বীর মুক্তিযোদ্ধাও হতে পারেন ধর্মীয় মৌলবাদী আর কুৎসিত নারীবিদ্বেষী

তসলিমা নাসরিন
২২ মার্চ ২০১৮, ২১:১৭আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৮, ০১:২৬

তসলিমা নাসরিন ছোটবেলায় কাদের সিদ্দিকীর বীরত্বের গল্প শুনে মুগ্ধ হয়েছি কত। তার যুবক বয়সের খাকি পোশাক পরা অস্ত্র হাতের সেইসব ছবি দেখে শ্রদ্ধায় নত হতো চোখ। যুদ্ধ করে দেশের জন্য স্বাধীনতা এনেছেন যে সাহসী মানুষটি, তার নাম উচ্চারণ করলেই বুক ভরে উঠতো গৌরবে। নব্বই দশকের শুরুর দিকে, গল্পকার পূরবী বসু আমাকে একদিন বললেন, কাদের সিদ্দিকীর ছোটবোন রহিমা সিদ্দিকী তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান। আমি ছুটে যাই পূরবী বসুর বাড়িতে। কেন অমন উত্তেজিত ছিলাম, রহিমা সিদ্দিকী, যাকে আমি চিনি না জানি না, তার সঙ্গে দেখা করার জন্য? পূরবী বসু আমাকে বলেছেন বলে নয়, সত্যি কথা বলতে, রহিমা কাদের সিদ্দিকীর বোন বলে। দীর্ঘকাল রহিমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব টিকে ছিল। তার কাছে প্রায়ই জানতে চাইতাম, কাদের সিদ্দিকী কী করছেন, কেমন আছেন। মানুষটিকে কোনোদিন দেখিনি, কিন্তু কী অপরিসীম শ্রদ্ধা ছিল মানুষটির জন্য। আসলে শত শত মুক্তিযোদ্ধার ভিড়ে আসল মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া মুশকিল, এই সময় আমরা জানি, আর কেউ না হোক, কাদের সিদ্দিকী আসল মুক্তিযোদ্ধা। তার দেশপ্রেম, তার বীরত্ব, তার সাহস, তার আত্মত্যাগ– এসব নিয়ে আমার মনে হয় না তার শত্রুরও কোনও সংশয় জাগে।
অথচ এই কাদের সিদ্দিকী যে আস্ত একটি মৌলবাদী আর নারী বিদ্বেষী লোক, তা কি আমরা কখনও কল্পনাও করতে পেরেছি! একাত্তরে তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে যেতে বলা হয়েছে, গিয়েছে। ক’জন তরুণ আর সত্যিকার জানতো আমরা যে স্বাধীনতা চাই, সেই স্বাধীনতাটা ঠিক কী রকম। আমরা চাই না আমাদের ওপর অন্যের ভাষা বা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হোক। আমরা আমাদের নিজের ভাষায় কথা বলবো, আমাদের সংস্কৃতি আমরা চর্চা করবো। আমরা হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান এক জাতি হয়ে বাস করবো এক দেশে, এক সমাজে। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। এই স্বাধীনতা আমরা নারী পুরুষ উভয়ে উপভোগ করবো। ধর্মের নামে শোষণ-নির্যাতন আর চলবে না, উঁচু জাত- নিচু জাত চলবে না, নারীর সমানাধিকার আর সমতার সমাজ আমাদের চাই।




যৌবনের সেই কাদের সিদ্দিকীকে বর্তমানের কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আমি মেলাতে পারি না। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা এখন আগাগোড়াই এক কাঠমোল্লা। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঘোর বিরোধী, ধর্মের নামে যারা শোষণ নির্যাতন করেন, দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ না বানিয়ে বানাতে চান দ্বিতীয় পাকিস্তান বা দ্বিতীয় সৌদি আরব– সেই ধর্মীয় মৌলবাদিদের সঙ্গে কাদের সিদ্দিকী বন্ধু পাতিয়েছেন। তাদের মতোই তিনি নারী বিদ্বেষী। এত কুৎসিত নারী বিদ্বেষী আজকাল সহজে মেলে না। একবিংশ শতাব্দিতে মানুষ এইটুকু অন্তত অনুধাবণ করতে পারছে নারীকে অপমান করা, অপদস্থ করা, নারীকে হেয় করা, অসম্মান করা কোনও ভদ্রলোকের কাজ নয়। কিন্তু আমাদের বীর পুরুষের এই সামান্য জ্ঞানটুকুই নেই। তিনি কি আদৌ কোনও ভদ্রলোক?
তিনি এক মৌলবাদি সভায় ভাষণ দিয়েছেন, দিব্যি বললেন, ‘পুরুষের শাসন’ কায়েম না হলে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হতে পারে না’। বললেন, ‘নারী নেতৃত্ব থাকলে দেশে আল্লাহর রহমত বর্ষণ হয় না’। আরও বললেন, ‘আমাদের দেশে খালি নারী নারী আর নারী। এই দেশে আল্লাহর রহমত বর্ষণ হতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত এই দেশে পুরুষের শাসন কায়েম না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর কোনও রহমত এখানে পৌঁছতে পারে না। আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে তা বিশ্বাস করি।’

নারী নেত্রীর অধীনে থেকে দীর্ঘদিন রাজনীতি করে আসা কাদের সিদ্দিকী এখন নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে না পারায় ইসলামি দলগুলোরও সমালোচনা করেন। তিনি ইসলামি দলগুলোকে নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে চাইছেন। ইসলাম ধর্ম নারী নেতৃত্ব মানে না, সুতরাং ধর্মকে তিনি ব্যবহার করছেন নারীবিরোধিতার কাজে। কাদের সিদ্দিকী সরাসরিই ঘোষণা করেছেন তিনি নারী নেতৃত্ব মানেন না। তিনি কিন্তু বলেননি, তিনি হাসিনা বা খালেদাকে মানেন না। তিনি নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস করেন না, নারীকে অযোগ্য বলে মনে করেন, নারীকে পুরুষের চেয়ে নিম্নমানের জীব বলে মনে করেন, তাই নারী কোনও কিছুতে নেতৃত্ব দিক, নারী দলের বা দেশের নেত্রী হোক, তা তিনি চান না। গোটা নারীসমাজ নিয়ে তার এ-ই ধারণা। ইসলামি দলগুলোকে বলেছেন– ‘আমি আপনাদের মতো সকালে জিহাদের ডাক দেব, রাতে প্রত্যাহার করব, ওই ধরনের চরিত্র আল্লাহ আমাকে দেননি’। তিনি কি বোঝাতে চাইছেন, তিনি যদি জিহাদের ডাক দেন, তাহলে সে ডাক তিনি প্রত্যাহার করবেন না? তিনি চান ইসলামি দলগুলো জিহাদের ডাক যেন প্রত্যাহার না করেন। ওদের তিনি জিহাদ চালিয়ে যেতে বলছেন।

শেখ হাসিনা মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চালাচ্ছেন না বলে কাদের সিদ্দিকী অভিযোগ করেছেন। একজন ঈমানদার তিনি, তাই তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে চলতে পারেননি। মদিনা সনদ সম্পর্কে কাদের সিদ্দিকী ভালো জানেন। কাদের সিদ্দিকী যদি মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চালানো হোক চান, তাহলে একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধই বা তিনি করেছিলেন কেন? কাদের সিদ্দিকী তাহলে সেই সব তরুণদের একজন, যাদের জানা ছিল না তারা কী কারণে একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, কী চায় তারা, কী তাদের স্বপ্ন। তুমি যদি তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নাও, যার আদর্শকে নিজের আদর্শ বলে মানো, তাহলে ভুল তোমার ওই গোড়াতেই হয়েছে। আমি তো একাত্তরের শত্রু রাজাকার আল বদরদের সঙ্গে কাদের সিদ্দিকীর ভাবনা চিন্তার কোনও ফারাক দেখতে পাচ্ছি না!

কাদের সিদ্দিকী যে সভায় ভাষণ দিয়েছেন, সেই সভার সভাপতি বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির বলেছেন, ‘দেশ এখন চরম একটা কুশাসনের কবলে পড়েছে। দেশে শান্তির শাসন কায়েম করতে হলে মুসলিম অমুসলিম এক হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশে ইসলাম শাসন কায়েম করতে হবে।’
কাদের সিদ্দিকীরা ইসলাম শাসন কায়েম করতে চান। পাকিস্তানও এই দুঃস্বপ্ন দেখে না। সৌদি আরবও ধীরে ধীরে উদারপন্থা গ্রহণ করছে। কেবল কিছু কট্টরপন্থী সন্ত্রাসীরা ইসলাম শাসনের স্বপ্ন দেখে। কাদের সিদ্দিকী গংদের স্বপ্নের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন যারা দেখে, তারা নিশ্চিতই নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করে, কাদের সিদ্দিকীও করছেন।
কাদের সিদ্দিকী শুনেছি শেখ মুজিবুর রহমানকে খুব ভালোবাসতেন। এই বুঝি তার ভালোবাসার নমুনা! বাহাত্তরে দেশের যে সংবিধান শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে তৈরি হয়েছিল, তাতে যা ছিল, তার কিছুই কাদের সিদ্দিকী মানেন না। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এই চারটি ছিল রাষ্ট্রের স্তম্ভ। কাদের সিদ্দিকী গণতন্ত্র মানেন না বলেই নারীদের নেত্রী হওয়ার যে গণতান্ত্রিক অধিকার, তা মানেন না। সমাজতন্ত্র মানেন না বলেই নারীর সমানাধিকার মানেন না। ধর্মনিরপেক্ষতা মানেন না বলে মদিনা সনদে দেশ চালাতে চান বা ইসলামি শাসন কায়েম করতে চান। বাঙালি জাতীয়তাবাদ মানেন না বলে ধর্মবাদের চাষ চান।
মানুষের অধঃপতন হয় জানি। কাদের সিদ্দিকীর এই অধঃপতন বড় ভয়ংকর। তার ঘৃণ্য মানসিকতাকে এইবার একযোগে বয়কট করা উচিত। উনি যত বেশি ভাষণ দেবেন, যত বেশি তার জিহাদি মতবাদ প্রচার করবেন, তত দেশের ক্ষতি করবেন, তত দেশের মানুষকে নষ্ট করবেন। কাদের সিদ্দিকী কোনও এক কালে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন। এখন দেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্য কাদের সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে লড়াইটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বশেষসর্বাধিক