কাজ করছে তাদের ‘ইউরোপীয়’ নেতাও। তিনি ওখানে বসে জামায়াত সম্পর্ক দৃঢ়তর করছেন। এমনকী সম্প্রতি দুই বড় দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের লন্ডনে যে এক মঞ্চে আসার সুযোগ হয়েছিল, সেখানে জামায়াতের উপস্থিতির পেছনেও ওই নেতার প্রচ্ছন্ন হাত রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। যদিও ওখান থেকে জামায়াত নেতাকে পুলিশ দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল। আর এখানেই আলামতটা  গোলমেলে। বিএনপি দেখিয়ে দিয়েছে, সরকার জামায়াত-জঙ্গি উচ্ছেদে যতই চেষ্টা করুক, জনগণের চাহিদা যাই থাকুক, আমরা আছি জামায়াতের ছায়ায়।

এমনটা যদি চলতে থাকে, তাহলে কি দুই দলের ঐক্য চিন্তা সফল হবে? এহেন প্রশ্নও স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। সরকারি দলকে সমালোচনার সুযোগ করে দিয়ে বিএনপি কতটা লাভবান হবে এমন ভাবনাও তৈরি হয়।

সেই সুযোগেই বিএনপির আন্তরিকতার স্বচ্ছতার প্রশ্নটিও এসে যায়। জামায়াত ত্যাগের প্রশ্নে তারা সরকারি দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা থেকে সরে আসেনি এখনও। তাদের কোনও কোনও নেতা প্রকাশ্যেই বলছে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে না কেন? নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার প্রশ্নে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর এই চেষ্টা তাদের কতটা সুফল এনে দেবে তারা হয়তো ভাবতে নারাজ। জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী ও সন্ত্রাসী দল—এটা প্রকারান্তরে বিএনপি স্বীকার করার পরও নিজেরা তাকে ত্যাগ না করে সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে কি শেষ রক্ষা করতে পারবে? আর তারা যদি জামায়াতকে বগলদাবা করে চলতেই থাকে, তাহলে তাদের উচ্চারিত জাতীয় ঐক্য কতটা বাস্তব?

জামায়াত ত্যাগের প্রশ্নে বিএনপিকে এখন নতুন হিসাব করা প্রয়োজন বলে মনে করি। তাদের ৬ % ভোট এখন অধিকাংশই বিএনপির পক্ষে যাবে, এটা তাদের মুখ থেকেই শোনা যায়। জামায়াতকে নির্বাচনের বাইরে রেখেই তারা সেটা অর্জন করতে পারে। জামায়াতের সমর্থকরা স্বাধীনতার পক্ষের কোনও দলকে ভোট দেবে না এটা যে কেউ জানে। সুতরাং জামায়াত যদি জোট থেকে বহিষ্কৃত হয় তাহলেও বিএনপি ফয়দাটা পাবে। বরং সাংগঠনিকভাবে তারা জামায়াতের কারণে যা হারিয়েছে সেটা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। তাদের মনে রাখা প্রয়োজন তাদের ‘ইউরোপীয়’ নেতৃত্ব খোদ বিএনপিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং তাদের রাজনীতি করতে হলে দেশের সাধারণ মানুষের কাতারে যাওয়ার বিকল্প নেই। তাদের আরও বিবেচনা করতে হবে—জামায়াতি পরামর্শে সন্ত্রাসী রাজনীতির যে তকমা তাদের জুটেছে, সেটা থেকে রক্ষা পেতে হলেও তাদের জনগণের কাছে যাওয়ার কোনও বিকল্প নেই। আর সেই সুযোগটি এই মুহূর্তে তৈরি হয়েছে জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। এই মুহূর্তে তারা শাসকদলের সঙ্গে এক মঞ্চে না উঠেও অন্তত জাতীয় স্রোতে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলনকে চাঙ্গা করার মাধ্যমে।

জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মসূচি দিলে সরকারও যে তা প্রতিহত করবে এমনটা ভাবা যায় না। তাদের যদি শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি থেকে থাকে তাহলে তারা জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মসূচির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে। তারাতো সবাই জানে দলীয় অফিসে বসে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেওয়া আন্দোলন নয়। তারা আন্তরিকভাবে জঙ্গিবিরোধী আন্দোলন করুক। সেটাও হবে জাতীয় ঐক্যেরই অংশ। আমরা তেমনি জাতীয় ঐক্যের কল্পনা করতে পারি। যেখানে সন্ত্রাসী দল জামায়াতকে বাদ দিয়ে বিএনপি এগিয়ে যাবে। সেই সুযোগে জাতীয় প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দূরত্বও কমতে থাকবে। রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে পারে এমনটা আশা করতে বাধা কোথায়।

লেখক: সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও শিশুসাহিত্যিক।

আরও খবর: হলি আর্টিজানের সেই ভয়াবহ রাত

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
সর্বশেষসর্বাধিক