X
শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩
১৩ মাঘ ১৪২৯

প্রোটোকল বিতর্কের আড়ালে সফর

প্রভাষ আমিন
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২১:০৯আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২১:০৯

বাংলাদেশ-ভারত দুই প্রতিবেশী দেশ। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আর মিয়ানমারের সঙ্গে সামান্য সীমান্ত বাদ দিলে বাংলাদেশ আসলে ভারত দ্বারা বেষ্টিত। শুধু প্রতিবেশী বা দীর্ঘ সীমান্ত বলেই নয়, দুই দেশের সম্পর্কের একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সর্বাত্মক সহায়তা আমাদের বিজয় ত্বরান্বিত করেছে, এটা যেমন সত্যি; আবার ৫৪টি অভিন্ন নদী এবং বিপজ্জনক সীমান্তে আটকে আছে অনেক অমীমাংসিত ইস্যুও। ভারতের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা যেমন আছে, আছে সম্পর্কের টানাপড়েনও। ভৌগোলিক অবস্থান, আয়তন যাই হোক, ভারত যেমন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশও তা-ই। সে কারণেই দুই দেশের সম্পর্কটা অবশ্যই হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে। তবে মর্যাদার সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থটাও জরুরি। এটা মানতে দ্বিধা নেই, সম্পর্কের উষ্ণতা বাংলাদেশের জন্য যতটা জরুরি, ভারতের জন্য হয়তো ততটা নয়। তবে ছোট হলেও বাংলাদেশ যে চাইলে তার সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোকে অস্থিতিশীল করে রাখতে পারে, অতীতে ভারত সরকার তা দেখেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেয়নি। এই স্বস্তিটা ভারতের জন্য বিশাল। তাই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কটা নিছক একতরফা থাকেনি। সে কারণেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশের সফর বা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষ নেতাদের সফর বিনিময় ভারতের মিডিয়ায় ততটা নজর না কাড়লেও বাংলাদেশের মিডিয়া এবং জনগণ এ ধরনের সফর নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে মেতে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরটি নিছকই পাল্টা রুটিন সফর। কূটনীতির টেবিলেও খুব বেশি আলোচনার পয়েন্ট ছিল না। সম্পর্কটা দ্বিপাক্ষিক হলেও অনেকের অভিযোগ, বাংলাদেশ ভারতকে যতটা দিয়েছে, ভারত ততটা দেয়নি। তবে গঙ্গার পানিচুক্তি এবং সীমান্তে ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধান অবশ্যই দুই দেশের সম্পর্ককে ভিন্নমাত্রায় উন্নীত করেছে। এ দুটি সমস্যার স্থায়ী সমাধানকে অবশ্যই শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে মানতে হবে। এর আগে যারা অন্ধ ভারত বিরোধিতার রাজনীতি করেছেন, তারা কিন্তু এই সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। রাজনীতির মাঠ গরম করার চেয়ে কূটনীতির টেবিলে সমস্যার সমাধানটা অনেক ভালো বিকল্প। ভারতের কাছ থেকে নিশ্চয়ই আমরা জোর করে কিছু আদায় করতে পারবো না। অনেক অমীমাংসিত ইস্যু মীমাংসা হয়েছে, এটা যেমন সত্যি, আবার অনেক কিছু বাকি রয়ে গেছে, এটাও সত্যি। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এই অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে সমস্যা চিরদিনের। গঙ্গার সমস্যা মিটলেও এখন বাংলাদেশের আমজনতার দাবি তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা। এ বিষয়টি অনেক দিন ধরেই ঝুলে আছে। এবারের সফরে অবশ্য তিস্তা আলোচনার বিষয় ছিল না। তিস্তাকে আড়াল করতে কুশিয়ারার পানি নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। শেখ হাসিনা আশা করেছেন, তিস্তাসহ দুই দেশের সব সমস্যার সমাধান হবে। এই আশা অবশ্য আমরা ১০ বছর ধরে করে আসছি। কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তার ব্যাপারে আন্তরিক হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার, বিশেষ করে মমতা ব্যানার্জির গোয়ার্তুমির কারণে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি মমতা ব্যানার্জি নিজে বাংলাদেশে এসেও তার ওপর আস্থা রাখতে বলেছিলেন। আমরা আস্থা রেখে বসে আছি, কিন্তু মমতা কথা রাখেননি। ভারতের কেন্দ্র আর রাজ্যের টানাপড়েনে বাংলাদেশ তার ন্যায্য পাওনা থেকে কতদিন বঞ্চিত থাকবে?

বাংলাদেশের আরেকটি বড় চাওয়া একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সীমান্ত। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যত মানুষ মারা যায়, পৃথিবীর অন্য কোনও সীমান্তই এতটা অনিরাপদ নয়। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, চোরাচালানিদের অবৈধ প্রবেশের কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। চোরাচালানের অভিযোগ মিথ্যা নয়। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কোনও পণ্যের দাম ও চাহিদার তারতম্য থাকলে চোরাচালান হতেই পারে। চোরাচালান রোধ করাই দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মূল কাজ। কিন্তু চোরাচালানিদের দেখলেই পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলতে হবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক দিন ধরেই সীমান্তে প্রয়োজনে নন-ল্যাথাল অস্ত্র ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু ভারত সেটা মানছে না। সীমান্ত হত্যা আগের চেয়ে কমে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশের চাওয়া হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা। আশার কথা হলো, এবার যৌথ ঘোষণায় সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার রয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত পারস্পরিক সম্পর্কটা এমন, কোনোভাবেই একজনকে ছাড়া আরেকজনের চলবে না। ভারতের বিপুল সংখ্যক লোক বাংলাদেশে কাজ করে। ভারতের রেমিট্যান্স আয়ে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আবার বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ চিকিৎসা ও পর্যটনের জন্য নিয়মিত ভারতে যায়। বাংলাদেশের মানুষ ভারতে গিয়ে খরচ করে। আর ভারতীয়রা বাংলাদেশে এসে আয় করে। এই পারস্পরিক স্বার্থ ও যাওয়া-আসায় দুই দেশের মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও উষ্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটেছে উল্টো। গত কয়েক বছরের ক্রিকেটকে ঘিরে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। গত একযুগে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সর্বোচ্চ উচ্চতায় থাকলেও ভারত-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কেন শ্রীলঙ্কাকে সমর্থন করে, তা খুঁজে দেখতে হবে ভারতকেই।

আগেই বলেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রুটিন সফরে এবারের প্রত্যাশা খুব বেশি ছিল না। কেউ কেউ তিস্তা নিয়ে নাটকীয় কোনও ঘোষণার আশা করলেও সেটা হয়নি। আর যা হয়েছে সব রুটিন। ৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিত্যপণ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাতে দুই দেশই কমবেশি লাভবান হবে।

বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের সামনেই জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের আগে শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকের আর সম্ভাবনা নেই। তাই শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নিয়ে দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার সুযোগ নেই। আসলে এটা নিয়ে মৌখিক আলোচনার দরকারও নেই। স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক স্বার্থ নিশ্চিত করে দুই দেশের এগিয়ে যাওয়া নির্বাচনেও ক্ষমতাসীনদের সুবিধা দেবে।

তবে এবার শেখ হাসিনার ভারত সফরে তর্কের মূল ইস্যু হলো প্রোটোকল। নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে একজন প্রতিমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। এটা নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো সাইক্লোন। আলোচনাটা সাইক্লোনে রূপ নেওয়ার মূল কারণ, এর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে প্রোটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সে কারণে আমাদের প্রত্যাশা আকাশ ছুঁয়েছিল। কিন্তু তখনও আমরা লিখেছিলাম , ‘প্রোটোকল ভেঙে’। তার মানে কোনও প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিমানবন্দরে যাওয়াটা প্রোটোকলে নেই। সেবার প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানানোর কথা ছিল। নরেন্দ্র মোদি একবার প্রোটোকল ভেঙেছেন বলে বারবার ভাঙতেই হবে, এমন কোনও কথা নেই। তাই একজন প্রতিমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে গেলো গেলো রব তোলার কিছু নেই। এটা প্রোটোকল মেনেই হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে সিনিয়র কোনও মন্ত্রীকে পাঠালে ভালো হতো। কিন্তু প্রোটোকল নিয়ে আমরা এমনভাবে মেতে উঠেছি, তাতে আড়ালে পড়ে গেছে সফরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

তবে নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে প্রোটোকল বিতর্কের আড়ালে হারিয়ে গেছে ঢাকা বিমানবন্দরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতির বিস্ময়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কোথাও সফরে গেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্যই তার সফরসঙ্গী হন, এটাই রেওয়াজ। এবারও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর তালিকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ছিল। এমনকি সফরের আগের দিনের সংবাদ সম্মেলনেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন তিনি সফরে যাচ্ছেন। কিন্তু সফরের দিন সকালে বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা গেলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেই। সেদিন এ ব্যাপারে কোনও ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। একদিন পর জানা গেলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী অসুস্থ। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তিনি বিএসএমএমইউতে গেলেনও। জানা গেলো তার ভার্টিগো সমস্যা। তবে বাংলাদেশের কারও বুঝতে বাকি থাকেনি, এটা ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইলনেস’।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমীর এক অনুষ্ঠানে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক ভারত সফরের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে যা যা করা দরকার, তা করার জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ জানানোর কথা উল্লেখ করেন। তার এই বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় রাজনীতিতে, কূটনীতিতে। তার এই বক্তব্য বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের কূটনৈতিক মহলেই অস্বস্তি সৃষ্টি করে। সম্ভবত সেই অস্বস্তি কাটাতেই শেষ মুহূর্তে সফরসঙ্গীর তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন তিনি।

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যাওয়া না যাওয়া বা প্রধানমন্ত্রীকে কে স্বাগত জানালো সেটা নয়; আমাদের আসলে পাওয়ার হিসাব মেলাতে হবে। তিস্তার কোনও অগ্রগতি হয়নি বটে; তবে প্রধানমন্ত্রীর রুটিন সফরেও ৭টি সমঝোতা স্মারক, বিনা  মাশুলে ট্রানজিট, কুশিয়ারার পানি, সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার আশ্বাস, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, যোগাযোগ, নিত্যপণ্য আমদানি- সব মিলিয়ে প্রাপ্তি একেবারে কম নয়। বদলে যাওয়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক সহায়তার অঙ্গীকারও কম পাওয়া নয়।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ডাকসু নয়, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর
ডাকসু নয়, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর
চট্টগ্রামকে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে সাকিবের বরিশাল
চট্টগ্রামকে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে সাকিবের বরিশাল
বাবা হওয়ার পরদিন মাদ্রাসাশিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
বাবা হওয়ার পরদিন মাদ্রাসাশিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রস্তুতি: অবকাঠামোর উন্নয়ন
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রস্তুতি: অবকাঠামোর উন্নয়ন
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ