মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে উত্থান-পতন আর কত?

ফারাবী বিন জহির
১৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬:৩১আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬:৩৩



ফারাবী বিন জহির মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটির মধ্যেই লিপিবদ্ধ আছে বাঙালি জাতির গর্বের ইতিহাস, বাঙালি জাতির অহংকারের বীরগাথা। এই মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে আমরা পেয়েছি বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন দেশ। আমরা পেয়েছি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছেন বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের আত্মত্যাগের ফলে আমরা পেয়েছি আমাদের লাল-সবুজের পতাকা, আর বিশ্বের বুকে এক গর্বিত মানচিত্র। ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটি আমাদের কাছে অনেক বড় মাহাত্ম্যময়। মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি শুনলেই শ্রদ্ধায় শির নত হয়ে ওঠে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আজ পর্যন্ত সেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান তথা মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ কোনও তালিকা আমরা তৈরি করতে পারিনি। বরং আমরা দেখেছি মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে উত্থান-পতনের খেলা। বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার তাদের সুবিধার কারণে বিভিন্ন সময়ের নানা রকম অজুহাতে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তিকরণের প্রক্রিয়া চালিয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা নিবন্ধীকরণের বা অন্তর্ভুক্তিকরণের যে প্রক্রিয়া সেই প্রক্রিয়া পরিবর্তন এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটির সংজ্ঞায়ন প্রায় ১২ বার করা হয়েছে। অথচ ১৯৭২ সালে কিন্তু একটি অর্ডারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নিজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়ন করেছেন। কারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত হবেন, সেটি ১৯৭২ সালের অর্ডারেই স্পষ্ট রয়েছে। এটি নিয়ে বারবার বিতর্ক করার কিছু নেই। এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করার অর্থ হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করা। ১৯৭২ সালের অর্ডারের যে ব্যাখ্যা তাতে বলা হয়েছে—মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি, যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যেকোনও সংগঠিত দলের (ফোর্স) সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

১৯৭২ সালের অর্ডারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত কোনও সংগঠিত দলের সদস্য না হন এবং হয়েও যদি সক্রিয় ভূমিকা না রাখেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পড়বেন না। উল্লেখ্য, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা সম্পর্কে ১৯৭২ সালের অর্ডারের ইংরেজি ভাষায় যা বলা আছে তা হচ্ছে: ‘ফ্রিডম ফাইটারস (এফএফ) মিনস অ্যানি পারসন হু হ্যাড সারভড অ্যাজ মেম্বার অব অ্যানি ফোর্স এনগেজড ইন দ্য ওয়ার অব লিবারেশন।’

অন্যদিকে ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীর অবসরের বয়স বাড়ানোর পর ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান একটি পরিপত্র জারি করেন। এতে কারা মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারী হবেন তার সংজ্ঞা বা চারটি শর্ত দেওয়া হয়। এসব শর্ত হচ্ছে: যারা চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন অথবা যাদের নাম মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত হয়েছিল অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের নাম গেজেটে প্রকাশ হয়েছিল অথবা যাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষর করা সনদ রয়েছে। এ চারটির যেকোনও একটি শর্তে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুযোগ পান মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীরা। 

১৯৭২ সাল থেকে আজ অবধি মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও সংখ্যা নির্ধারণে ভিন্নতা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে কোনও সংজ্ঞা নির্ধারণেই ’৭২-এর নির্দেশ পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে ব্যাপক উত্থান পতন হয়েছেন এবং জন্ম নিয়েছে বিতর্ক। মুক্তিযুদ্ধের পর সেক্টর কমান্ডার ও সাবসেক্টর কমান্ডারদের প্রকাশনা থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৮০০ এবং অনিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭ হাজার।

অর্থাৎ মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ জন। সেক্টর থেকে পাওয়া (মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর বিলুপ্তির পর এসব দলিল ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রশিক্ষণ ও রেকর্ড সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান ইবিআরসিতে স্থানান্তর করা হয়েছে) দলিলে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৭০ হাজার ৮৯৬ জন। বাকি ৬০ হাজার ৯০৪ জনের খোঁজ পাওয়া যায় নাই।

এদিকে ১৯৯৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে সংরক্ষণ করা লাল বইয়ে ১ লাখ ৫৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইবিআরসিতে সংরক্ষিত ৭০ হাজার ৮৯৬ জনের মধ্যে অনেকের নাম এ তালিকায় নেই। অর্থাৎ এ তালিকাটিও অসম্পূর্ণ বলা যায়।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে সুপারিশকৃতদের নিয়ে ২০০৩ ও ২০০৪ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করে দুটি গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর একটি ছিল বিশেষ গেজেট, যেখানে সামরিক বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার এবং অপর গেজেটে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৫৯ হাজার। দুটি মিলে তখন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৮ হাজার। জোট সরকারের সময় সংখ্যা বাড়ে ৪৪ হাজার। যা ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগ করে আসছে।

সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ১০ বছরের অধিক ক্ষমতায়, কিন্তু তারপরও আমরা পাইনি মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। বরং আমরা দেখেছি তালিকা প্রণয়নের নামে বিভিন্ন বিব্রতকর ঘটনার অবতারণা হয়েছে। যেমন মো. মীজানুর রহমানের জন্ম মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার ৯ বছর পর ১৯৮০ সালে। তারপরও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তার। শুধু তা-ই নয়, তার মা-বাবার বিয়েও হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পর। বাবার নাম আবদুল মজিদ, মা দিলরুবা খানম। তাদের বিয়ে হয় ১৯৭৮ সালে। এর দুই বছর পর ১৯৮০ সালের ৩ জুলাই জন্ম হয় মো. মীজানুর রহমানের। তার চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা অবলোকন করেছি রাজাকারের তালিকাকে কেন্দ্র করে। আমরা প্রকৃত রাজাকারদের নাম তো পাই-ইনি, বরং সেই তালিকায় দেখেছি অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম। দেখেছি রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে রাষ্ট্রের বীর সন্তানদের অপমানের মহোৎসব। যদিও পরবর্তীতে এই লজ্জাজনক তালিকাকে স্থগিত করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ও মর্যাদা নিয়ে এই ধরনের ছিনিমিনি খেলা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কী পরিমাণ ব্যথিত করে, তা অনুধাবন করার মতো মানুষ বাংলাদেশে বোধ করি নেই। তা না হলে স্বাধীন বাংলার মাটিতে এই ধরনের ঘটনা ঘটবার কথা নয়। সম্প্রতি আরেক যজ্ঞ হাতে নিয়েছে মন্ত্রণালয়, তা হচ্ছে ৪২ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বিশাল যজ্ঞ কবে শেষ হবে তা হয়তো মন্ত্রণালয়ই জানে। তবে মন্ত্রণালয়ের এই ধরনের কর্মকাণ্ডে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে এক ধরনের হতাশা জন্ম নেবে। তারা হয়তো নিজের জীবদ্দশায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা দেখার আশা এক প্রকার ছেড়েই দিবেন। 

এখন প্রশ্ন তোলার সময় হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা নিয়ে। একজন পূর্ণ মন্ত্রীর নেতৃত্বে এক বিশাল আমলা বাহিনী থাকার পরও তারা তাদের প্রতি অর্পিত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ তথা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পুরোপুরি এখনও করতে পারেননি। গত ১০ বছরের ও অধিক সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তালিকা প্রণয়ন করতে পারেনি।

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা কোনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নয় যে মন্ত্রণালয়ের আমলাদের দিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। বরং মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণনয়নের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা সহ যে ব্যক্তি বা সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা করে আসছে, তাদের সাহায্য নিতে হবে এবং এই তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে কোন রকম অনিয়মকে কঠোর থেকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। 

মনে রাখতে হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু নির্গত হওয়া মানে বাংলাদেশ নামক দেশের হৃদয় থেকে এক ফোঁটা রক্তক্ষরণ। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে  হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক নামকরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী বা অন্য যেকোনও পেশার মানুষ তৈরি হবে,  কিন্তু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি চাইলেও আর একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তৈরি করতে পারবে না। আজকে থেকে ১৫-২০ বছর পর যে কয়জন মুক্তিযোদ্ধা এখনও জীবিত আছেন তারাও হয়তো আমাদের মাঝে থাকবেন না। তাই যাদের জন্য এই তালিকা, সেই  মুক্তিযোদ্ধারা যদি তাদের জীবনকালে সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেখে যেতে না পারেন, তাহলে জাতি হিসেবে এর চেয়ে অমর্যাদাকর আমাদের জন্য আর কিছুই হতে পারে না।       

লেখক: অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বশেষসর্বাধিক