এইট ইলেভেনের দুই ঘটনায় বিশ্ব বিচলিত

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
০৫ জানুয়ারি ২০১৭, ১২:৩৯আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৭, ১২:৫২

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী ২০১৬ সাল তামাদি হয়ে গেছে। এ তামাদি হওয়া বছরটার ৮ নভেম্বর উল্লেখযোগ্য দু’টা ঘটনার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রথম ঘটনাটা হলো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বিতীয় ঘটনাটা হচ্ছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (World Meteorological Organization- ডব্লিউএমও) মরক্কোতে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একটি রিপোর্ট পেশ করেছে।
এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে গত পাঁচ বছর বিশ্বে সর্বাধিক তাপমাত্রার রেকর্ড করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, মেরু অঞ্চলের বরফ বিশেষ করে অ্যান্টার্টিকার বিশাল আকারের হিমবাহ অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুত গলে যাচ্ছে। গত ২৯ বছরে উত্তর মেরু সাগরের বরফের পৃষ্ঠ দেশের যে অবস্থান ছিল গত পাঁচ বছরে তা ২৮% নিচে নেমে গেছে। এতে বিশ্বের উত্তাপ বেড়ে যাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব দ্রুততর হয়েছে।
এমন অবস্থার ফল কী দাঁড়াচ্ছে? বিশ্ব এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। এতে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত মালদ্বীপ নামক রাষ্ট্র সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। শুধু মালদ্বীপ নয় আরও বহুদেশ অস্তিত্বের সংকটে পড়বে এবং নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হবে। বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলগুলো জলমগ্ন হয়ে যাবে এবং কয়েক কোটি লোক বাস্তুহারা হবে।

হিমালয়ের হিমবাহও গলছে। এতে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বিপর্যয় ঘটবে। পর্যায়ক্রমে এ ধরনীতে সুসংগঠিত মানবজীবন টিকে থাকবে কিনা তাই মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সমস্ত বিশ্ব বেখেয়ালে বিপর্যয়ের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া নিয়ে কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। কয়েকবার জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা নিয়ে ধরিত্রী সম্মেলন হয়েছে এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি যাদের ওপর আরম্ভ তারা আওয়াজ তুললেও পশ্চিমা বিশ্বও শিল্প উন্নত দেশগুলো কোনও ভ্রুক্ষেপই করছে না।

গত বছর প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে উন্নত-অনুন্নত সারা বিশ্বের সব দেশই একটা সর্বসম্মত কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলো এবং একটা চুক্তিতেও আবদ্ধ হয়েছিলো। আশার বিষয় ছিল, যে দেশটাকে কেউ জোর করে সম্মত করাতে পারে না সে দেশটাও প্যারিস সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলো খোদ তার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাই প্যারিস সম্মেলনে এসেছিলেন। তিনি তার দেশে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে কিছু কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন। কিছু কিছু রাষ্ট্রীয় আদেশ নিষেধও আরোপ করেছেন।

বিশ্ব আবহাওয়া সম্পর্কে যখন গত ৮ নভেম্বর বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা মরক্কো সম্মেলনে দুর্ভাগ্যজনক রিপোর্ট পেশ করেছিলেন তখন বিশ্ববাসী আরেক হতাশাব্যঞ্জক খবর পেলেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। যিনি আবহাওয়া সংস্থার সব সতর্ক বার্তাকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি আগেভাগেই বলেছেন জলবায়ু সম্মেলনের প্যারিস চুক্তি তিনি মানবেন না এবং ওবামা জলবায়ু সম্পর্কে যে সব বিধিবিধান জারি করেছেন তার কিছুই তার সরকার অব্যাহত রাখবেন না। সব বাতিল করে দেবেন।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ভেঙে যাওয়ার পথ করে দিয়েছেন। কারণ এ সংস্থা রূপান্তর কার্যক্রমের দায়িত্ব দিয়েছেন জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সব কিছুকে অবজ্ঞা করে যে ব্যক্তি সেই মাইরন এবেলকে। যাকে নোয়াম চমস্কি কুখ্যাত ব্যক্তি বলে অবহিত করেছেন। ট্রাম্প তার জালানি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন হ্যারলন্ড হ্যামকে। তিনিও বলেছেন সব বিধি নিষেধ প্রত্যাহার করা হবে। ফসিল জ্বালানির অবাধ ব্যবহার পুনর্বহাল করা হবে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লা কোম্পানি পিবডি এনার্জি কয়দিন আগে দেওলিয়া ঘোষণার জন্য আবেদন করেছিলো। ট্রাম্পের বিজয় এবং কথাবার্তা শুনে এখন তাদের শেয়ারের দাম ৫০% বেড়েছে। বিশ্বের সব গবেষণা সংস্থা বলছে ফসিল জালানি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মারাত্মক ভূমিকা রাখছে এরূপ সনাক্ত করা বিষয়টিকে ট্রাম্পও তার উপদেষ্টারা হেলা-ফেলায় উড়িয়ে দিচ্ছেন। সুতরাং এদের হাতে পুরা বিশ্বটাই ধীরে ধীরে হয়ত অসহায় হয়ে পড়বে। কী অদ্ভুত ব্যাপার বিজ্ঞানে আমেরিকার এখনও উচ্চস্থানে অবস্থান অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প দল বদ্ধভাবে জলবায়ুর ব্যাপারে বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তকে অবহেলা করছেন।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের চেয়ারম্যান ক্লাউস শোয়াব বলেছেন বিশ্বায়ন বিশ্বকে আরও ছোট করে ফেলেছে আর পাশাপাশি তাকে খুবই জটিল করে তুলেছে। জটিল বুহ্যবেদ করার জন্য সস্তা কথা বলে বা আবেগে ঘা দিয়ে পথ চললে যে আরও কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হবে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা অনুধাবন করতে পারছেন না। জাতীয় শেকড়ে ফেরার সস্তা কথা, অভিবাসী তাড়াবার কথা বলে ট্রাম্প দুঃখী সাদাদের দলে ভিড়িয়ে দল বড় করতে পেরেছিলেন। নিজের বিজয়কে নিশ্চিতও করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকা যে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখী হয়েছে তা কিন্তু সহজ ও আশু সমাধানের কোনও উপায় নেই।

দীর্ঘ মেয়াদী লক্ষ্য ও পরিকল্পনা স্থির করে পথ চলতে হবে। আমেরিকার জনসাধারণ অভিজাতদের দ্বারা পরিচালিত শাসন কোনদিনই গ্রহণ করেনি কিন্তু আজও পর্যন্ত তারা পুঁজিপতিদের জন্যই সরকার এ হ্যামিল্টনীয় বিশ্বাস আঁকড়ে পড়ে আছে। হ্যামিল্টনের এ বিশ্বাস ২৪০ বছরের প্রাচীন বিশ্বাস। এ বিশ্বাস অকার্যকর হয়ে গেছে। এ বিশ্বাস ও পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন না আনলে জন অসন্তোষ আমেরিকার সমাজকে ভারাক্রান্ত করে ফেলবে। আমেরিকান সমাজ অচল হয়ে পড়বে।

আমেরিকার সমাজ পরিবর্তনের জন্য যে মৌলিক প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য ট্রাম্প উপযুক্ত কেউ নন। বারাক ওবামা যখন ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তখন লিমেন ব্রাদার্সসহ হাজার খানেক ব্যাংককে দেওলিয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সরকার ভতুর্কি সরবরাহ করে, ফোর্ডসহ বহু মটর কোম্পানিকে সরকারি অনুদান দিয়ে রক্ষা করা হয়। এতে দেখা যাচ্ছে যে বারাক ওবামার সময় ৯১% সরকারি আয় ১% ধনীলোকের পেটে গেছে। আর গরিব নিম্ন মধ্যবিত্তের কোনও উপকারেই সরকার আসেনি শুধু ওবামা কেয়ারে গরিব মানুষের স্বাস্থ্য সেবার কিছু উপকার হয়েছিলো তাও নাকি ট্রাম্প বন্ধ করে দেবেন।

ট্রাম্পকে নিয়ে বিশ্ববাসীর মাথাব্যাথার অন্ত নেই। তাকে নির্বিঘ্নে কাজ করতে দিলে বিশ্ব বহু সমস্যার বেড়াজালে আবদ্ধ হবে। আগামী ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করবেন। আর ওই দিনই বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ পালনের ডাক দেওয়া হয়েছে। শুধু আমেরিকায় নয় ইউরোপেও লাখ লাখ মানুষ প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেবে। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি ১ দিনের জন্য বহিরাগতরা কর্মবিরতি পালন করবে এবং বিশ্ববাসীকে তারা দেখাবে ইউরোপকে সচল রাখতে এবং অর্থনীতিকে সজীব রাখতে তাদের কত প্রয়োজন। মানুষের পক্ষ থেকে সম্মিলিত প্রতিরোধের ডাক আসতে হবে। না হয় এ অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করা কঠিন হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বশেষসর্বাধিক