দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে রুপির লেনদেন রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে

আবদুল্লাহ সাদী
১২ জুলাই ২০২৩, ২০:১৯আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৩, ২০:১৯

বাংলাদেশ ও ভারত দ্বিপাক্ষিক লেনদেনের ক্ষেত্রে রুপির ব্যবহার শুরু করতে চলেছে। ১১ জুলাই উদ্বোধনের পর থেকে রফতানিকারকরা রুপিতে রফতানির মূল্য গ্রহণ করতে পারবেন। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, কারণ বর্তমানে বিভিন্ন বৈশ্বিক কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ মার্কিন ডলার নির্ভরতা কমাতে চাইছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই অন্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমছে। যুদ্ধের কারণে শুরু হওয়া উচ্চ আমদানি ব্যয়ের ফলে অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতিতে পড়ে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে। ফলে কিছু সময়ের জন্য জ্বালানি ও খাদ্য সংকট তৈরি হয়। বিপরীতে বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে মার্কিন ডলার অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তারপর থেকে সংকট মোকাবিলায় মার্কিন ডলারের ওপর চাপ কমিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের আলোচনাটি সামনে আসে।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ আগেই দুই দেশের মধ্যে সেপ্টেম্বর মাস থেকে প্রাথমিকভাবে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য শুরু হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল, তবে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ভারত ও বাংলাদেশ এখন টাকা ও রুপির পরিবর্তে শুধু রুপিতে বাণিজ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে রুপিতে বাণিজ্যিক লেনদেন করার প্রস্তাব করে ভারত। এরপর মার্চে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। বাংলাদেশের রিজার্ভ কমে যাওয়ায় স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া গত বছর তাদের রফতানিকারকদের বাংলাদেশের সঙ্গে ডলার এবং অন্যান্য প্রধান মুদ্রায় লেনদেন এড়িয়ে যেতে বলেছিল।

পরে ভারতের একটি প্রতিনিধি দল গত মাসে বাংলাদেশ সফর করে এবং দুই দেশের মধ্যে টাকা ও রুপিতে বাণিজ্যিক লেনদেনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে। দ্বিপক্ষীয় লেনদেনের সুবিধার্থে উভয় দেশের ব্যাংকই অন্য দেশের ব্যাংক দুটিতে অ্যাকাউন্ট খুলবে, যা ভোস্ট্রো এবং নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশিরা ভারত থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সরাসরি রুপিতে এলসি খুলতে সক্ষম হবে। একইভাবে, ভারতীয়রাও বাংলাদেশ থেকে রুপির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, একটি পাইলট কর্মসূচি হিসেবে বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক এবং ভারতের আইসিআইসিআই ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে টাকা ও রুপিতে ব্যবসার এই প্রক্রিয়া চালু হওয়ার কথা ছিল। এখন নীতিতে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে এই জুলাই থেকে শুধু ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য করা হবে। ইস্টার্ন ব্যাংক এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) বাংলাদেশে পরিচালিত কান্ট্রি অফিস ইতোমধ্যে ভারতীয় আইসিআইসিআই ব্যাংক এবং এসবিআইতে অ্যাকাউন্ট খুলেছে। সোনালী ব্যাংকও খুব দ্রুতই অ্যাকাউন্ট খুলবে।

বাংলাদেশি রফতানিকারকরা এখন থেকে রুপিতে রফতানি আয় গ্রহণ করতে পারবেন এবং আমদানিকারকরাও রুপিতে এলসি খুলতে পারবেন। বাংলাদেশ বছরে ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানির বিপরীতে ভারত থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। বিশাল এই বাণিজ্য ঘাটতির ফলে শুধু রফতানি আয়ের সমপরিমাণ পণ্য আমদানিতে রুপি পরিশোধ করা যাবে। শুধু রুপিতেই নয়, বরং দুই দেশের নাগরিকেরা রুপি এবং টাকা উভয় মুদ্রার মাধ্যমেও লেনদেন করতে পারবেন, তবে তা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নয়।

এই বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই বাংলাদেশ প্রবর্তিত ‘টাকা পে কার্ড’ নামক একটি ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকরা টাকা বা রুপি যেকোনোটিই তুলতে সক্ষম হবে।

কার্ডধারীরা ভারতে যাওয়ার সময় সর্বোচ্চ ১২ হাজার ডলার সমপরিমাণ ভারতীয় রুপি খরচ করতে পারবেন। এছাড়াও এ কার্ডের মাধ্যমে তারা দেশের ভেতরের কেনাকাটায়ও টাকা খরচ করতে পারবেন। বিনিময় হারের ভিত্তিতে টাকা সরাসরি রুপিতে বা রুপি টাকায় রূপান্তরিত হবে। এতে টাকাকে প্রথমে ডলারে এবং তারপরে ডলার থেকে রুপিতে রূপান্তর করার ঝামেলা না থাকায় ৬ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয় হবে। এটি চিকিৎসা সেবা, পর্যটন এবং ধর্মীয় কারণে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়া লাখ লাখ বাংলাদেশিকে উপকৃত করবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের প্রবণতা সারা বিশ্বে বেড়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে, ভারত রাশিয়ার সঙ্গে রুপিতে বিদেশি বাণিজ্যের প্রথম বন্দোবস্ত দেখেছিল– ‘ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক বন্দোবস্ত’-এর অংশ হিসাবে। তারপর থেকে, ভারতের রুপির বাণিজ্যের প্রবণতা বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, জার্মানি, রাশিয়া এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১৮টি দেশকে ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ১৯তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন। ডি-ডলারাইজেশনের বৈশ্বিক প্রক্রিয়া যেমন বাড়ছে, তেমনি রুপির ‘আন্তর্জাতিককরণ’ও বাড়ছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য মোকাবিলায় রাশিয়ান রুবল এবং চীনা ইউয়ান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। ব্রিকস দেশগুলো একটি একক মুদ্রা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ব্রিকসের সদস্য নয় এমন অনেক দেশও এটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। একইভাবে টাকা-রুপিতে বাণিজ্য করার সিদ্ধান্তটি মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত গত দেড় বছরের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, যা এখনও বিরাজ করছে। ফলে বাংলাদেশ এটিকে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভবিষ্যৎ সংকটের পূর্ব-প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে। মুদ্রা বাজারে ভারসাম্যহীনতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত দুই অর্থবছরে তার নেট রিজার্ভের ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করে করেছে। গত কয়েক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। বিশেষ করে, গত দেড় বছরে টাকার মান কয়েক দফা লাফিয়ে লাফিয়ে হ্রাস পেয়েছে এবং এখনও বাজার অস্থিতিশীল রয়েছে। তাই, অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও তার রিজার্ভের বহুমুখীকরণে এবং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করতে আগ্রহী হয়েছে। কারণ, চলমান বৈশ্বিক সংকটকালে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রতিটি ডলার গুরুত্বপূর্ণ। আর রুপিতে বাণিজ্যের ফলে এই রিজার্ভ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। এছাড়াও সুবিধাজনক এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী হওয়ায় এ প্রক্রিয়া বাণিজ্যকে সহজ করবে, যা দুই প্রতিবেশীর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে অবদান রাখবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ব্যবসায়ীরা সরাসরি রুপিতে এলসি খুলতে পারায় ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং লাভ বেশি হবে। কারণ, এটি ডলারের মতো তৃতীয় কোনও মুদ্রা ব্যবহার করবে না। এ কারণে ব্যবসায়ীরা এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। এছাড়াও, যেসব বাংলাদেশি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ভারতে যাতায়াত করেন, তাদের সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে। যেহেতু প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের লেনদেন রুপি এবং টাকায় সম্পন্ন হবে, বাণিজ্য ঘাটতির জন্য যেসব ঝুঁকির কথা আগে বলা হচ্ছিল সেসব ঝুঁকিও এখন আর নেই।

লেখক:  যুক্তরাজ্যের বস্টন ইউনিভার্সিটিতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে পিএইচডি গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বশেষসর্বাধিক