বান্দা পাপমুক্ত হয়ে তার দরবারে হাজির হোক এটা আল্লাহ তায়ালার একান্ত চাওয়া। এজন্য তিনি বান্দাদের পরিশুদ্ধির জন্য বিশেষ কিছু উপলক্ষ তৈরি করে দিয়েছেন। এসব উপলক্ষে ইবাদত করলে, আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তা বৃথা যায় না। অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে এসব মুহূর্তের ইবাদত আল্লাহর কাছে অনেক গুণ বেশি গ্রহণযোগ্য। লাইলাতুল কদর বা শবে কদর এসব উপলক্ষের অন্যতম। এই রাতে ইবাদত-বন্দেগি করে হাজার মাসের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জন করা সম্ভব।
‘লাইলাতুল কদরের’ শাব্দিক অর্থ সম্মানের রাত। এ রাতে যেহেতু উম্মতে মোহাম্মদির সম্মান বৃদ্ধি করা হয় এজন্য এর নাম লাইলাতুল কদর। এ রাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আমি এ কোরআনকে কদরের রাতে নাজিল করেছি। আর কদরের রাত সম্পর্কে আপনার জানা আছে কি? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সে রাতে ফেরেশতা ও রূহ তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রতিটি হুকুম নিয়ে (দুনিয়ায়) নেমে আসে। ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত ওই রাতটি পুরোপুরি শান্তিময়।’ (সুরা কদর)
লাইলাতুল কদর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রাত হলেও তা নির্দিষ্ট নয়। রমজানের শেষ দশকের যেকোনও বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর হতে পারে। তবে হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী ২৬ রমজান দিবাগত রাতটি পবিত্র লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বছরের যে কয়টি দিন ও রাত বিশেষভাবে মহিমান্বিত, এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ হলো এই শবে কদর। পবিত্র রমজানের এ রাতে লাওহে মাহফুজ থেকে নিম্ন আকাশে মহাগ্রন্থ আল কোরআন অবতীর্ণ হয়। অসংখ্য হাদিসে শবে কদরের ফজিলত ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি লায়লাতুল কদরে ইমানের সঙ্গে সওয়াব লাভের আশায় ইবাদত করে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।’ (বুখারি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) পুরো রমজান, বিশেষত রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদরের অন্বেষায় ব্যাকুল হয়ে ওঠতেন। পরিবার-পরিজন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও লাইলাতুল কদর তালাশ করতে বলতেন। হজরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ- আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কী করবো? তিনি বললেন, তুমি এ দোয়াটি বেশি বেশি পড়বে- ‘আলহুম্মা ইন্নাকা আফউব্বুন, তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফুআন্নী-হে আল্লাহ! নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেন, অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন।’ [বুখারি]
লাইলাতুল কদর উম্মতে মোহাম্মদির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আর কোনও নবীর উম্মতকে এ ধরনের ফজিলতপূর্ণ রাত বা দিন দান করা হয়নি। আগের যুগের উম্মতেরা অনেক আয়ু পেতেন। সে জন্য তারা অনেকদিন ইবাদত করারও সুযোগ পেতেন। সে তুলনায় উম্মতে মোহাম্মদির আয়ু নিতান্তই কম। এজন্য আল্লাহ তায়ালা তার বিশেষ দয়ায় মহানবীর (সা.) উম্মতকে মহিমান্বিত এ রাত দান করেছেন। যারা এ রাতে ইবাদত করে কাটাবেন তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। এ রাতে নির্দিষ্ট কোনও ইবাদত নেই। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ, তাসবিহ-তাহলিল, দান-সদকা সবই এ রাতে করা যায়। আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গে যেকোনও ইবাদত করলে অভাবনীয় প্রতিদান পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
লাইলাতুল কদরের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বান্দা যাতে এ রাতে ইবাদতের সুযোগ কোনোভাবেই নষ্ট না করে সেজন্যই বোধহয় আল্লাহ তায়ালা এ রাতটি নির্দিষ্ট করেননি। কেননা আল্লাহর উদ্দেশ্য হচ্ছে বান্দা যেন রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে ইবাদতে মশগুল হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। বান্দা ঘুমকে বিসর্জন দিয়ে আরামকে হারাম করে একমাত্র আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্বেলিত হবে, রমজানের প্রতিটি রাতকেই লাইলাতুল কদর মনে করে ইবাদত করবে- এটাই উদ্দেশ্য। পৃথিবীতে যা দুর্লভ তাই মূল্যবান। আল্লাহ এ ফর্মুলার দিকে বান্দাকে ধাবিত করার জন্য কদরের রাতকে নির্দিষ্ট না করে রহস্যাবৃত রেখেছেন। বান্দা যেন তার মূল্যবান সময় শ্রম ও জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ রাতের সন্ধানে মনোনিবেশ করে সেটাই আল্লাহ চান।
এই রাতের আমল ও দোয়া:
কদরের রাতে কী আমল করা যায়-এরকম জিজ্ঞাসা অনেকের। এ রাতের ফজিলত এবং আমলের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। তবে কোরআন তেলাওয়াত, বেশি বেশি দোয়া, দান-সদকা, তাসবিহ-তাহলিল, কবর জিয়ারত ইত্যাদি আমল করা যেতে পারে এ রাতে। লাইলাতুল কদরে বেশি বেশি নফল নামাজ আদায়ের কথা বলা হয়েছে। শবে কদরে ইবাদতের প্রস্তুতি হিসেবে গোসল করা সওয়াবের কাজ। মাগরিবের নামাজের পর দুই রাকাত নফল নামাজের কথা বলা হয়েছে। এ রাতে তারাবি তো পড়তে হবেই; তাহাজ্জুদের নামাজও গুরুত্বের সঙ্গে পড়তে হবে। এ ছাড়া সালাতুল তওবা, সালাতুল হাজত, সালাতুল তাসবিহ নামাজও পড়া যায়। এই রাতে কোরআন তেলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। পবিত্র এই রাতেই মহাগ্রন্থ আল কোরআন অবতীর্ণ হয়। এজন্য কোরআনের সঙ্গে এই রাতের সম্পর্ক ওৎপ্রোত। অন্য যে কোনও সময়ের তুলনায় এ রাতের তেলাওয়াতের ফজিলত বেশি।
আত্মসমালোচনা বা আত্মবিচার এ রাতের বিশেষ আমল। আমরা নিজেই নিজের পর্যালোচনা করি জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোতে আল্লাহর কতগুলো বিধান অমান্য করেছি। আল্লাহর ফরজ ও ওয়াজিবগুলো কতটা পালন করেছি এবং তা কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে করেছি। ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় কী কী বড় গোনাহ আমরা করে ফেলেছি। এ রাতে নীরবে-নিভৃতে এ বিষয়গুলো ভাবতে হবে। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্য (পরকাল) সে কী প্রেরণ করেছে তা চিন্তা করা। [সুরা হাশর-১৮]
এই রাতে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চাইতে হবে। এ রাতের মোনাজাত আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষ আল্লাহর কাছে যত চায় আল্লাহ তত খুশি হন। কাজেই এ রাতে আমরা কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করবো, ক্ষমা চাইব, রহমত চাইব, জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইব। মনের আবেগ নিয়ে চাইব। চোখের পানি ফেলে চাইব। আল্লাহ আমাদের হাত খালি হাতে ফেরাবেন না। যথাযথ ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে কাটাতে পারলে একটি রাতই হতে পারে আমাদের জীবনে সাফল্যের কারণ।
আল্লহ তায়ালা তার বান্দাদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। তিনি চান প্রত্যেক বান্দা যেন পূত-পবিত্র হয়ে তার দরবারে হাজির হয়। বান্দাদেরকে গোনাহ ও পাপমুক্ত করার জন্য লাইলাতুল কদর একটা বিশেষ উপলক্ষ। এটাকে যারা কাজে লাগাবে তারা সফল। আর যারা অবহেলা করবে তারা বড়ই দুর্ভাগা। তাই প্রত্যেকের উচিত ইবাদতের মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম



