X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পরাজয়ের নেপথ্যে

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২১, ১৭:২২

ড. প্রণব কুমার পান্ডে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রায় ২০০ প্রার্থীর পরাজিত হওয়ার খবরটি বিভিন্ন সামাজিক, ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।

বিষয়টিকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন অনেকে। তবে একথা ঠিক– যে দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হোক না কেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ভাবা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পরাজয় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেকোনও ধরনের নির্বাচনে, বিশেষ করে আগামী সংসদ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত এই ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য দলীয় নিরপেক্ষ নেতৃত্বকে দিয়ে অনুসন্ধান করা, যাতে আগামী নির্বাচনের আগে বিষয়গুলো সংশোধন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের ওপর বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ওপর গবেষণা পরিচালনা করার সুবাদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়ের ওপর আমার বেশ ভালো দখল রয়েছে। এই অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ আমি চিহ্নিত করেছি।

প্রথম যে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলছে সেটি হচ্ছে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা হেরে গেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে। এর অর্থ হচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থীরা অবশ্যই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে বেশ জনপ্রিয়।  স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দলীয় মনোনয়নের চেয়ে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পায় ভোটারদের কাছে।  স্থানীয় জনগণ সেসব প্রার্থীকে ভোট দেয় যারা সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকে। এই থেকে বিচার করলে বোঝা যায় যে যারা মনোনয়ন পেয়েছেন এবং নির্বাচনে করেছেন তারা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের তুলনায় কম জনপ্রিয়। ফলে, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আরও বেশি সচেতন হওয়ার প্রয়োজন ছিল।

দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন গবেষণায় যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটি হলো স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রে মনোনয়নের জন্য প্রার্থী তালিকা প্রেরণের ক্ষেত্রে এমপি এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ নিজেদের পক্ষের নেতাদের নাম পাঠাতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে মনোনয়ন বাণিজ্য যুক্ত হয়েছে। ফলে কে নিবেদিত আওয়ামী লীগের নেতা কিংবা জনপ্রিয় নেতা সেটা বিচার না করে কাকে মনোনয়ন প্রদান করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে এমপি এবং নেতাদের বলয় শক্তিশালী হবে সে বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা অনেক স্থানে বিজয়ী হয়েছেন। আমরা এমনও লক্ষ করেছি, বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। আবার অনেক কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ভোটশূন্য থেকেছেন।

এই বিষয়গুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্রিক হলেও খুব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত।

দ্বিতীয় যে কারণটি এই ধরনের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে সেটি হচ্ছে বিএনপির নির্বাচন বর্জন। এটি ঠিক যে কোথাও কোথাও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু তারা তেমন ভালো ফল করতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ,  সাংগঠনিকভাবে দলটি দেশব্যাপী খুব দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে বিএনপি এবং তাদের স্থানীয় নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে ভোট প্রদানের কৌশলটি গ্রহণ করেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে জনগণের সামনে আওয়ামী লীগকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা এবং অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের কোন্দলকে আরও বাড়িয়ে দেওয়া।

তৃতীয় যে কারণটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সেটি হচ্ছে সাংগঠনিকভাবে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের দুর্বলতা। কেন্দ্র থেকে বারবার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার। কিন্তু স্থানীয় নেতৃত্ব দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে একত্রিতভাবে করতে পারেনি। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে দলীয় মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আবেগ তৈরি করতে পারেনি। এই ক্ষেত্রেও দলীয় কোন্দল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কারণ, মনোনীত প্রার্থীদের বিপক্ষের গোষ্ঠীগুলো চেষ্টা করেছে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার।  এমনও দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে এমপি এবং স্থানীয় নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন। এর ফলে মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে।

স্থানীয় পর্যায়ে দলভিত্তিক নির্বাচন সারা পৃথিবীতে অনুশীলন করা হলেও বাংলাদেশ দেশে এর অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়।  এই পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলে দলীয় কোন্দল বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কারণ, দলীয়ভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ফলে প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দল বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়েছে।  এমপিদের আধিপত্যের সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা দলের মধ্যে কোন্দলের জন্ম দিয়েছে। এমপি এবং উপজেলা পর্যায়ের নেতারা সবসময় চেষ্টা করেছেন নিজেদের বলয়কে শক্তিশালী করার জন্য নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদানের জন্য কেন্দ্রের কাছে নাম পাঠাতে।

ফলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কাছে বিভিন্ন স্থানে হেরে গেছে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী, যা জনসাধারণের কাছে একটি ভুল বার্তা প্রদান করতে পারে।

ফলে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত বিপুল সংখ্যক প্রার্থী হেরে যাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। আমরা জানি যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বাংলাদেশকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যাওয়ার। ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা ব্যাপক উন্নয়ন অর্জন করেছি।

আমরা উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। আমরা এসডিজি লক্ষ্য অর্জন করার ক্ষেত্রে সঠিক পথেই রয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে রূপান্তর করার যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সরকারের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যদি বিজয়ী হতে না পারে তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ের সব ক্ষেত্রে দলীয় সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠে দলকে শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর এই কাজটি করতে হলে প্রথমেই যেটা করা প্রয়োজন সেটি হচ্ছে দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করা। আমরা জানি ইতোমধ্যে ২০২১ সালে কয়েক ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ফলে, এই মুহূর্তে নির্বাচন পদ্ধতি বাতিল করা সম্ভবপর না হলেও আগামী নির্বাচনগুলো যেন দলীয় ভিত্তিতে না হয় সেই ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনে আইন সংশোধন করার বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে চিন্তা করতে পারে।

আমরা জানি যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে নেতৃত্ব তৈরির মূল কেন্দ্র। এখান থেকেই নেতৃত্ব গড়ে ওঠে এবং সেই নেতৃত্ব ভবিষ্যতে দেশকে পরিচালিত করে। ফলে উন্মুক্ত পদ্ধতির স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম হতে পারে। এতে একদিকে যেমন প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন পদ্ধতিতে নেতৃত্বের উন্নয়ন ঘটবে,  একইভাবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দলাদলি অনেক কমে যাবে।  এর ফলে আওয়ামী লীগ আখেরে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশ উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছে যাবে এটা সবার বিশ্বাস।

আমি বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। এই বিষয়টি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি এমপি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের একটি অংশ যারা নিজেদের বলয়কে শক্তিশালী করার জন্য দলের ক্ষতি করছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।  এই দুটি কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত এবং আগামী নির্বাচনে দলের বিজয় ত্বরান্বিত হবে।

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

মা ও ২ সন্তানকে গলা কেটে হত্যা
মা ও ২ সন্তানকে গলা কেটে হত্যা
ডনবাসের পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত জটিল’: জেলেনস্কি
ডনবাসের পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত জটিল’: জেলেনস্কি
বৈশ্বিক সংকটেও বেশ ভালো আছে বাংলাদেশ
বৈশ্বিক সংকটেও বেশ ভালো আছে বাংলাদেশ
দেশে ফিরলেন ভারতে পাচার হওয়া ৫ তরুণী
দেশে ফিরলেন ভারতে পাচার হওয়া ৫ তরুণী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ