বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়– রাষ্ট্র গঠনে তাদের অনন্য ভূমিকার কারণে। এটা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায় শোধ মাত্র। পৃথিবীর সব দেশেই ‘দেশস্রষ্টা’দের জন্য সর্বোচ্চ সম্মাননা জানানোর রেওয়াজ আছে। সংগত কারণেই এই সম্মাননায় ভাবগাম্ভীর্যতা এবং সম্মানজনক পরিবেশ রক্ষাও অপরিহার্য। একইভাবে এই সম্মাননা অনুষ্ঠানে এমন কোনও আচরণ কারও দ্বারাই করা অনুচিত হবে, যদি সেটা আমাদের আইন ও সংবিধানকে আঘাত করার মতো হয়ে যায়।
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এমন একটি ঘটনা সম্প্রতি টাঙ্গাইলে ঘটে গেলো, একজন মুক্তিযোদ্ধার জানাজার সময় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানানোকালে। টাঙ্গাইলের সখীপুরের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ খানের জানাজা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সেখানে উপস্থিত হন বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজায় শীর্ষস্থানীয় আরেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার প্রতি রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানকে আরও মর্যাদাসম্পন্ন করে দেয়। কিন্তু ব্যত্যয় ঘটে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে। গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য স্থানীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন ইউএনও ফারজানা আলম। মূলত তার নেতৃত্বেই প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানোর কথা। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের সিদ্দিকী ফারজানা আলমকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় নেতৃত্ব দিতে বারণ করেন। তিনি বলেন– অন্য কোনও ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে যেন গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় বঙ্গবীর ইউএনওকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘কোনও মহিলার গার্ড অব অনার দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি এখানে এসে মুক্তিযোদ্ধার লাশের সঙ্গে বেয়াদবি করেছেন। যদি এখন বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন, তাহলে এখানকার অনেক কর্মকর্তাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিতাম।’ শুধু তাই নয়, একদিনের মধ্যে এই ইউএনওকে সখীপুর থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বানও জানান। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের সিদ্দিকী যদি জানাজায় নারীর উপস্থিতি বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করতেন তাহলে হয়তো বিষয়টি নিয়ে ভাবনার ছিল। তিনি কিন্তু সুস্পষ্টভাবে গার্ড অব অনারের কথাই বলেছেন। অথচ মাত্র কয়েক দিন আগে আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লা চৌধুরীর জানাজাতেও একাধিক মহিলা পুরুষের সারিতে দাঁড়িয়ে অংশ নিয়েছেন। তারপরও মহিলারা জানাজায় অংশ নিতে পারবেন কী পারবেন না সেরকম কোনও তর্ক করার সাহস আমার নেই। সেরকম কোনও ধর্মীয় জ্ঞানও আমার নেই। তবে বিষয়টি ছিল অভিনব। কিন্তু সখীপুরে মহিলা ইউএনও’র উপস্থিতি জানাজার জন্য ছিল না। সুতরাং ধর্মীয় বিধিনিষেধের বিষয়টি এখানে আলোচনার সুযোগ নেই।
আব্দুল কাদের সিদ্দিকী শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন, তিনি সাবেক এমপি এবং এখন একটি দলেরও প্রধান। সংগত কারণেই তার কাছ থেকে এমন কোনও আচরণ আশা করা যায় না, যা সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের পরিপন্থি। বাস্তবতা হচ্ছে, তিনি যা করেছেন তা সরাসরি আমাদের সংবিধানের পরিপন্থি, একই কারণে আইনকেও অমান্য করা। এটা প্রথমত বিবেচ্য হতে পারে– তিনি সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার কারণে অন্য সময় কী কী ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেওয়া হয়ে থাকে সেই বিষয়ে সবারই কম বেশি জানা আছে।
সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার বিষয়ে যে নির্দেশনা আছে তারও বরখেলাপ হয়েছে গার্ড অব অনারে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে। আমরা জানি আমাদের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে , ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবেন’। ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৪০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যোগ্যতার ভিত্তিতে পেশা বাছাইয়ের অধিকার নারী-পুরুষ উভয়ের রয়েছে। তাই বলা যায়, সংবিধানের চারটি অনুচ্ছেদকেই তিনি অমান্য করেছেন। যা তাঁর মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে কোনোভাবেই আশা করা যায় না।
এই সংবাদটি গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করেছে, তাকে যে ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে, তাও অনেকাংশে মেনে নেওয়া কঠিন। আবার যারা তার তীব্র সমালোচনা করছেন তাদের সমালোচনার সঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্বিমত প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
কিন্তু কিছু সমালোচনা যে সোজাসাপ্টা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকেই টিপ্পনি কাটার শামিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সমালোচকরা প্রকারান্তরে এহেন আচরণে খুশি হয়েছে। তাদের কথাগুলো বিশ্লেষণ করলে এটাই বোঝা যায়– মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নারী কেন প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হবে? যা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। ঠিক এটাই চেয়েছিল পাকিস্তানিরা এবং এখনও চাইছে পাকিস্তানের অনুসারীরা।
তাহলে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কি একাত্তরের শত্রুদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে নেমে পড়েছেন? এমন প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে। এমন ধারণা মনে আসাটাও অত্যন্ত দুঃখজনক। বাস্তবতা হচ্ছে– সেই সুযোগটিই করে দিয়েছেন আব্দুল কাদের সিদ্দিকী। সংবাদটি প্রকাশেরও প্রায় ৩৫ ঘণ্টা পর এই নিবন্ধ লেখাকালেও বঙ্গবীরের পক্ষ থেকে কোনও সংশোধনী কিংবা দুঃখ প্রকাশের খবর চোখে পড়েনি। তার মানে তিনি যা বলেছেন তাতে তিনি এখনও স্থির আছেন।
তার এই দাবি যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হবে, সংবিধান অবমাননা অনুপ্রাণিত হবে এবং সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি ভাবাদর্শের মানুষেরা আত্মতৃপ্তি বোধ করবে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী নিশ্চয়ই সাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে একাত্তরে অস্ত্র ধরেননি। একজন মুক্তিযোদ্ধা সেই শক্তির বিরুদ্ধেই লড়াই করেছেন। এখন কি সেই শত্রুশিবিরে কোনও মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে যাওয়া সম্ভব?
আমরা আশা করতে পারি আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম তার বক্তব্য সংশোধন করবেন, অন্তত বিক্ষুব্ধ মানুষকে তিনি বলবেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানি বাহিনী ও এদেশীয় তাদের সহচরদের বিরুদ্ধে। আমরা অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের সেই আদর্শকে লালন করবো, প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যত বাধাই আসুক না কেন, আমরা তা মোকাবিলা করবো। দায়িত্বপ্রাপ্তদের রাষ্ট্রীয় কাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অংশগ্রহণের যে সুযোগ সংবিধান আমাদের দিয়েছে, তা পালনে প্রতিটি নাগরিকই সহযোগিতা করবে। এমনটা আশা করা কি খুব বেশি হয়ে যাবে?
লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক




