থিয়েটারে গল্প, চরিত্র ও কার্যকারণ বুঝতে সাবপ্লট বা পেছনের গল্পকে বিশ্লেষণ করা হয়। দেশের স্বাধীনতা দিবসের দিনে প্রথম আলো পত্রিকা প্রকাশ করে, 'পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কি করমু’র মতো সংবাদ। এই বিভ্রান্তির সাবপ্লট দীর্ঘদিনের বয়ে চলা গোপন সংলাপ।
সাবপ্লট নিয়ে বলার আগে এই যে কথা কথায় স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পেয়ারে পাকিস্তান বনে যাবার খায়েশ, এটার যৌক্তিকতা কতটুকু তা জনগণকে জানানো জরুরি। আজকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে মাথাপিছু আয়, রিজার্ভ, গড় আয়ু, লিঙ্গবৈষম্য নিরসনে, সামাজিক উন্নয়নে সার্বিকভাবে সবকিছুতে বহুগুণে এগিয়ে। উল্টোদিকে পাকিস্তান নারীদের গৃহবন্দি, সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্নীতি, লিঙ্গবৈষম্য, ঋণ, গণতন্ত্রকে গুম করে খেয়ে ফেলার ব্যাপারে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। কর্মক্ষেত্র তো নয়ই সেখানে পাড়া-মহল্লায়ও নারীরা নিরাপদ নয়।
ডিজিটাল বিপ্লবের কারণে উন্নয়নসূচক এসব তথ্য এখন নিমিষেই জানা যায়। এরপরও যারা স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানি বন্দনা প্রকাশ করে, এরা আসলে সেই আহত প্রেমিক, যার সব গেছে তবু পথপানে চেয়ে বসে আছে। এরা আদতে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, লিঙ্গবৈষম্য ও সন্ত্রাসী সর্বস্ব ভূমি কামনা করে।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদটি নিয়ে বহুপথের মত থাকতে পারে। কিন্তু এটা জানা জরুরি, প্রথম আলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়। হুট করে চাইলাম কিছু দিলাম, ভুল বা মিথ্যা হলো সরিয়ে ফেললাম। তাদের নিশ্চয়ই প্রথিতযশা সম্পাদকীয় প্যানেল আছে। তাছাড়া এই দেশেই তো বাসন্তীর মতো মানুষকে গায়ে জাল জড়িয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছিল। যা পরে ষড়যন্ত্রে রূপ নেয়। তাছাড়া ষড়যন্ত্রের প্রাথমিক ধাপ কিন্তু মিথ্যাচার। আর যদি সংবাদটি সত্য হতো তাহলেও স্বাধীনতা দিবসের মতো দিনে এমন খবর ছেপে দেশের স্বাধীনতাকে এক ধরনের বিভ্রান্তিরেখা টানা হয় না কি?
কথায় কথায় বাইরের অংশকে ভাশুরের ভূমিকায় আনাদের জানা উচিত, বিশ্বের অন্য কোথাও তার নিজ দেশের স্বাধীনতা নিয়ে এমন সূক্ষ্ম বিভ্রান্তির ফলাফলে কি হয়? বিশ্ব ব্যবস্থার কারণে গোটা বিশ্ব একটা সংকটের মধ্য দিয়ে পার করছে। মনে মনে যে সাধের বিদেশ কল্পনা কয়া হয়, সেখানেও একটি আপেলের দাম ১১৫ টাকা হয়েছে, তিনটির বেশি টমেটো কিনতে দেওয়া হয় না। প্রতি ঘণ্টায় সেখানে বন্দুকের গুলিতে মানুষ মরে, ধর্ষণের বিষয়ে তারা নিত্যনৈমিত্তিক রেকর্ড গড়ছে, ভাঙছে। কাজেই এ দেশের বিষয়ে যারা ছবক দিতে চাইবে তাদের সামনেও এই বিষয়গুলো তুলনামূলক আলোচনায় নিয়ে আসা উচিত।
বিশ্ব এখন গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। কাজেই করোনাভাইরাস, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকটের আঁচ এখানেও লাগবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে দেশের স্বাধীনতা দিবসের দিনে নিজেদের সম্ভাবনা, সাফল্যগুলোকে সামনে না এনে ১০ টাকার বিনিময়ে এমন ফটোফ্রেম, সংবাদ সত্যিই বেদনার। ৭১ টেলিভিশনের অনুসন্ধানী সংবাদে প্রথম আলোর সেই মিথ্যাচার বেরিয়ে এসেছে। এর ১০ টাকার আচরণের সাম্প্রতিক সাবপ্লট হলো, ২০০৭ থেকে ২০০৯।
প্রত্যেকেই একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোয়। সেই বিবেচনায় ১০ টাকার চালাকি ছিল আগামী নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রকাশিত সংবাদের মাস্টার স্ট্রোক। কিন্তু তারা সত্যের কাছে পরাজিত হয়েছে। সফল হলে হয়তো কয়েক ধাপ এগিয়ে যেত। বিগত প্রায় ১৪ বছরে উন্নয়নের মাইলফলকে এ দেশ এমন স্তরে পৌঁছতে শুরু করেছে যে খোদ পাকিস্তানি জনগণ, মিডিয়া বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে প্রশংসা করে চলেছে। এটাও বলছেন, আজ যদি তারা বাংলাদেশের সঙ্গে থাকতে পারতেন তাহলে তারাও এই উন্নয়নের ভাগীদার হতেন। অর্থাৎ তারা বাংলাদেশের অংশীদার হতে চায়। এদিকে এখানকারও কেউ কেউ ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে, এই স্বাধীনতা কিছুই না। অর্থাৎ ভৌগোলিক পাকিস্তান ও এখানকার মানসিক পাকিস্তান এক হতে চায়। এসব মানসিক দৈন্য, হীনতা ও ষড়যন্ত্র আগামীর জন্য চ্যালেঞ্জ।
স্বাবলম্বী হবার জ্বালা আছে। ঠিক এ কারণেই দিনে দিনে লড়াই আরও বহুমাত্রিক হবে। এ জন্য দেশের স্বার্থ আগে এবং সেই স্বার্থকে টিকিয়ে রাখতে সবাইকে জবাবদিহির পর্যায়ে রাখতে হবে। দেশের ও এই প্রজন্মের স্বপ্ন-সম্ভাবনাকে যারা লুট করতে চায় প্রয়োজনে তাদের আচরণ বুঝে নিজেদেরও আচরণ নির্ধারণ করতে হবে।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা
[email protected]
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।




