মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয় চাই–একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যখন এই দাবিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো তখন মনের ভেতর বারবার একই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রশ্নটা হলো– প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ তো মুক্তিযুদ্ধ করেই স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও কেন বলতে হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয় চাই। তার মানে কি এই দাঁড়ায় না সময়ের ব্যবধানে আবার দেশে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি মাথাচাড়া দিয়েছে। তাদের পরাজিত করতেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয় চাই।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়েছে। একটানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একমাত্র রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। সবার প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। ক্রিকেটের ভাষায় যাকে বলে হ্যাটট্রিক। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ অপার আনন্দে ভাসছে। জয় হয়েছে, বাংলার জয় হয়েছে... জয় হয়েছে, জয় হয়েছে বাংলার মানুষের জয় হয়েছে... বাংলার জয় এবং বাংলার মানুষের জয় তো একই কথা।
তবুও বাংলার মানুষের কথা আলাদা করে বলছি এই জন্য যে, মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলেই এই দেশের সাধারণ মানুষ বিনা বাক্যব্যয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। যেমন এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিপুল ভোটে জয়ী করেছে। দেশের মানুষ তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে ভুল করেনি। এজন্য সবার আগে ধন্যবাদ দিতে চাই দেশের সাধারণ মানুষকে। যারা এবার ভোট দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার পক্ষে কোনও আপস নেই।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আবারও প্রমাণ করেছে দেশের সাধারণ মানুষ চাইলে কী না পারে। নির্বাচনের আগে দেশের সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার কত কূটকৌশলই না চালানো হয়েছে। কেউ কেউ দেশের বাইরে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে অতিমাত্রায় তৎপর ছিলেন। বিদেশ থেকে অর্থ পাঠিয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ ভুল করেনি। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকেই বিপুল ভোটে জয়ী করে দেখিয়ে দিয়েছে এই দেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের আর কোনও ঠাঁই নাই। এজন্য আরেকবার তাদের প্রতি অভিনন্দন বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাই। প্রিয় দেশবাসী, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অনেক অভিনন্দন, অনেক শুভেচ্ছা।
এই যে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের কথা বলছি সেটা আসলে কী? প্রিয় পাঠক, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে বিবেকের আয়নায় শুধুমাত্র একটা দৃশ্য দেখাতে চাই। দেখুন তো ওরা কারা এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন? চিনতে পারছেন নিশ্চয়ই? সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সদস্যরা জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। ভাবুন তো একবার– ওরা যদি জয়ী হতো তাহলে দেশের অবস্থাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো? দেশটাকে লণ্ডভণ্ড করে ছাড়তো। নির্বাচনের আগে জাতীয় পর্যায়ের তথাকথিত নেতাদের কিছু ভিডিও সংলাপ শুনে যারপরনাই শঙ্কিত হয়েছি। কী ভয়াবহ ভিডিও সংলাপ। যেকোনও উপায়ে দেশের ক্ষমতা গ্রহণ করতে তারা বদ্ধপরিকর। আগুন সন্ত্রাসের ভয়াবহ বার্তাও অনেক নেতা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এক্ষেত্রে আবারও কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয় দেশের সাধারণ মানুষকে। তারা কোনও প্রলোভনের ফাঁদেই পা দেয় নাই। বরং সব প্রলোভনকে উপেক্ষা করে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছে। সঠিক সিদ্ধান্তটি হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকেই আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এনেছে।
এবার আমাদের এই মাতৃভূমির ভবিষ্যৎ চিত্রটা কেমন হতে পারে একবার কল্পনা করুন তো। ভোট দিয়েছি সুখে থাকার জন্য, শান্তিতে থাকার জন্য। কাজেই দেশে একটা সুখ-শান্তির পরিবেশ বিরাজ করবে। বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। সমাজে সন্ত্রাসের আতঙ্ক থাকবে না। দ্রব্যমূল্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। ধনী-গরিবের বৈষম্য কমে যাবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে অন্যায় ও দুর্নীতি কমে যাবে। সর্বোপরি দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা আগের মতোই অব্যাহত থাকবে। মোটা দাগে এটাই তো দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
আরও স্পষ্ট করে বলি, দেশের সাধারণ মানুষ অনেক সহজ সরল। মোটা চাল আর মোটা কাপড় পেলেই তারা খুশি। আর চায় সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মান। আমাদের দেশে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক অনেক কথা ছড়ানো আছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ভোট এলেই জাতীয় পর্যায়ের নেতানেত্রীরা দেশের সাধারণ মানুষকে অনেক গুরুত্ব দেন। কর্দমাক্ত কৃষককে জড়িয়ে ধরে ভোট চান। বিধবার ভাঙা ঘরে বসে ভাতও খায় অনেকে। কিন্তু ভোট শেষে নেতাদের অনেকেই আর ভোটারদের কথা মনে রাখেন না। বরং ভোটারদের জঞ্জাল ভেবে এড়িয়ে চলেন। এবারের নির্বাচনে যারা জনগণের প্রতিনিধি হয়েছেন, আশা করি তারা সাধারণ জনগণের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রাখবেন। তাহলেই দেশটা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সগৌরবে এগিয়ে যাবে।
এবার একটি প্রত্যাশার কথা বলি। সুন্দর সকাল। কবির সাহেব বাসা থেকে বের হতেই দেখলেন একটি অটোরিকশা তার সামনে এসে দাঁড়ালো। কবির সাহেব তার অফিসের ঠিকানা বললেন। অটোরিকশার ড্রাইভার মিটার চালু করে দিয়ে অটোরিকশার দরজা খুলে দিলো। বড় রাস্তায় নেমে অবাক হলেন কবির সাহেব। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা প্রচুর। কিন্তু কোনও যানজট নেই। অন্যান্য দিনে বাসা থেকে অফিসে পৌঁছাতে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে। অথচ আজ ১৫ মিনিটেই অফিসে পৌঁছে গেলেন। অফিসে ঢুকেই অবাক হলেন কবির সাহেব। তার আগেই অফিসের সবাই অফিসে এসে যার-যার টেবিলে ডেস্কে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। অহেতুক কোনও আড্ডা বাজি হচ্ছে না। অন্যান্য দিনে বিকাল ৫টায় অফিস ছুটির এক ঘণ্টা আগেই সবাই অফিস ত্যাগ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। অথচ আজ বিকালে ৫টার পরও অফিস গম গম করছে। অনেকের নির্ধারিত কাজ শেষ হয়নি। কাজ শেষ না করে অফিস ত্যাগ করবেন না। সবকিছু অবাক লাগছে কবির সাহেবের। বিকাল সাড়ে ৫টায় অফিস থেকে বের হলেন কবির সাহেব। ভাবলেন মেট্রোরেলে করে বাসায় ফিরবেন। অফিসের পাশে মেট্রোরেলের স্টেশন। টিকটি কিনে মেট্রোরেলে চেপে বসলেন। মাত্র ৫ মিনিটে বাসার পাশের স্টেশনে এসে নামলেন। এবার হেঁটেই বাসায় ফিরলেন তিনি। কবির সাহেবের স্ত্রীও অফিস থেকে ফিরেছেন। সঙ্গে ব্যাগভর্তি বাজার এনেছেন। স্বামীকে দেখেই খুশি হয়ে বললেন, এই জানো, আজ বাজারে সবকিছু অনেক সস্তায় পেলাম। দোকানদারদের ব্যবহারও বদলে গেছে। জানো, বাজারে গেলে আমি মেজাজ ধরে রাখতে পারি না। অথচ আজ আমিও দোকানদারদের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলেছি।
কবির সাহেব স্ত্রীকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, আজ অফিসে আমিও কারও সঙ্গে চড়া গলায় কথা বলিনি। কেন বলিনি জানো? আমাদের অফিসটা হঠাৎ যেন বদলে গেছে। অ্যাই, আমরা স্বপ্ন দেখছি নাতো! স্বামী-স্ত্রী দুজনই পরস্পরকে চিমটি কেটে দেখলেন আসলেই তারা স্বপ্ন দেখছিলেন।
প্রিয় পাঠক, এত বড় বিজয়ের পর এরকম ছোট ছোট স্বপ্নগুলোই বাস্তবে রূপ নিক। প্রিয় দেশ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আরও এগিয়ে যাক এই হোক আমাদের সমবেত প্রার্থনা। জয় বাংলা, বাংলার জয় হোক....।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো


