X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

আইন মেনে এনজিও’র আয়কর রিটার্ন কি সম্ভব?

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২১, ১৮:৫৯

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন আমাদের দেশে ‘এনজিও’ শব্দটা শুনলেই অনেকে ধরে নেন ঋণ, সঞ্চয়, কিস্তি নিয়ে যারা কাজ করে। আমার নিজেরও বহু কষ্টে অনেক উচ্চপদস্থ এবং সাধারণ মানুষের কাছে এনজিও’র বহুমুখিতা বোঝাতে গিয়ে অনেক সময় বেগ পেতে হয়েছে। এর মূল কারণ হলো, যার মাথায় একবার যা ঢুকে যায়, তা দূর করা মহাকঠিন। একবার আমাদের একজন স্কুলশিক্ষক ক্লাস ফাঁকি দেয় এমন একজন ছাত্রকে ধরে আনার জন্য আমার নেতৃত্বে একটি টিম পাঠিয়েছিলেন। আমরা ওই ছাত্রের বাড়ির পাশে গিয়েছি, টের পেয়েই সে আধমরা অবস্থা! তার কাছে স্কুল যাওয়া মানেই হলো স্যারের বেতের বাড়ি, আর কানমলা। কারণ, সে যত দিন কালেভদ্রে স্কুলের ক্লাসে গেছে, হয় বেতের বাড়ি খেয়েছে, নতুবা কানমলা খেয়ে কান লাল করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছে।

আমরা পূর্ব পুরুষ থেকে গরিব দেশের মানুষ। এখানে সাহায্য সহযোগিতা আসতো, আর সেগুলো বণ্টনের দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। সেকালে এনজিও ছিল রিলিফ দেওয়া, বিত্তহীনদের সাহায্য করার সংস্থা। এলাকার মানুষরা সরকারের বাইরে এ জাতীয় সংস্থার লোকদের দেখলে পিছু নিতো রিলিফ পাওয়ার আশায়। তখনকার মতো এ রকম একটা যুগও আমাদের আগের প্রজন্ম পার করে আসছে। এটা বহু দিন প্রচলন ছিল। মূলত রিলিফ/সাহায্য থেকে এনজিও’র পথচলা শুরু এটা অসত্য নয়।

এরপর এনজিও’র উদ্যোক্তারা চিন্তা করলেন গরিব মানুষগুলোকে রিলিফ বা সাহায্যের পাশাপাশি আর্থিকভাবে কীভাবে স্বাবলম্বী করা যায়। নানা চিন্তা, নানা ভাবনা। অতঃপর শুরু হলো দল গঠন করে/গ্রুপ করে অসহায় মানুষগুলোকে কীভাবে সঞ্চয়ে আগ্রহী করে তোলা যায়। এরপর দেখা গেলো মানুষ ব্যাপক হারে সঞ্চয় করছে। সঞ্চয়ের এ তহবিল একই গ্রুপ/দলে স্বল্প মেয়াদে ছোট ছোট উদ্যোগের জন্য ঋণ দেওয়া শুরু হলো। ব্যাপক সফলতা! দেখা গেলো এখানে ব্যাপক হারে মানুষ উপকৃত হচ্ছে। ঋণ নিচ্ছেন এবং ফেরত দিচ্ছেন। গ্রামীণ সমাজের জীবনযাত্রায় অর্থনৈতিক একটা প্রবাহ শুরু হলো। মানুষ ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হতে লাগলো। এনজিওগুলো তাদের কার্যক্রম ব্যাপক হারে বাড়াতে শুরু করলো। এক্ষেত্রে অনেক এনজিও বিভিন্ন ঋণ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান থেকে তহবিল সরবরাহ করতে শুরু করলো এবং ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাপক সুনাম ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। সরকার তহবিল প্রদানের একটা বড় সংস্থা খুলে দিলো। আবার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ করলো। বাংলাদেশের সীমানা ছেড়ে ক্ষুদ্রঋণ এখন চলে গেলো বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত, অনুন্নত দেশে।

এ অর্থে এনজিও বলতে ঋণ, সঞ্চয় ও কিস্তির টাকাওয়ালা প্রতিষ্ঠান হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, ওই ছাত্রের কাছে স্কুলের মানে যেমন শুধুই শিক্ষকের বেতের বাড়ি বা কানমলা, আমরা এনজিও বলতে তেমন ধারণা করে বসে আছি। কিন্তু দুই ধারণার মধ্যে একটা ঐতিহাসিক ভুল আছে।

যেমন, বিদ্যালয়ে সভ্যতারই ফুল ফোটানো হয়, ওই ছাত্র তা বুঝতে পারছে না। তেমনি এনজিও শুধু এনজিওই নয়, এটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। এ ভিত্তি শুধুই ভিত্তিই নয়, এটা এমন এক মহাভিত্তি যা প্রতিটি পরিবারের শিকড়ে গিয়ে স্বচ্ছতা ও স্বাবলম্বীর চিত্র প্রকাশ করে।

এখন রিলিফ দেওয়া সংস্থা, ক্ষুদ্র ঋণের এনজিও আর শুধু তার সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। এ সীমানা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। গ্রামীণ জনপদে মানুষকে হাত ধোয়ার প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে ব্যবসা, বাণিজ্য, করপোরেটের সীমা অতিক্রম করে এনজিও এখন এমন একটা অবস্থানে আছে, যার অবস্থান নির্ণয় করা সত্যিই কঠিন। একদিকে গরিব মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, অন্যদিকে করপোরেট সেক্টরে অবদান। এমন কোনও উন্নয়ন কার্যক্রম নেই যেখানে এনজিও’র অবস্থান নেই।

এ পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে রাজস্ব আহরণে এনজিও কার্যক্রমের ওপর যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদান করতে বেগ পেতে হচ্ছে। যদিও মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলারেটি অথরিটি (এমআরএ)-এর লবিংয়ের কারণে শুধু ক্ষুদ্র ঋণের কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয়কে করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য কার্যক্রমের অবস্থানে গিয়ে কীভাবে ভ্যাট ও আয়কর নির্ধারণ করবে অনেক সময় তা কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তারা। অনেকে সাধারণ নিয়ম মেনে চলেন, আবার অনেকে না বুঝে বৈদেশিক সাহায্যে পরিচালিত কার্যক্রমকে করপোরেট রেটে ভ্যাট/ট্যাক্স কর্তন করতে অভ্যস্ত।

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বা ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা কতটুকু পালন করা সম্ভব? এনজিও সেক্টরে এই বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক হারে প্রচার ও ওরিয়েন্টেশন দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এতে দুই দিকে লাভবান হওয়া যায়। আইনি বাধ্যবাধকতাসমূহ পালন করে রাজস্ব নীতি পরিপালন করা, যেমন- এনজিও’র পক্ষে সম্ভব হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ভ্যাট ও ট্যাক্স দেওয়া থেকে এনজিওগুলো রেহাই পাবে।

আজকের আলোচনা এনজিওদের রিটার্ন জমা সংক্রান্ত। তাই অন্যদিকে আলোচনা না বাড়িয়ে আসুন জানা যাক একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানকে মাসিক, ষাণ্মাসিক, বার্ষিক কী কী রিটার্ন জমা দিতে হয়। সময় মতো এই রিটার্নগুলো জমা না দিলে শাস্তি কী?

মাসিক ভ্যাট রিটার্ন: মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২-এর বিধি ৪৭(১) মোতাবেক প্রত্যেক বিআইএনধারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে ভ্যাট রিটার্ন পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সার্কেলে জমা দিতে হয়। একইভাবে এই বিধান বিআইএনধারী সব এনজিও’র জন্য প্রযোজ্য। যেমন, সেপ্টেম্বর ১ তারিখ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত কার্যক্রমের ওপর প্রদেয় ভ্যাটের পরিমাণ বা উৎসে কর্তনকৃত ভ্যাটের পরিমাণ ৮৭৯০ টাকা। এ ভ্যাট ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিয়ে ভ্যাট রিটার্নের জন্য নির্ধারিত ফরমে অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট সার্কেলে জমা দিতে হয়। এনজিওগুলো উৎসে ভ্যাট কর্তনকারী কর্তৃপক্ষ বিধায়, মাসিক ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

ভ্যাট রিটার্ন জমা না দিলে শাস্তি: মাসিক ভ্যাট রিটার্ন জমা না দিলে প্রতিটি রিটার্নের বিপরীতে দশ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়ার বিধান রয়েছে।

উৎসে আয়কর কর্তনের রিপোর্ট: আয়কর বিধিমালা ১৯৮৪-এর বিধি ১৮ মোতাবেক প্রত্যেক এনজিও সংস্থাকে বেতন খাত ব্যতীত অন্যান্য খাতে উৎসে আয়কর কর্তনের প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। একইভাবে বিধি ২১ মোতাবেক বেতন খাতে উৎসে কর্তনকৃত আয়করের প্রতিবেদন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উভয় প্রতিবেদন পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সার্কেলে (যে সার্কেলে এনজিও’র টিআইএন নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে) প্রতিবেদন জমা দেবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সার্কেলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্দিষ্ট রিপোর্টিং ফরমেট সংগ্রহ করতে হবে।

ষাণ্মাসিক রিটার্ন দাখিল: আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ৭৫এ ধারায় উৎসে করের রিটার্ন দাখিল সংক্রান্ত বিধান মোতাবেক সব এনজিওকে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে উৎসে করের বিধি মোতাবেক নির্ধারিত ফরমে প্রযোজ্য সব বিবরণ ও তথ্য সন্নিবেশিত করে দাখিল করতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সব তফসিল বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, ট্রেজারি চালানসহ সংশ্লিষ্ট দলিলাদি সংযুক্ত করতে হবে। প্রতি অর্থবছরের জন্য দুটি রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

ক) প্রথম রিটার্নটি দিতে হবে প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারি তারিখের মধ্যে। রিটার্নের সময়কাল হবে ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য;

খ) দ্বিতীয় রিটার্নটি দিতে হবে প্রতি বছরের ৩১ জুলাই তারিখের মধ্যে। রিটার্নের সময়কাল হবে ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য;

এ ক্ষেত্রে কোনও কারণে রিটার্ন দাখিল করতে দেরি হলে লিখিত আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার ১৫ দিন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করতে পারেন।

বার্ষিক রিটার্ন দাখিল: আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ৭৫-এর উপধারা ১ মোতাবেক সব এনজিওকে করযোগ্য আয় থাকুক বা না থাকুক আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে। প্রতি বছরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন সময়কালকে আয় বছর ধরে বার্ষিক রিটার্ন দাখিল করতে হয়। এই রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা প্রতি বছর ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এনজিওদের জন্য রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত ফরম (IT-11GHA20216) ব্যবহার করে রিটার্ন দাখিল করতে হয়।

রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি: আয়কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বর্তমানে ইমেইল, ইলেকট্রনিক মাধ্যম, সিস্টেম জেনারেটেড সফটওয়্যারের মাধ্যমে অথবা সরাসরি সংশ্লিষ্ট সার্কেলে উপস্থিত হয়ে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে শাস্তি:  কোনও এনজিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে যদি রিটার্ন জমা না দেন, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ধারা ১৮৪ মোতাবেক জরিমানা, ৭৩ ধারা মোতাবেক ৫০% অতিরিক্ত সরল সুদ, ৭৩এ ধারা মোতাবেক ২% বিলম্ব সুদ আরোপের বিধান রয়েছে।

এনজিও কার্যক্রমকে সরকারের উন্নয়নের একটি বড় অংশীদারি কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই এনজিওদের কার্যক্রমের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স নির্ধারণ করার আগে ব্যাপক হারে পর্যালোচনা করার দাবি রাখে। কারণ, এনজিওদের কার্যক্রম সরাসরি তৃণমূলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। সঙ্গে সঙ্গে সরকারের ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, এসডিজিকে স্থানীয়করণ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে এনজিও কার্যক্রম ব্যাপকভাবে অবদান রেখে আসছে। আবার যেহেতু এনজিও কার্যক্রমের বহুমুখী প্রভাব বিরাজমান, সেহেতু সরকারের রাজস্ব আহরণে এনজিওদের ব্যাপক দায়িত্ব রয়েছে। এ দায়িত্ব ব্যাপকভাবে এনজিও সেক্টর পরিপালন করছে, তার প্রমাণ হিসেবে আয়কর বিধিবিধান অনুসরণ ও পরিপালন করে যথাসময়ে রিটার্নসমূহ দাখিলের মাধ্যমে এনজিওগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারে।

লেখক: আয়কর আইনজীবী

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষের সাক্ষাৎ
পাঞ্জাবকে হারিয়ে প্লে-অফের আশায় দিল্লি
আইপিএলপাঞ্জাবকে হারিয়ে প্লে-অফের আশায় দিল্লি
৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
৪ ঘণ্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল শুরু
এশিয়ান কাপ ফুটবল: ছিটকে গেলেন বাংলাদেশ গোলকিপার
এশিয়ান কাপ ফুটবল: ছিটকে গেলেন বাংলাদেশ গোলকিপার
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ