ব্যর্থতা চিরকালই এতিম। সফল হতে না পারলে ব্যর্থতার দায়িত্ব কেউ নেয় না। বিএনপি সরকার বিরোধী আন্দোলন করছে, ‘চরম’ আন্দোলন করেছে এবং সেই আন্দোলন কখনও কখনও ভয়ংকরভাবে সহিংসও হয়ে উঠেছিল, নির্বাচন করতে চায়নি, নির্বাচন ঠেকাতে চেয়েছিল এবং সেটা করতে সারা দেশে যেন আগুন জ্বলেছিল। কিন্তু কোনও কিছুই কোনও ফল ঘরে আনেনি।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটা কঠোর অবস্থানে গেছে বিএনপি। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীন ছাড়া দল নির্বাচন করবে না। শুধু তাই নয়, দলটি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনও বয়কট করে চলেছে অনেক দিন ধরে। তবু স্থানীয় নেতারা নির্বাচন করেছেন, যেমনটা করেছেন নারায়ণগঞ্জের তৈমুর আলম খন্দকার কিংবা কুমিল্লার মনিরুল হক সাক্কু। এই নির্বাচন করতে গিয়ে তারা দল থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছেন।
পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে আবার সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দলীয়ভাবে বিএনপি পাঁচ সিটির নির্বাচনে যাচ্ছে না এবং দল থেকে বলে দেওয়া হয়েছে দলের কেউ যেন নির্বাচনে না যায়। দলের এই সিদ্ধান্ত দলের প্রান্তিক পর্যায়ে বড় ধরনের সংশয় সৃষ্টি করেছে। তৃণমূল নেতারা সরাসরি বলতে পারছেন না যে তারা নির্বাচন করতে আগ্রহী। তারা চান দল ভোটে আসুক। কারণ, তারা মনে করেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজের শহরের মেয়র কে হবেন, কাউন্সিলর কে হবেন সেখানে তাদের ভূমিকা থাকা দরকার।
সিলেট সিটি নির্বাচনের কথা যদি ধরি তাহলে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচন করবেন কিনা সে নিয়ে রহস্যময় আচরণ করছেন। তিনি সরাসরি নাও করছেন না আবার হ্যাঁ’ও বলছেন না। শোনা যাচ্ছে, আরিফুলের পক্ষে সিদ্ধান্ত আসতে পারে লন্ডন হাইকমান্ড থেকে। বাস্তবতা হলো, বিএনপির অনেক নেতা নির্বাচন করতে প্রস্তুতি নিয়েছেন। কেউ বা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারণ, তারা জানেন নির্বাচন বর্জন মানে হলো স্থানীয়ভাবে মানুষের সংশ্রব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। দলীয় কর্মী সমর্থকদের চাঙা রাখতেও নির্বাচন বর্জনের বিকল্প নেই। তা ছাড়া নির্বাচন যেহেতু শেষ অবধি ঠেকানো যাচ্ছে না, তাহলে বর্জনের উপকারিতা নিয়ে তারা সন্দিহান।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে বিএনপি প্রার্থীরা প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। বিএনপির নেতাকর্মীদের বিশ্বাস অনেক জায়গায় তারা জয়ী হবেন। কিন্তু ভোটে না আসায় তারা সে সুযোগ হারাচ্ছেন। এমন একটা পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বিএনপির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করে শাসক দলের ইন্ধনে এমন আচরণ করছে প্রান্তিক নেতাকর্মীরা। সেটাও বেশ বড় সংকট তাহলে। শাসক দলের প্ররোচনায় যদি দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তারা নির্বাচনে যান সেটা দলের ভেতর যে শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে তা প্রকাশ করে।
বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হবে না। কিন্তু এতে করে এখানেও সমস্যা রয়েছে। দলের নীতি অনুযায়ী এই নির্বাচনগুলোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই বিএনপির। করলে যেটি হবে এতদিন ধরে ধরে বিএনপি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলো যে বর্জন করে আসছে, সে অবস্থান মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আবার কেউ করলে করুক এই মনোভাব দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করায় যাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে।
নির্বাচন বর্জনের রাজনৈতিক অর্জন কী সেই মূল্যায়ন হওয়া জরুরি। স্থানীয় নেতারা নির্বাচনে থাকতে চান। স্থানীয় কর্মীরাও চান। কারণ, এলাকায় তাদের পরিচিতি, তাদের অবস্থান জানান দেওয়ার এটি বড় সুযোগ। কিন্তু বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কেউ প্রার্থী হলে তাঁকে দৃষ্টান্তমূলক সাংগঠনিক শাস্তি দেওয়ায় যদি অটল অবস্থান থাকে, তাহলে তা স্থানীয় নেতাদের সুযোগ নষ্ট করার শামিল।
নির্বাচন কমিশন এপ্রিল মাস থেকে তিন ধাপে দেশের ৫টি সিটি করপোরেশনের তফসিল ঘোষণা করেছে। এপ্রিল মাসের ২১ তারিখ থেকে জুনের ১২ তারিখ সময়ের মধ্যে এসব নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। বিএনপি বলছে কোনও নির্বাচনেই যাবে না। কিন্তু আলামত যা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে পাঁচ সিটিতেই বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়বেন। এর আগে আমরা দেখেছি, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় তাদের প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করলেও দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাংগঠনিক কাঠামো সেই প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেছে।
এই পাঁচটি সিটির চারটিতেই বিএনপির জনপ্রিয় প্রার্থী আছেন। তাই তাদের এবং কর্মীদের ব্যাপক আগ্রহ আছে নির্বাচন নিয়ে। বিএনপিকে বুদ্ধি দেয় এমন মহল অবশ্য বর্জনেরই পক্ষে। তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই সিটি নির্বাচনগুলো বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। যদি দলীয় সিদ্ধান্ত উড়িয়ে দিয়ে তার নেতারা নির্বাচনে অংশ নেন তাহলে বড় জটিলতাই সৃষ্টি করবে। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে জাতীয় নির্বাচনে। অনেকেই দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সে নির্বাচনেও অংশ নেবেন এবং জয়লাভ করলে সংসদে গিয়ে বসবেন। বলা যায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটা নো-ম্যান্স ল্যান্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছে দলটি। আমরা ঠিক জানি না দল বুঝবে কিনা, বর্জনে কোনও অর্জন নেই।
লেখক: সাংবাদিক
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।




