নিজেই নিজের হাত ধরে ঝাঁকুনি দেওয়ার নামই যেখানে করমর্দন!

আতিকুর রহমান তমাল
০২ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:১৬আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:১৬

আতিকুর রহমান তমাল করমর্দন বা হ্যান্ডশেকের প্রচলন কবে থেকে শুরু তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কেউ বলেন এটা মধ্যযুগে, কারও মতে প্রাচীন ইউরোপে, কারো মত হলো প্রাচীন গ্রিসে এই প্রচলন শুরু হয়েছে। মহাকবি হোমার তাঁর ইলিয়াড ও ওডিসিতে বহুবার শপথ এবং অঙ্গীকার করার সময় করমর্দন করার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে উৎপত্তি যেখানেই হোক না কেন আধুনিক বিশ্বে মানুষকে সম্ভাষণ জানানোর খুব প্রচলিত রেওয়াজ—করমর্দন বা হ্যান্ডশেক। যদিও বছর দুই হলো করোনার কারণে এই রীতিতে পরিবর্তন এসেছে। কনুই ঠেকিয়ে সম্ভাষণ করছেন কেউ কেউ। কেউবা করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলে অপরজন হচ্ছেন বিব্রত। কি করবেন বুঝে উঠতে না পেরে শেষমেশ মৃদুভাবে ঘুসি ঠুকছেন একে অপরকে!

তবে করমর্দন নিয়ে আলাপটা মূলত করতে চাই পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে।

ইউরোপ বরাবরই পশ্চিমা মানসিকতায় বেড়ে ওঠা আমাদের জন্য আকর্ষণের স্থান। হবেই বা না কেন? পশ্চিমের ধ্যানধারণা, প্রথা, শিক্ষা এমনকি গণমাধ্যমের প্যাটার্ন সবই ঔপনিবেশিকতার কল্যাণে কিংবা পরবর্তীতে চলমান সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বদৌলতে আমাদের পেটের ভাত হজম করতেও এখন পশ্চিমা স্টাইলের কোল্ডড্রিংস অপরিহার্যের অংশে পরিণত!

সে তুলনায় অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকা আমাদের টানে না, জৌলুসহীন এ জনপদ টানতে পারেও না। যদিও বলা হয় আফ্রিকা মহাদেশই মানুষের উৎস-স্থান। মানুষের উৎস বিষয়ক গবেষণাগুলো জানাচ্ছে, প্রায় ২০ লাখ বছর আগে মানুষ প্রথম আফ্রিকা থেকে এশিয়া মহাদেশে অভিবাসী হয়। ১০ থেকে ১৫ লাখ বছর আগে মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করে।

প্রসঙ্গে ফিরতে বাংলাদেশের চেয়ে ৯ গুণ বড় প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কিন্তু দারিদ্র্যে জর্জরিত পশ্চিম আফ্রিকার হ্যান্ডশেকের প্যাটার্নে নজর দেওয়া যাক। গত জুনের মাঝামাঝি জাতিগত সহিংসতায় জর্জরিত দেশ মালিতে যখন পা রাখি তখন দেখা গেলো যার সাথেই দেখা হচ্ছে বিনয় বা করমর্দন হিসেবে তারা নিজেই নিজের দু'হাত ধরে জড়তামিশ্রিত ভঙ্গিতে অভিবাদন করছেন। কেন তারা এমন ভঙ্গিতে সম্ভাষণ করছেন? নৃতাত্ত্বিকরা হয়তো এর ব্যাখ্যা টানতে পারবেন। দেশ কাল, জাতি ভেদে বিভিন্ন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের ভাষা ভিন্ন ভিন্ন মিনিং তৈরি করে। বঙ্গদেশে একসময় বৃদ্ধাঙুল প্রদর্শনকে ‘কচু ঘেঁচু’ বোঝানো হলেও পশ্চিমে সেটারই মিনিং কিন্তু ‘রাইট’ বা ‘ঠিকাছে’। হাল আমলে ফেসবুকের থাম্ব বা বৃদ্ধাঙুল এখন গোটা দুনিয়াতেই এক ও অভিন্ন মিনিং তৈরি করে ছেড়েছে!

নিজের হাত নিজে ধরে ঝাঁকুনির ব্যাখ্যা হয়তো মালির ইতিহাসবিদরা ভালো দিতে পারবেন। তবে সাদা চোখে সেটি বুঝতে গেলে মালির ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসকে বাদ রাখার সুযোগ নেই। বহু বছরের ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খলে শাসিত জাতি মালিয়ানরা। মালি ১৮৯২ সালে ফরাসি হানাদার শাসনের অধীনে আসে, যা ১৯৬০ পর্যন্ত জারি ছিল। তবে এখনও ফরাসি কর্তৃত্ব পরোক্ষ শাসন জারি রেখেছে। শিল্প সাহিত্যের রাজধানী বলা হয় প্যারিসকে। ফ্রান্সের প্যারিসের পরিচয় শিল্পকলা, চলচ্চিত্র আর সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে। সেই পরিচয়ের ছিটেফোঁটাও সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোর ভাগ্যে জোটেনি।

আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে প্রায় দুই শতাব্দীর ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনকালে ফ্রান্স মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে। সে তুলনায় ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোকে ভাগ্যবানই বলতে হবে! যদিও নিজেদের স্বার্থেই করা হয়েছিল তারপরও শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা রেল যোগাযোগের মতো উন্নয়নগুলো ব্রিটিশ কলোনিগুলোতে কম বেশি হয়েছে। ভারতবর্ষই যার প্রমাণ। কিন্তু ফরাসি কলোনিগুলো ঠিক তার বিপরীত। যেমন, মালিতে ট্রেনের লাইন আছে কিন্তু রেলগাড়ি নেই! প্রাকৃতিক সম্পদের প্রচুর খনি থাকলেও সেগুলো উত্তোলনের যোগ্যতা বা সাহস কোনোটাই মালিয়ানদের নেই।

উপনিবেশগুলোর জনগণের জীবনমান নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা বা ইতিবাচক চেষ্টা থাকলে বহু কিছু এখনও চলতে পারতো না। যেমন, ফ্রান্স এখনও বহু দরিদ্র আফ্রিকান দেশকে কর ও ভাড়া দিতে বাধ্য করছে! মানে, ধরুন ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের ভাড়া এখনও তুলতে চায় ইংল্যান্ড। আজগুবি আবদার মনে হলেও সেটিই করা হচ্ছে আফ্রিকার বহু দেশে। মালিয়ানদের শিক্ষার হার মাত্র ২৩ ভাগ। অবশ্য দারিদ্র্যের বিপরীতে জৌলুসও আছে। তবে সেটা কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক। তার পেছনে আছে দেশীয় চাটুকার, অন্ধকারের টাকা, অবৈধ চোরাকারবারি ও বিদেশি প্রভুদের গোলামি মানা ধনিক শ্রেণির স্তরে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিয়ানরা যার ছিটেফোঁটাও পান না।

মালির তপ্ত রোদের শহরে শহরে যখন ঘুরছি তখন ব্যয়বহুল ইন্টারনেট খরচ মিটিয়ে নেট ঘেঁটে ঘেঁটে এসব পড়ছি আর অবাক হচ্ছি! মনে পড়ছে সভ্য মানুষ এখনও ধর্ম আর বর্ণবাদের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। এই নজির দেশে দেশে ভূরি ভূরি।

কালো চামড়ার মালিয়ানরা তাহলে কি সাদা প্রভুদের হাত ধরে হ্যান্ডশেক করতে হাত বাড়িয়ে দিতে ভয় পেতো? নাকি সাদা প্রভুরা কালোদের শিখিয়েছেন যে তোমার হাত তুমি ধরে ঝাঁকুনি দিলেই আমার সঙ্গে তোমার করমর্দন হয়ে যাবে? কোনটা ঘটেছে তা আমি জানি না, তবে সেই প্রভুত্বের অভ্যাস এখন যায়নি! যেতে দেওয়া হচ্ছেও না...।

সাহারা মরুভূমির কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা পশ্চিম আফ্রিকার কালো মানুষগুলো যখন নিজের হাত নিজে ধরে সাদা দাঁত বের করে শিশুর হাসি হাসেন, তখন প্রশ্ন জাগে- সভ্যতা তুমি কবে সভ্য হবে?

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, সময় টিভি

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
সর্বশেষসর্বাধিক