করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ২০০৮ সালের পর বিশ্ব স্টক মার্কেট সবচেয়ে ভয়াবহ পতনের সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের দরপতন ঘটেছে শেয়ারের। বাজার সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই ভাইরাস এমনিতেই নাজুক থাকা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ঝাঁকুনি দিতে পারে। এই আশঙ্কা ভিত্তিহীন নয়।
কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ছে
গত সপ্তাহের শেষদিক থেকে করোনা ভাইরাসের নতুন সংক্রমণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়াচ্ছে। যদিও সংখ্যাটা খুব বড় আকারের নয়, তবে তা যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে বিশ্বজুড়ে মহামারির আশঙ্কা রয়েছে। এই সময়ের আগে নতুন সংক্রমণের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছিল। চীনে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সংক্রমণের পরিমাণ মাত্র ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অনেকে তখন ধারণা করছিলেন, ভাইরাসটিকে মোকাবিলায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া গেছে। কিন্তু তার পরপরই নতুন করে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং ইতালিতে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, চীন ছাড়াও অন্যান্য দেশের নাগরিকরা নিজ দেশেই এ ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে ৬০০-এর মতো লোক এ ভাইরাসে নিজ দেশেই আক্রান্ত হয়েছেন বলে বিশ্বাস করছেন (দেশটিতে আরও ১,১০০ জন সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন)। জাপানে এ সংখ্যাটা ১২৯। ইতালিতে আবার সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ১২১-এ, আরও ২৭৬ জন সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। ভয়ের বিষয় হচ্ছে, চীনে যে রোগের আর্বিভাব, সে রোগ এখন আরও দেশে ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চীনের বাইরে ৫৯টি দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। বাস্তবতা হলো, এর ভয়াবহতা অনুমান করা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা মাইকেল রায়ান বলছেন, ‘এ ভাইরাসটি স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, অথবা মৌসুমি রোগের আকার ধারণ করতে পারে কিংবা পুরোদমে বিশ্বব্যাপী ছড়াতে পারে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বলা যাচ্ছে না, প্রকৃত অর্থে কী ঘটতে যাচ্ছে।’ তবে ওই সংস্থার একটি তথ্য আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তারা জানাচ্ছে, চীন এবং হুয়ান প্রদেশের বাইরে এ ভাইরাসে মৃত্যুহার অনেক কম (চীনে যেখানে ৩ শতাংশ, অন্যত্র তা ০.৭ শতাংশ)।
বিশ্ব অর্থনীতিকে ধাক্কা দিচ্ছে
এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিও আক্রান্ত হচ্ছে। এমনিতে যেখান থেকে ভাইরাসটির উৎপত্তি, সেই হুবেই প্রদেশ গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, বিমানের সরঞ্জাম, প্রতিরক্ষা এবং নির্মাণ ব্যবসার বড় কেন্দ্র। কিন্তু এ ভাইরাসের ক্ষতি এখন হুবেই ছাড়িয়ে বহুদূর প্রসারিত। মাইক্রোসফট, অ্যাপল, গাড়ি কোম্পানি এবং এয়ারলাইনসগুলোর ব্যবসার অনেকটা পতন সাধিত হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জে উল্লেখযোগ্য দরপতন ঘটেছে। ব্যাংক অব আমেরিকা তার ইউরোজোন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৬ শতাংশ করেছে। ক্রেডিট সুইস তার পূর্বাভাস ০.৯ শতাংশ থেকে কর্তন করে ০.৫ শতাংশ করেছে।
সাপ্লাই চেইনের জন্য হুমকি
উৎপাদনের সময় শিল্পের সব শাখায় যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে, সেই উৎপাদনের উপায় হিসেবে বিবেচিত যন্ত্রের ভান্ডার সবসময়ে সীমাবদ্ধ থাকে। এই বিষয়টিই নির্ভরযোগ্য সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে সংঘবদ্ধ বৈশ্বিক শিল্পের পূর্বানুমানকে নিশ্চিত করে। এখন সেই পূর্ব অনুমিত সাপ্লাই চেইনের বিষয়টি হুমকির মধ্যে পড়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের আগে যে সংক্রমণটি বেশি আলোচিত হয়েছিল, সেই সার্সের সময় অর্থাৎ ২০০৩ সালে চীন আজকের মতো বিশ্বে এত গুরত্বপূর্ণ ছিল না। তখন চীন বিশ্ব অর্থনীতির মাত্র ৪ শতাংশ ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে দেশটি ১৫ শতাংশে পরিণত হয়েছে। চীনের এই ক্রমবর্ধমান গুরুত্বই প্রমাণ করে এ নতুন ভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বেশি প্রভাব পড়বে। মনোপোলাইজেশনের অর্থই হলো অধিকাংশ ব্র্যান্ডের ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় উপাদান মাঝে মাঝে একটিমাত্র কারখানায় উৎপাদিত হয়। ফুকুশিমা নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের বিপর্যয়ের পর গাড়ি নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট একটি রঞ্জক পদার্থের ঘাটতির কারণে বিভিন্ন কারখানায় গাড়ি উৎপাদনের বিষয়টি অচল হয়ে গিয়েছিল। এখন, একই প্রক্রিয়া ঘটতে যাচ্ছে।
করোনা ভাইরাসের কারণে গাড়িশিল্পে কঠিন আঘাত আসছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি উৎপাদকরা হুবেই-এর কারখানার ওপর নির্ভর করতো এবং তারা এখন তাদের উৎপাদন অনেক কমিয়ে দিয়েছে। ফিয়াট ক্রাইসলার, রেনেওয়াল্ট, বিএমডব্লিউ এবং পেউগিয়টের মতো ইউরোপীয় উৎপাদকরা উত্তর ইতালির সংক্রমণের দ্বারা হুমকিগ্রস্ত হয়েছে। কেননা এই গাড়ি উৎপাদনের একটি উপাদান এ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে প্রস্তুত হতো। ইউরোপীয় উৎপাদনের এ ঘাটতি ততক্ষণ পর্যন্ত পূরণ হচ্ছে না, যতক্ষণ না আগামী মাসে চার-পাঁচ সপ্তাহ ধরে চীন থেকে শিপমেন্ট না আসবে।
শিল্পও হুমকির মুখে
শিপিং হলো আরেকটি শিল্প, যেটি এখন মন্দার মুখে। ২০০৯ সালের পর গত বছর বৈশ্বিক বাণিজ্য সবচেয়ে বাজে সময় কাটিয়েছে। এর কারণ হিসেবে ট্রাম্পের ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ এবং শ্লথগতির ইউরোপীয় অর্থনীতিকে দায়ী করা হচ্ছে। এই বছর যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে সম্পাদিত নতুন চুক্তির ফলে শিপিং ব্যবসায় ঘাটতি পূরণের সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু করোনা ভাইরাস আবার এ ব্যবসাকে বিপদে ফেলেছে। বড় কোম্পানিগুলো হয়তো ঘাটতি পুষিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে, তবে ছোট কোম্পানিগুলো ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। কতগুলো শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, তা নির্ভর করছে এ ভাইরাসের ভয়াবহতা কতদিন বিদ্যমান থাকবে, তার ওপর।
পর্যটনশিল্পে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে। চীনা পর্যটকরা সংখ্যায় বিপুল না হলেও তারা এ শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য ব্যয়কারী। ২০১৮ সালে তারা বিশ্ব পর্যটনশিল্পের ২০ শতাংশ অর্থাৎ ২৭৭.৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন, যা মার্কিন পর্যটকদের প্রায় দ্বিগুণ। জাপানে করোনা ভাইরাসের কারণে হোটেল ব্যবসায় প্রথম দেউলিয়া অবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে। এই ভয় এত পরিমাণ বাড়ছে যে মানুষ এখন ভ্রমণ এবং হলিডেতে হোটেল বুকিং বাতিল করছে। যদি উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এই ভাইরাসকে মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে পর্যটনশিল্পে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এর ফলে শুধু এ শিল্পেই ক্ষতিসাধন হচ্ছে তা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত এয়ারলাইনসের ব্যবসাও আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক দেশে ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণের পরামর্শ দিচ্ছে। হংকংয়ের ক্যাথি প্যাসিফিকের মতো হোটেল তাদের কর্মচারীদের বিনা বেতনে তিন সপ্তাহের ছুটি দিয়ে দিয়েছে।
মুনাফার বাড়বাড়ন্ত সুযোগ
পুঁজিবাদে সবসময় জনগণের দুর্দশার সুযোগে কারও কারও মুনাফার সুযোগ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে সার্জিক্যাল এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক মাস্কের দাম তিনগুণ হয়েছে। আমাজনের মতো বহুজাতিক কোম্পানি তাদের সুনাম হারানোর ভয়ে বিক্রেতাদের বেশি দামে তাদের সরবরাহকৃত মেডিক্যাল সামগ্রী বিক্রির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছে। হ্যান্ড-স্যানিটাইজারের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এই ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগে ব্যাপক মুনাফা করছে। তারা এর চিকিৎসা এবং প্রতিষেধক বাবদ বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। জাপানের সরকার আভিগানের মতো ফ্লু-প্রতিষেধককে সুপারিশ করায় তাদের মালিক ফুজিফিল্মের শেয়ার ৮.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সুযোগে বড় কোম্পানিগুলো ছোট ছোট কোম্পানিকে নিজেদের মধ্যে বিলীন করে নিচ্ছে।
বিশ্বায়নের বিপরীত যাত্রা
করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী আন্তঃসংযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে। ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী এবং পর্যটকদের বেশি বেশি চলাফেরার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি চাঙ্গা হয়, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের উন্নয়ন সাধন করে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’, অভিবাসীদের ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ এবং ভ্রমণ সীমিত করার নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের রক্ষণবাদী মনোভাব বিশ্ব অর্থনীতির জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। বিগত অল্প কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের উন্নয়ন বিশ্ব অর্থনীতির উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছিল। বিশ্বায়নের যে কোনও বিপরীত যাত্রা পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ক্ষতি ছাড়া লাভ বয়ে আনবে না।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন আরেকটি মন্দার সম্মুখীন। করোনা ভাইরাস এই হাওয়ায় আরও জোর দিচ্ছে। প্রকৃত অর্থে ভাইরাসটি সেই দুর্ঘটনায় পরিণত হতে পারে, মহামতি ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের ভাষায়—‘যার ভয়াবহতা নিজেই পেছনে লুকিয়ে রাখে’।
লেখক: সাংবাদিক



