সস্তা শ্রম বিনিয়োগ আনে না

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৮:৪১আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১৮:৪৩

একাত্তর টিভির পরিচালক (বার্তা) সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা কেবল দুই ঈদের আগে দুটি বড় ঘটনা। ঈদ উল ফিতরের ঠিক আগে আগে গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় দেশি বিদেশি মানুষের প্রাণহানি, আর এবার ঈদ উল আযহার আগে টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীতে ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ট্যাম্পাকো ফয়েলস প্যাকেজিং কারখানায় আগুনের ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। বয়লার বিস্ফোরণের কথা প্রথমে বলা হলেও এখন জানা যাচ্ছে, গ্যাস লাইনের ত্রুটি থেকেই এমনটা ঘটেছে। আসল কারণ বের হবে, এটুকুই প্রত্যাশা।
ট্যাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেড প্যাকেজিং কারখানায় ৪৫০ জনের মতো শ্রমিক থাকলেও দুর্ঘটনার সময় ৭৫ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় এদের অনেকে শুধু আহত ও নিহত হননি, তাদের পরিবারও অপরিমেয় ক্ষতির মুখে পড়েছে।
দেশের দুর্ভাগ্য যে বারবার এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ২০১২ সালে আশুলিয়ায় তাজরিন ফ্যাশন গার্মেন্ট পুড়ে মারা যান ১১১ জন। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজায় ভবন ধসে মারা যান কমপক্ষে ১ হাজার ১৪৩ জন। ২০০৫ সালে সাভারের স্পেক্ট্রাম ভবন ধসে নিহত হয়েছিলেন ৬৪ জন।
কারখানায় দুর্ঘটনা মানেই বিশ্ব গণমাধ্যমে এখন বাংলাদেশের নাম। কারখানা থাকবে, নানা দেশেই আছে। কিন্তু বাংলাদেশের ন্যায় এতো দুর্ঘটনা কোথাও ঘটে বলে শোনা যায়না। কারণ আমরা ছাড়া আর সব দেশেই নিরাপত্তা বিধি অতি স্পষ্ট এবং কঠোর। এখানেও কঠোর নিরাপত্তা বিধির প্রয়োজন।
আমাদের পোশাক কারখানা এক সময় বিখ্যাত ছিল আগুন লাগার জন্য। তাজরিনতো সেদিনের ঘটনা। কারখানায় আগুন লেগে এত প্রাণহানী হওয়ার কারণ বেশি কারখানাতেই অগ্নি-নিরাপত্তার ব্যবস্থা দুর্বল। অধিকাংশ ছোট কারখানায়তো থাকেইনা। পোশাক শিল্পের ক্রেতাদের চাপে নজর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আরও কতো শত কারখানা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশব্যাপী। বেশি লাভের চেষ্টায় মালিকরা অদক্ষ শ্রমিকদের কম মজুরিতে নিয়োগ করেন, তারা একই ঘরে বহুবিধ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে  শ্রমিকদের  বাধ্য করেন।  বিভিন্ন রাসায়নিক নিয়ে যথেচ্ছ পরীক্ষানিরীক্ষাও একইভাবে চলছে। 

আগে যা ঘটেছে ট্যাম্পাকো দুর্ঘটনায়ও তাই ঘটেছে। সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কোনও কোনও সময় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ হয়, আবার বেশিরভাগ সময় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটলো, তা উল্লেখ থাকলে সেই কারণগুলো অন্য কারখানায় বিদ্যমান আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হয়না কখনও। 

এসব তদন্ত কমিটির ফলাফল শ্রমিকদের জীবনে কোনও পরিবর্তন আনেনা। আর এসব কারণে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে শ্রমিক মারার এমন উৎসব। ট্যাম্পাকো কারখানার নিহত শ্রমিকদের পরিবারপ্রতি দুই লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী। তিনি আহতদের চিকিৎসার ব্যয় বহনেরও ঘোষণা দেন। দুই লাখ টাকা দিয়ে অন্য পণ্যের মতো জীবন কেনা হলো। যে পরিবারটি থেকে এই জীবনটি ক্ষয় হয়ে পড়ল, সেই পরিবার কি এই দুই লাখ টাকা দিয়ে তা পূরণ করতে পারবে। টাকা দিয়ে কি জীবন পাওয়া যায়? 

আমাদের শিল্পখাত শুধু সস্তা শ্রম নির্ভর। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে শিল্পশ্রমিক পেতে সবচেয়ে কম মজুরি দিতে হয়। আর এই একটি মাত্র কারণে বাংলাদেশের সস্তা পোশাকের চাহিদা দিনে দিনে বাড়ছে। আর এ নিয়েই আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশা করছি, দেশে কাঙ্ক্ষিত হারে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। একদিকে একের পর এক প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা, অন্যদিকে নিরাপত্তার শঙ্কা। আছে স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও সহজ কর্ম পরিবেশের অভাবও। 

এসব উদ্বেগ বিবেচনা করলে উদীয়মান অনেক অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান অনেক পেছনে। নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য হলি আর্টিজানের মতো ঘটনা, কিংবা ট্যাম্পাকোর দুর্ঘটনা কোনোভাবেই সহায়ক নয়। এক আমলা প্রধানের কারণে ‌বিনিয়োগ বোর্ড পরিণত হয়েছে এক বিদেশ সফর করার প্রতিষ্ঠানে। অবশ্য সেই নির্বাহী চেয়ারম্যান সম্প্রতি ছেড়েছেন এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। 

বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোনও দেশ কতটুকু প্রণোদনা দেয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ নীতিমালা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিবেশ নিশ্চিততো হয়ইনি, বরং সরকারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরও বেড়েছে। মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, জমির সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার চেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর থাকলেও সেটা কর্মকর্তাদের পর্যায়ে একেবারেই নেই বলা চলে। 

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে দেশি বিনিয়োগকারীদের চেয়েও বেশি সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এদেশ সম্পর্কে বাইরে অনেক নেতিবাচক প্রচারণা আছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আমদানি হয়েছে জঙ্গি হামলা। সেটি মোকাবিলা করছে সরকার দৃঢ়তার সাথে। কিন্তু আবার ঘটলো ট্যাম্পাকোর ঘটনা। 

বাংলাদেশে ব্যবসা-সংক্রান্ত একটি চুক্তি বাস্তবায়নে সময় লাগে ১ হাজার ৪৪২ দিন, চীন ও ভিয়েতনামে এ ক্ষেত্রে সময় লাগে যথাক্রমে ৪০০ ও ৪৫৩ দিন। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এ চিত্র স্বস্তিদায়ক নয়। যত আকর্ষণীয় নীতিমালাই করিনা কেন, দেশের আমলাতন্ত্র এখনও ব্যক্তিখাত ও বিনিয়োগ সহায়ক নয়। 

বাংলাদেশে ব্যবসা করা লাভজনক। যারা দীর্ঘ সময় ধরে এখানে আছে, তারা তা জানে। কিন্তু নতুনরা আসতে চায়না। এখানে নীতিমালা বাস্তবায়ন ও আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব আছে। বিনিয়োগের লভ্যাংশ বৈধ উপায়ে এ দেশ থেকে নেওয়া কঠিন। সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবেও সমস্যা আছে। 

যেকোনও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের রয়েছে। কিন্তু তারাই এখন সেই অর্থে বিনিয়োগ করছেননা। কিছু বড় প্রতিষ্ঠিত শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রুপ ছাড়া আমাদের অর্থনীতি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছেনা। স্থানীয় বিনিয়োগ ঠিকমতো না হলে আমরা কী করে বিদেশি বিনিয়োগের দিকে তাকাই? 

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা  

পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বশেষসর্বাধিক