৭ এপ্রিল ২০১৭ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর নিয়ে সাধারণ মানুষের একদিকে যেমন উৎসাহ রয়েছে আবার এক ধরনের উদ্বেগও লক্ষ করছি। ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশ। ভারতের চাওয়া পাওয়া আর বাংলাদেশের চাওয়া পাওয়া সমন্বয় করা খুবই কঠিন।
এটা প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি সফর। ২০১৫ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় সীমান্ত চুক্তি আর ছিটমহল বিনিময় চুক্তি কার্যকর করা হয়েছে। এ চুক্তিটি কোনও নতুন চুক্তি নয়। মুজিব-ইন্দিরাই এ চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। ভারতের লোকসভা এ চুক্তিটি অনুমোদন করেনি বলে এতদিন কার্যকর হয়নি। লোকসভা চুক্তিটি অনুমোদন দিতে ৪০ বছর সময় ক্ষেপন করেছে। অথচ বাংলাদেশ সংসদ ৪০ বছর আগেই চুক্তিটি অনুমোদন করেছিলো।
প্রতিবেশী বদলানো যায় না। কিন্তু প্রতিবেশী সমঝদার হলে অনেক কলহ এড়িয়ে চলা যায়। পরস্পর পরস্পরকে বিপদ উত্তরণে সহায়তা প্রদান করতে পারে। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ৭ রাজ্যে যে বিদ্রোহ ভারতকে বিব্রত করে রেখেছিল শেখ হাসিনার সরকারের গত ৮ বছরের সহাযোগিতার ফলে ভারত এখন সে বিদ্রোহ নিয়ে অনেকটা দুশ্চিন্তামুক্ত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির নেত্রী মনে করেন এই বিদ্রোহটা ওই সাত রাজ্যের স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি ক্ষমতাসীন থাকার সময় অস্ত্র সরবরাহে তাদেরকে সহযোগিতাও করেছিলেন। বাংলাদেশের মাটি ছিল বিদ্রোহিদের বিচরণ ক্ষেত্র।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় মূখ্য আলোচ্য বিষয় সম্ভবতো তিনটা। (১) তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, (২) গঙ্গা বাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গ আর (৩) সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের আকাঙ্ক্ষিত সামরিক চুক্তি বা সমঝোতা সই করা। তিস্তা নদী বাংলাদেশ-ভারতের অভিন্ন নদী। এ নদীর প্রবাহের ৪৮ শতাংশ পানির দাবিদার হচ্ছে বাংলাদেশ। এ নদীটি হচ্ছে ভারত বাংলাদেশে প্রবাহমান ৫৪টি নদীর মাঝে চতুর্থ বৃহত্তম নদী। এ নদীর প্রবাহের ওপর উত্তরবঙ্গের রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার সেচ ব্যবস্থা নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৭.৩% শতাংশ লোকের খাদ্য উৎপাদন এ নদীর প্রবাহের সঙ্গে জড়িত।
র্যাডক্লিফ-এর কাছে বাংলার প্রিমিয়ার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তিস্তার ক্যাসমেন্টের কথা বিবেচনা করে দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ী জেলাকে পূর্ববঙ্গের অন্তর্ভূক্ত করার দাবি পেশ করেছিলেন। কিন্তু হিন্দু অধ্যুষিত জেলা হওয়ায় র্যাডক্লিফ সে দাবি বিবেচনা করেননি। যাক পাকিস্তান আমলে পানি নিয়ে বেশি কথাবার্তা হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের পর গঙ্গায় ফারাক্কা ও তিস্তায় গজলডাঙা বাঁধ নির্মাণের কারণে পানি বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। ১৯৭২ সালে যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়েছিলো। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ও দেবগৌড়ার মাঝে দীর্ঘ ত্রিশ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানি চুক্তি সম্পাদিত হলেও তিস্তার ব্যাপারে কোনও স্থায়ী চুক্তি সম্পাদিত হয়নি।
ড. মনমোহন সিং যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন উভয় দেশের মাঝে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে একটা চুক্তির খসড়া হয়েছিলো। কিন্তু পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনাগ্রহের কারণে চুক্তিটি সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে বিপক্ষ হওয়ার কারণ হচ্ছে ভারতীয় সংবিধান নাকি রাজ্যের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হলে সে রাজ্যের মতামত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ভারতের সংবিধান রচনা করেছেন অম্বেদকরের নেতৃত্বে পাঁচশত আইনজীবী। ভারতীয় শাসনতন্ত্রকে আইনজীবীর শাসনতন্ত্র বলা হয়। এ কারণে শাসনতন্ত্রটি বেশ বড়। বহিঃরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও চুক্তির বিষয়ে কেন্দ্রকে রাজ্যের মুখাপেক্ষী করে রাখার কোনও বিধান এ শাসনতন্ত্রে থাকা কোনোভাবে সমীচীন হবে বলে মনে হয় না। কারণ বিজ্ঞ লোকেরাই এ শাসনতন্ত্রটি রচনা করেছিলেন। এখন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্র ইচ্ছা করলে পানি চুক্তি করতে পারে। শুধু ভূমি প্রদানের বিষয়ে রাজ্যের সম্মতি নিতে হয়।
সম্ভবতো মনমোহন সিং-এর সরকারের প্রতি তৃণমূলের সমর্থন ছিল। সমর্থন প্রত্যাহার করলে মনমোহন সিং-এর সরকারের পতন হতে পারে- হয়তোবা সে ভয়ে মনমোহন সিং স্ব-উদ্যোগে চুক্তিটি সম্পাদন করেননি। এখন তো নরেন্দ্র মোদির সরকার কারও সমর্থনের মুখাপেক্ষী নন। তিনি ইচ্ছা করলে চুক্তিটি সম্পাদন করা সম্ভব। তিনি আর শেখ হাসিনা চুক্তিটির খসড়া চূড়ান্ত করেই রেখেছেন। চুক্তিটি সম্পাদনের বিষয় মোদির সৎ ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ তার নিরাপত্তার কারণেই দুটা সাব-মেরিন কিনেছে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেনার পর ভারতীয় মহলে তার প্রতিক্রিয়া দেখে বাংলাদেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে ভারত সরকার যেভাবে তৎপর হলেন, কিছু বুদ্ধিজীবী যেখানে কথা বললেন- তাতে মনে হয়েছে বাংলাদেশের ডিফেন্স পারচেইজে ভারতের অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশ চরম অন্যায় করেছে। তারপর সামরিক চুক্তির বিষয় এজেন্ডায় আসল।
ক’দিন আগে আইবিএন, সিএনএন এবং দি হিন্দু পত্রিকা একটা যৌথ জরিপ কাজ সম্পাদন করেছে। জরিপের বিষয় ছিল ‘ভারতের বিশ্বস্ত রাষ্ট্র কে’? আটচল্লিশ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন ‘বিশ্বস্ত বন্ধু রাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশ’। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলাদেশের প্রতি আস্থা রাখলেন অথচ দু’টি সাবমেরিন কেনাতে সরকারি পর্যায়ে আস্থার অভাব দেখা দিল!
বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের গ্যাস কুপ পাশাপাশি। বাংলাদেশের মালিকানাধীন ১৫নং কুপে মিয়ানমার ড্রিলিং করার জন্য উদ্যত হয়েছিলো। ভারত টু-শব্দটি পর্যন্ত করেনি। ৭/৮ দিন দক্ষিণ সীমান্তে যুদ্ধাবস্থায় বিরাজ করেছিলো। মিয়ানমার রোহিঙ্গা নিয়ে এত অমানবিক আচরণ করলো- ভারত তো কোনও কথাই বলেনি এবং বলছে না। ভারতের উচিত ছিল এসব ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো, যেমন করে বাংলাদেশ ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ নিয়ে প্রকাশ্যে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী গত ১৫/২০ দিন যে বক্তব্য দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দিয়েছেন তাতে দেশের মানুষ আশস্ত হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সামরিক চুক্তি করানো সম্ভব হবে না। ভারতের তরফ থেকেও সামরিক চুক্তি হতে যাচ্ছে এমন কোনও কথা বলা হয়নি। তবে মিডিয়ার মতে সামরিক ক্ষেত্রে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সই হতে পারে। বিএনপি এখনই প্রচারণায় নেমেছে এই সফরে গোপন চুক্তি হচ্ছে অভিযোগ করে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল চুক্তির বিষয় জনসম্মুখে সব চুক্তি প্রকাশেরও দাবি করেছেন।
আগামী নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আশা এবং আস্থা আছে যে তিনি এমন কিছু করবেন না যাতে দেশের জনগণ হতাশ হয়। বরং দু’দেশের চলমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও আস্থা ও সহযোহিতার মধ্য দিয়ে আরও এগিয়ে যাবে এটাই চাই আমরা।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক



