রাজশাহী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারী সুলতানা জেসমিনের মৃত্যু হয়েছে র্যাব হেফাজতে। সর্বশেষ খবরে বলা হচ্ছে জেসমিনের মৃত্যু হয়েছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে এবং ময়নাতদন্তে বলা হলো তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন থাকলেও তা মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট নয়। যেটাই বলা হোক না কেন বাস্তবতা হলো, জেসমিন মারা গেছেন র্যাবের হাতে আটক থাকা অবস্থায় এবং আটক হওয়ার আগে তিনি সুস্থ ছিলেন বলে পরিবার দাবি করছে।
জেসমিন যদি কোনও অনিয়ম করে থাকেন, দুর্নীতি করেন তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ মামলা করবেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার সাজা হবে। কিন্তু মামলা হওয়ার আগে কোনও একজন অভিযোগ করলো আর র্যাব তুলে নিলো, তাও একজন নারী, এই বিষয়টিই নাগরিক সমাজের জন্য শংকার বিষয়। মামলার আগে তুলে নেওয়ার আরেক দৃষ্টান্ত প্রথম আলোর সাভার প্রতিবেদক শামসুজ্জামানের বেলায়ও ঘটেছে। শামসুজ্জামানের রিপোর্ট নিয়ে অনেক প্রকার মন্তব্য, বিবৃতি এসেছে, আদালতও প্রথম আলোর সম্পাদককে জামিন দেওয়ার সময় মতামত দিয়েছে। কিন্তু মামলার আগেই তাকে সেহরির পর তুলে নেওয়া হয়েছিল। ২০ ঘণ্টা কোনও খোঁজ না পেয়ে তার পরিবার একটা ট্রমার মধ্যে সময় কাটিয়েছে।
মামলার আগে এভাবে তুলে নেওয়ার বিষয়ে বড় ভাবনা প্রয়োজন সরকারের দিক থেকে। কারণ এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হরণের শামিল, বিচার ব্যবস্থার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়বাড়ন্ত।
সুলতানা জেসমিনের সঙ্গে যা ঘটেছে তা ভাবতেও কষ্ট হয়। কোনও ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই একজন নাগরিককে সরকারি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মৌখিক কথায় এবং তার উপস্থিতিতেই উঠিয়ে নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কি র্যাবের কাজ হতে পারে? একজন নাগরিক যদি অপরাধের সাথেও সম্পৃক্ত হন তার বিচার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। র্যাব যেমন এখানে তার জায়গা থেকে বড় ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, তেমনই সদাচারণ করেননি সেই সরকারি কর্মকর্তা। তিনি সরকারি উচ্চস্তরের একজন কর্মকর্তা হিসেবে জেসমিনের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় কেন যাননি? কোনও মামলা করেননি? সেই জবাব তার কাছ থেকে নিতে হবে।
এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটছে সারাদেশে। মনে থাকবার কথা ঢাকা ওয়াসার পানির গুণগত মান ও অন্যান্য জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট নাগরিক আন্দোলন করতেন জুরাইনের মিজানুর রহমান। তাকেও গত বছর জুরাইন রেলগেট সংলগ্ন একটি মার্কেট থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। আরও একটি বড় ঘটনা ছিল ২০১৫ সালে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের এক নেতা আরজু মিয়াকে হত্যার অভিযোগে র্যাবের এক সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার পর নিহতের ভাই বলছিলেন, ‘আগে আটক করে তারপর তাকে একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে তার ভাইকে’। সেই মামলা নিয়ে বড় তোলপাড় হয়েছিল সেই সময়। এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকারের মূলনীতি, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও আইনের লঙ্ঘন এবং একইসাথে ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত। ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশ রেগুলেশন্স-এরও পরিপন্থি।
র্যাব একটি বিশেষ বাহিনী। সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে, মাদকের বিস্তার কমাতে, অপরাধী ধরতে তথা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে এই বাহিনী অনেক প্রশংসাযোগ্য কাজ করছে। তেমনি পুলিশ বাহিনীও জনগণের জন্য নিবেদিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধানতম বাহিনী। কিন্তু হেফাজতে মৃত্যু ও মামলার আগেই আটক করা বা তুলে নেওয়ার ঘটনা তাদের যে ভাবমূর্তির সংকট সৃষ্টি করছে সেটা তাদেরই ভাবতে হবে।
বর্তমান সরকারের এই দীর্ঘ সময়ে পুলিশ ও র্যাবের মর্যাদা, ক্ষমতায়ন ও আধুনিকায়ন দুটি ঘটেছে বড়ভাবে। এবং একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এদের কাজ সরকারের অন্যান্য সংস্থা, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক বেশি দৃশ্যমান। তারা কী করছে তা জনমনে ধরা পড়ে দ্রুত এবং প্রতিক্রিয়াও হয় দ্রততম সময়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্ষমতাসীন দলের হয়ে কাজ করে, ক্ষমতাসীন দলের অপরাধীকে সমঝে চলে – এসব আখ্যান তাদের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সে ধারণা কখন বদলাবে, তারা কখন নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সচেষ্ট হবে, এই ভাবনাটা আসছে নাগরিক সমাজ থেকেও।
এর সাথে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রশ্নটিও। সরকারের নিজের এবং তার অধীনে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি সাফসুতরা রাখা একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। চারদিক থেকে যখন অভিযোগের তীর নিরন্তর ধেয়ে আসতে থাকে, তখন সেই সাফাই প্রক্রিয়া পৃথক তাৎপর্য পায়। সেই প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবেই কথাগুলো উঠছে। উঠছে এ কারণে যে, কোনও কোনও পক্ষে ক্ষমতার আস্ফালন প্রদর্শিত হয় মাত্রাতিরিক্তভাবে। অস্বাভাবিক অনিয়মগুলোই অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সকলেই ধরে নেন, পুলিশ বা র্যাব আইন ভাঙবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, কারণ তারা নিয়মের ঊর্ধ্বে।
আমরা জানি পুলিশ বা র্যাব বহু ক্ষেত্রে নিজেদের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়। তাই নিজেদের ক্ষেত্রে তারা নিয়ম মানেন না বা তারা আইনের ঊর্ধ্বে – এই পাবলিক পারসেপশন বা জনধারণা আর চলতে দেওয়া যায় না। বছরের পর বছর ধরে যে কর্তব্যপরায়ণতার বিনির্মাণ ঘটানো হয়েছে, হঠাৎ কয়েকজনের অযৌক্তিক কোনও কাজের কারণে যেন তা নষ্ট না হয়ে যায়। মনে রাখা প্রয়োজন যে, নাগরিকের প্রত্যাশা যখন সামান্য হলেও বেড়েছে, তখন তা যেন হতাশায় পরিণত না হয়।
লেখক: সাংবাদিক




