বাংলাদেশে যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে তাদের প্রধান পীঠস্থান পাকিস্তান হয়ে সৌদি আরব। নানা পথ, মত ও আদর্শ থাকলেও দীর্ঘ সময় সবগুলো গোষ্ঠীই সৌদিদের আর্থিক ও অন্যান্য আনুকূল্য পেয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় সৌদি আরব এবং এদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসারে এবং রাজনীতিকে ধর্মীয় পথে ধাবিত করতে বিলিয়ন বিলিয়ন পেট্রোডলার খরচ করেছে দেশটি।
তবে সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু মৌলবাদী তাত্ত্বিক সৌদি আরবের মৃদু সমালোচনা করতে শুরু করেছে। এখন সৌদি রাজতন্ত্র ইসলাম সম্মত নয় বলে তত্ত্ব হাজির করা হচ্ছে, যদিও এই রাজতন্ত্রের অর্থেই বাংলাদেশে ফুলে ফেঁপে উঠেছে এদের রাজনৈতিক জগৎ এবং আর্থিক খাত। এর কারণ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সংস্কার কর্মসূচি। বিশ্ব প্রেক্ষাপট বুঝতে পেরে দেশ পরিচালনায় পরিবর্তন আনছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। এবং কিছুটা কঠোর পথেই হাঁটছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি বলেছেন তার ‘ভিশন ২০৩০’ এর পথ ধরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরে যেসব সংস্কার কর্মসূচি ভাবা হচ্ছে সেখানে কোনও ধর্মীয় তাত্ত্বিক ফতোয়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ধর্মীয় উন্মাদনা, গোঁড়ামি আর কঠোরতার জন্য খ্যাত সৌদি আরব। তবে দেশটির যুবরাজ ভাবছেন কী করে ধর্মকে রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলা যায়, কিংবা এর প্রভাব কমিয়ে আনা যায়, কী করে নারীদের ঘর থেকে বাইরে এনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানো যায়। তিনি যখন এসব ভাবছেন, তখন আমাদের এখানে ঘটছে উল্টো। আরও বেশি প্রতিক্রিয়াজীবী হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শুধু 'তেঁতুল হুজুর' নয়, ফতোয়া আসছে আরও অনেকের কাছে থেকে যাদের কাছ এসব কেউ প্রত্যাশা করেনি কখনও।
দেখার বিষয় ৩১ বছরের এই যুবরাজ কতটা সফল হতে পারবেন শেষ পর্যন্ত। অর্থনৈতিক অনেক কর্মসূচির বাইরে মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছে এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার পাচ্ছে বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। সৌদি আরবে মিউজিক কনসার্ট ও চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ। তিনি চান এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসুক তার দেশ। চান বেশি করে পর্যটক আসুক এবং তাদের জন্য তাদের উপযোগী পর্যটন পণ্য চালু হোক। প্রাইভেট সেক্টর থেকে উদ্যোক্তা খুঁজছেন বিনোদন বিনিয়োগ বাড়াতে।
বলতে হবে কঠিন চ্যালেঞ্জই তিনি নিয়েছেন। কারণ দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে রাজ পরিবাবের সাথে ক্ষমতা ভোগ করে আসছে মৌলবাদী তাত্ত্বিক চক্র, যারা চাইবে না খোলা হাওয়ার শুরু হোক এই তেল সমৃদ্ধ দেশটিতে। আর তেল নির্ভর অর্থনীতি তথা তেল আসক্তি থেকেও বেরিয়ে আসতে চান যুবরাজ সালমান। কর বাড়িয়ে, ভর্তুকি কমিয়ে, সরকারি ব্যবসা বাণিজ্য গুটিয়ে সব ছেড়ে দিতে চান ব্যক্তিখাতের কাছে। কঠিন কাজই বলতে হবে। কঠিন এ কারণে যে, সৌদি আমলাতন্ত্রে তিনি চালু করেছেন দক্ষতা ও দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি।
এমন বাস্তবতায় সব কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ফতোয়াবাজদের ব্যবহারের চেষ্টা করছে এবং নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। নারীরা গাড়ি চালাতে পারবে কিনা, বা সিনেমা দেখা যাবে কিনা এ নিয়ে ঘর্মাক্ত হচ্ছে দেশটির মৌলবাদী তাত্ত্বিকরা। অথচ সুদীর্ঘকাল ধরে সৌদিরা পশ্চিমা গণমাধ্যম আর সংস্কৃতির বড় গ্রাহক। সিনেমা হল না থাকলেও ঘরে ঘরে হলিউডের চলচ্চিত্র, পশ্চিমা টিভি সিরিয়াল দেখা হয় এবং সামাজিকভাবে আলোচনার বিষয়ও পশ্চিমা সিনেমা, গান, সিরিয়াল এবং ফ্যাশন। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ইউটিউব দেখা হয় সৌদি আরবে। এমনকি পর্ন ফিল্মও বেশি দেখা হয় দেশটিতে।
সৌদি যুবরাজের এমন উদ্যোগের পর তরুণদের মধ্যে ভিডিও ফিল্ম তৈরির প্রবণতা বাড়ছে এবং সেগুলো ইউটিউবে সাড়াও ফেলছে। এমনকি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়ও যাচ্ছে কোনও কোনও ফিল্ম।
মোহাম্মদ বিন সালমান সংস্কৃতি আর বিনোদন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের কথা উচ্চারণ করতে গিয়ে বলেন, মেধাবী লেখক ও পরিচালকদের রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা দেবে। দেশটিতে সিনেমা নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি তার মাথায় থাকলেও তিনি বিকল্প পথ খোঁজেন।
মোহাম্মদ বিন সালমানের ভয় ইসলামি তাত্ত্বিকদের নিয়ে। তবে তিনি মনে করেন এদের বেশিরভাগই গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসবে। শিক্ষার মান বাড়তে থাকায় বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ সৌদি তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব পশ্চিমা কারিকুলামে পরিচালিত। সৌদি আরবে এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় শিক্ষা। যুবরাজ সালমান এর মধ্যেই বাস্তবায়ন করেছেন নতুন পদ্ধতি। এখন থেকে সৌদি আরবের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন তা বিশ্ব বাজারের উপযোগী হয়। আর এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সেসব সৌদি নাগরিকদের যারা পশ্চিমা দেশগুলোতে উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন। খোদ সৌদিতে যখন এই অবস্থা, তখন আমরা কওমি পথে রওয়ানা দিয়েছি।
সৌদি আরব এমন এক রক্ষণশীল সমাজ, যেখানে কঠোরভাবে ওয়াহাবি ইসলাম চর্চা হয়, যেখানে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, যেখানে সিনেমা হল, কনসার্ট নিষিদ্ধ; সেখানে নারীর ক্ষমতায়ন, খেলাধুলায় প্রণোদনা দেওয়া, বিনোদনে বিনিয়োগ করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগুচ্ছেন সালমান। যুবরাজ কতটা সফল হবেন তা সময়ই বলবে। তবে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে যাত্রা করেছে দেশটি, একটুকু নিশ্চয়ই বলা যায়।
লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি



